সিআরবি রক্ষা আন্দোলন -এর পক্ষ থেকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বরাবরে স্মারকলিপি প্রদান

 

আজ ৮ আগস্ট ২০২১ সিআরবি রক্ষা আন্দোলনের পক্ষ থেকে চট্টগ্রামের সিআরবি এলাকায় হাসপাতাল ও মেডিক্যাল কলেজ সংক্রান্ত স্থাপনাসমূহ নির্মাণ প্রকল্প বাতিলের এবং সিআরবি এলাকাকে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও পরিবেশ সংরক্ষণ এবং জনপরিসর হিসেবে সংরক্ষণের আবেদন জানিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বরাবরে স্মারকলিপি প্রদান করা হয়েছে। এই স্মারকলিপিটিতে স্বাক্ষর করেছেন চট্টগ্রামের বিভিন্ন অঙ্গনের ৫ বিশিষ্টজন। বিশিষ্টজনরা হলেন একুশে পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক ও কবি আবুল মোমেন, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধ গবেষক ডা: মাহফুজুর রহমান, কবি ও নাট্যজন শিশির দত্ত, একুশে পদকপ্রাপ্ত নাট্যজন ও পরিচালক-টিআইসি আহমেদ ইকবাল হায়দার এবং স্থপতি ও নগরবিদ জেরিনা হোসেন।
উক্ত স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়, চট্টগ্রাম জেলার কোতোয়ালী থানাধীন সিআরবি মূলত: লালখান বাজার মৌজার শিরিষতলা, গোয়ালপাড়া এলাকা নিয়ে গঠিত। এর পশ্চিমে সিডিএ এভেনিউ ও সিআরবি সড়ক, পূর্বে নুর আহমেদ সড়ক এবং দক্ষিণে নেভাল এভেনিউ ও সিআরবি বেষ্টিত এলাকাটি একটি অনন্য নাগরিক পরিসর। এই পরিসরটি ঐতিহাসিক এবং নতুন সার্কিট হাউজ, যাদুঘর, এম. এ. আজিজ স্টেডিয়াম, আউটার স্টেডিয়াম, জমিয়তুল ফালাহ মসজিদ ইত্যাদি নিয়ে গঠিত। মোট ২১০ একর জুড়ে বিস্তৃত এলাকাটিতে ছোট বড় পাহাড়-টিলা, উন্মুক্ত স্থান ছাড়াও রয়েছে ১৯৭ প্রজাতির উদ্ভিদ যার মধ্যে আবার শতবর্ষী শিরিষ, গর্জন ও কড়ই গাছ রয়েছে। সিআরবি এলাকাতে আরও আছে ৬২’র ছাত্র আন্দোলন, ৬ দফা, ১১ দফা দাবি আন্দোলনের সক্রিয় নেতা চাকসুর সাবেক জিএস, মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ আব্দুর রবসহ ৭ জন বীর সেনানীর সমাধিস্থল ও স্মৃতিসৌধ। সিআরবি-র পরিসর বিশেষ করে শিরিষতলা নামক স্থানটি চট্টগ্রাম নগরবাসীর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উদযাপনের একমাত্র স্থান যেখানে প্রতিবছর সাংস্কৃতিককর্মী ও সাধারণ মানুষের মিলন মেলায় আয়োজিত হয় পহেলা বৈশাখ, পহেলা ফাল্গুন, রবীন্দ্র জয়ন্তীর মূল অনুষ্ঠানসমূহ। জনবহুল ও ঘনবসতিপূর্ণ চট্টগ্রাম নগরীর বাসিন্দাদের একটি বড় অংশ মুক্ত নিশ্বাস নিতে, শরীরচর্চা করতে নিয়মিত সিআরবি এলাকাতে আসেন। এ নগরীর বিপুল সংখ্যক শিশুরা সিআরবি এলাকাতে খেলাধূলা করে এবং এর প্রাকৃতিক ও ঐতিহাসিক আবেদনে সমৃদ্ধ হয়। সিআরবি এলাকা চট্টগ্রাম নগরের – ঐতিহ্যগত, ভূ-পরিবেশ ও প্রতিবেশগত অহংকারের জায়গা, যা বাংলাদেশের অন্য কোন নগর থেকে স্বতন্ত্র । নগরবাসি ছাড়াও যে-কোন পর্যটনকে এই অনন্য সাধারণ এলাকা বিমোহিত করে । স্বভাবতই, প্রাকৃতিক, সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক আবেদন বিবেচনায় চট্টগ্রামের ১৯৬১ সনের প্রথম পরিকল্পনাসহ পরবর্তী চট্টগ্রামের মেট্রোপলিটন মাস্টার প্ল্যান ১৯৯৫-এর সুপারিশ অনুয়ায়ী: ১) সিআরবি ভবনকে ঐতিহাসিক ভবন হিসাবে সংরক্ষণ ২) সিআরবি ও বাটালি হিল এলাকাকে তাৎপর্যপূর্ণমুক্ত এলাকা হিসাবে সংরক্ষণ ৩) বিশেষ বিবেচনায় উক্ত এলাকাকে “উন্মুক্ত স্থান’’ হিসেবে চিহ্নিত করে সকল প্রকার নির্মাণ নিয়ন্ত্রণ করতে বলা হয়েছে। একই ধারাবাহিকতায় ২০০৮ সালের ডিটেইল্ড এরিয়া প্ল্যানে সুপারিশ করা হয়েছে, সিআরবি এবং তার পরিসর “সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য হিসাবে চিহ্নিত করে তাকে সাংস্কৃৃতিক ও পরিবেশগত সংরক্ষিত’’ এলাকা হিসাবে গণ্য করা।

উপরোক্ত বিষয়সমূহ উল্লেখ করে আরও জানানো হয় যে, সম্প্রতি নগরবাসি জানতে পেরেছে যে আইনগতভাবে পাশ করা চট্টগ্রামের মাস্টার প্ল্যান সমূহের অনুশাসন লংঘন করে এবং শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতিসৌধ এলাকাকে অন্তর্ভুক্ত করে বিদ্যমান রেলওয়ে হাসপাতালের সংস্কারের অজুহাতে চট্টগ্রামের ফুসফুস খ্যাত এই সিআরবি এলাকার গোয়ালপাড়াতে ৬ একর জায়গা জুড়ে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব চুক্তির আওতায় একটি ৫০০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল, ১০০ আসনের মেডিকেল কলেজ ও ৫০ আসনের নার্সিং ইন্সটিটিউট প্রতিষ্ঠার জন্য রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ এবং বেসরকারি সংস্থা ইউনাইটেড এন্টারপ্রাইজ এন্ড কোম্পানি লিমিটড চুক্তিবদ্ধ হয়েছে এবং নির্মাণের ঘোষণা দিয়ে প্রস্তাবিত এলাকায় একটি সাইনবোর্ডও স্থাপন করা করেছে। এসব মেডিকেল স্থাপনা সিআরবি এলাকাটির সাংস্কৃতিক ও প্রাকৃতিক আবেদনই শুধু ধবংস করবে তা নয়, মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের স্মৃতিসৌধকেও কলংকিত ও গুরুত্বহীন করবে যা গ্রহণযোগ্য নয়। এমতাবস্থায় চট্টগ্রাম নগরবাসী তাদের প্রাণাধিক প্রিয়, ঐতিহ্যমণ্ডিত, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের আধার, ঐতিহাসিক সেন্ট্রাল রেলওয়ে বিল্ডিং (সিআরবি) এলাকাতে বৃহদায়ন প্রকল্প নির্মাণের মাধ্যমে বাণিজ্যিক আগ্রাসনের হাত থেকে রক্ষা করতেই প্রধানমন্ত্রীর দ্বারস্থ হওয়া।
যৌক্তিক কারণে চট্টগ্রাম নগরীর সর্বস্তরের মানুষ সিআরবি এলাকায় মেডিকেল স্থাপনা প্রতিষ্ঠা এবং এ-এলাকা বাণিজ্যিকীকরণে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের এ-সিদ্ধান্তের বিষয়ে ক্ষুব্ধ ও অপমানিত। চট্টগ্রাম নগরবাসী সিআরবিতে মেডিকেল স্থাপনা নির্মাণের বিষয়ে তাদের আপত্তি বিভিন্ন মাধ্যমে ইতোমধ্যে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের জানিয়েছে। চট্টগ্রাম নগরবাসীর প্রাণের দাবি হলো সিআরবিকে উন্মুক্ত স্থান হিসেবে ও ঐতিহ্য হিসেবে সংরক্ষণ করা এবং প্রস্তাবিত মেডিকেল স্থাপনাসমূহ চট্টগ্রাম নগরীর উপকণ্ঠে সরিয়ে নেওয়া। আমরা মেডিকেল স্থাপনার বিরুদ্ধে নই, তবে তা আমাদের সিআরবি’র বিনিময়ে নয়।
রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ চট্টগ্রামবাসীর যৌক্তিক আবেদনে সাড়া না দিয়ে মেডিকেল স্থাপনা নির্মাণের জন্য সিআরবি এলাকাতে বেশ কয়টি গভীর নলকূপ স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে যা জনমতের প্রতি সংবেদনশীলতার পরিচয় দেয় না। এমতাবস্থায় পরিবেশ রক্ষার সাংবিধানিক অঙ্গীকারের প্রতি সম্মান প্রদর্শনপূর্বক চট্টগ্রাম নগরবাসীর পক্ষে আমরা উল্লেখিত স্বাক্ষরকারীগণ সিআরবি এলাকাটিকে ঐতিহাসিক উন্মুক্ত স্থান হিসেবে সংরক্ষণ এবং প্রস্তাবিত মেডিকেল স্থাপনা অন্যত্র সরিয়ে নিতে প্রয়োজনীয় নির্দেশ প্রদানের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিনীত ও আন্তরিক আবেদন জানাচ্ছে। পরিশেষে জননেত্রী -প্রধানমন্ত্রী মহোদয়দের সদয় হস্তক্ষেপের মাধ্যমে প্রাণপ্রিয় সিআরবি এলাকাটিকে গোষ্ঠীস্বার্থের বিপরীতে জনস্বার্থে রক্ষা করতে পারবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়।

Sharing is caring!

Related Articles

Back to top button