যদি নাই থাকে প্রকৃতি , হাসপাতালে হবে না গতি “ ফরহাদ জামান জনি

 

এই চট্টগ্রাম শহরে এখন আর খুব বেশী জায়গা নাই যেখানে আপনি প্রাণ খুলে আড্ডা দিবেন , খেলবেন , শরীরচর্চা এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্টান আয়োজন করবেন । অথচ একসময় এই চট্টগ্রাম শহরে শরীরচর্চা, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্টান ও পরিবার নিয়ে ঘুরে বেড়ানোর জন্য জায়গার অভাব ছিলো না । গত ১০-১৫ বছরের মধ্যে নাই হয়ে যায় জাতিসংঘ পার্ক, দখল হয়ে গেছে আউটার ষ্টেডিয়ামের বড় অংশ , একসময় সাধারণ জনগণের নাগালে থাকা ফয়েজ লেক কে ব্যাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান কর্নকর্ড এর তুলে কাছে দেওয়ায় এখন সেটাও চলে গেছে নাগালের বাহিরে ।
নগরবাসীর কাছে সাংস্কৃতিক অনুষ্টান , শরীর চর্চা ও খেলাধুলার জন্য খুব দীর্ঘদিনের পরিচিত স্থান হচ্ছে ডিসি হিল কিন্তু গত ৩-৪ বছর ধরে শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিতি এই স্থানটিতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নানা বিধি নিষেধ জারি থাকায় সেখানেও নাগরিকদের কর্মকান্ড সীমিত হয়ে আছে । খোলা স্থানের অভাবে দীর্ঘ বছর ধরে বন্ধ হয়ে আছে উন্মক্ত সাংস্কৃতিক অনুষ্টানসহ নানা আয়োজন । এই দমবন্ধ হয়ে যাওয়া শহরে মানুষ তারপরও আশা দেখছিলো , স্বপ্ন দেখছিলো সিআরবি এলাকাটাকে কেন্দ্রে করে। শত বছরের পুরানো শিরীষ গাছ, কৃষচূড়া গাছ , ছোট ছোট পাহাড়, পাহাড়ে মাঝ দিয়ে চলে যাওয়া একাঁবাকা সড়ক , পাখিদের কিচিরমিচির ডাক সবকিছু যেনো এই শহরের মানুষদের নতুন করে প্রাণ দেয় । এই এলাকায় আসলে শহরের সিনিয়র সিটিজেনকে যেমন মনে করে দেয় তার ফেলে আসা সেসব তারুণ্যদীপ্ত দিনগুলোর কথা ঠিক একইভাবে শিশুরা পায় খেলার , তরুণেরা পায় আড্ডা – গানে মেতে উঠার জায়গায় । শহরের সাংস্কৃতিক কর্মীরাও এই সিআরবি এলাকাকে কেন্দ্র শুরু করছে নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্টান । চট্টগ্রাম শহরের ঐতিহ্যবাহী বলিখেলা, পহেলা বৈশাখ সহ নানা সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড শুরু হয় এটাকে কেন্দ্র করে ।এই সিআরবি এলাকাটা আরেকটা কারণে শহরের মানুষের কাছে গুরুত্বপূর্ণ সেটা তার শত বছরের ইতিহাস । সেন্ট্রাল রেলওযে বিল্ডিং ( সিআরবি )এটা বাংলাদেশ রেলওয়ে ( পূর্ব) মহাব্যবস্থাপকের কার্যালয় ।১৮৭২ সালে নির্মাণ করা এই ভবনটি এই শহররে অন্যতম প্রাচীন ভবনও । বিট্রিশ আমলে আসাম বেঙ্গল রেলওয়ের কর্মকান্ড পরিচালিত হতো এই ভবন থেকে । এখানে আসলেই নজর কাড়বে বাংলাদেশের প্রথম তৈরী বাষ্পীয় রেলওয়ের ইন্জিনও । বিট্রিশ আমল থেকে শুরু করে ৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের নানা ঘটনার সাক্ষী এই সিআরবি এলাকা ।

চট্টগ্রাম শহরের গুরুত্বপূর্ণ , ঐতিহ্যবাহী এই এলাকাটাও আজ হুমকির মুখে । এখানকার শত বছরের পুরানো গাছ, ছোট ছোট পাহাড়গুলো কেটে ব্যাণিজ্যিক হাসপাতাল নির্মাণ করার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে । নি:সন্দেহে হাসপাতাল নাগরিকদের জন্য খুব জরুরী কিন্তু তার সমান অনেক সময় তারচেয়ে বেশী গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে প্রকৃতি । এই করোনা মহামারী সময়টাও আমাদের সুস্থতার জন্য প্রকৃতির গুরুত্বের কথা মনে করিয়ে দেয় । আর এই সময় পৃথিবীর সকল প্রান্তে আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ আওয়াজ আমরা শুনতে পাই সেটা “সবুজ পৃথিবী “। বাংলাদেশসহ পৃথিবীর নানা দেশের বিশেষজ্ঞারা বলছে করোনা মহামারির চেয়ে আরো ভয়ঙ্কর বিপর্যয় পৃথিবীর জন্য
অপেক্ষা করছে । বিশেষজ্ঞাদের ভাষ্য: এই ভয়ঙ্কর বিপর্যয় থেকে উঁচু উঁচু দালান ,বড় বড় হাসপাতাল আমাদের রক্ষা করতে পারবে না , একমাত্র সবুজ পৃথিবীই আমাদের রক্ষা করতে পারবে ।

তাই, বাণিজ্যিক হাসপাতাল নির্মাণের জন্য খুঁজলে এই শহরে জায়গায় পেয়ে যাবেন কিন্তু সিআরবি’র মত সবুজ পাহাড় পরিবেষ্টিত ঐতিহাসিক জায়গায় খুঁজলে তো পাওয়া যাবে না । সিআরবি এলাকাটা শহরের নাগরিকদের কাছে প্রাকৃতিক হাসপাতাল হয়ে থাকুক ।

এই প্রাকৃতিক হাসপাতালকে ধ্বংস হতে দেয়া যাবে না ।

লেখক :ফরহাদ জামান জনি

 সদস্য সচিব-গণসংহতি আন্দোলন চট্টগ্রাম জেলা

Sharing is caring!

Related Articles

Back to top button