বঙ্গোপসাগরীয় সভ্যতা- জন্মের আঙিনায় সবুজে ভেসে থাকি নীলে ডুবে যাই //মনির ইউসুফ //

 

 

মৈনপাহাড়ের সবুজ জানে সমুদ্রের নীল এখানে কেমন ব্যকুল। হিমালয় দুহিতা এই পাহাড় শ্রেণি, লতাগুল্ম, নুড়ি, মৃত্তিকা, অরূপের রঙের মসৃণতায় আকুল। রূপে সে প্রকাশিত। বঙ্গোপসাগরীয় নীল জানে সবুজ এখানে কেমন অস্থির, কেমন বেদনার। লতায় পাতায় ডালে ফুলে বর্ষায় বাতাসের তন্ময় দোলা। এই তীরের ঠোঁটের সুন্দর দেখবো না, ভ্রুলতার, গাঢ়ের রেণু দেখবো, না পিঠের- না কোমরের দোলা, আমার আহ! উহ! আফসোসে পরিণত হবে আমার হৃদয়ে। আমি মিশে যাবো, অনন্ত মৃত্যুর মত মিশে যাবো, মাটি হবো, আমার মৃত্তিকা শরীর, হাড্ডি, চুল, চামড়া সবুজকে আরও রঙিন করবে। আমি হবো সার, তুমি উর্বর বৃক্ষ। বৃক্ষের কঠিন হৃদয় থেকে আমি ফুটাবো মনোসিক্ত বনফুল। তোমার মন সিক্ত হবে, বিজ্ঞান সত্য হবে, আরও ভাব আরও চিন্তা তৈরি হবে। ভাবের অভাবে অনাবিষ্কৃত থেকে যাবে পাহাড়-সমুদ্রের হৃদয়। ঢেউ ডাকে আমাক গোপনে চোখের ইশারায়। নীল ধূসরতা, সফেন ফেনা, ভিজে বালি। আহা, সবুজ রঙিন সবুজ। এই ঝিরিঝিরি তিরিতিরি গুঞ্জন, শিরশির বাঁশী। আসলে সব নিরবতা,আসলে সব ভাষা। সব দৃশ্যঅদৃশ্য সুন্দরঅসুন্দর সব ভাষার কারবার।
কোভিড উনিশের লক ডাউনে, এই বর্ষায় নিরবতা গভীরতা এখানে ফুটিয়েছে অসহ্য সুন্দর; ঝরে ঝরে পড়ে প্রিয় আবেশ, আবেদন। বৃক্ষের সবুজে নেশা ধরে, নীলের গহন, কল্পনা যত গভীরে ডুবতে পারে ডুবে যায়। এই ভূস্বর্গে পৃথিবীর রূপ-সুধা, রূপরেখায় মেঘের বুকে উড়িয়ে দিই আমার মনোদৃষ্টি। পৃথিবীর এ প্রান্তে প্রকৃতির ময়ূর ও মেলে দিয়েছে পেখম, বর্ষায় ভিজেছে মাটি, সিক্ত বৃক্ষ লতা ঘাস। হলুূদ ফুলের দেশে ফুল ও মৌমাছির গুঞ্জরণ, হলুদ ফুলের কন্যা এসো, এখানে এসো, সবুজে নীলে তারুণ্যের হৃদয়ের ফুল ফুটাই। সবুজ গলে যায়, নীল গলে যায়, আমি গলে যেতে চাই, এসো এসো হলুূদিয়া পাখি, ডাকো, বউ কথা কও, ডাকো, ডেকে ডেকে নিয়ে আসো জগত অতিথি। তোমার মসৃণ পালকে এখানে ওম দাও, তোমার স্তনভূমিজুড়ে যে পুষ্টি যোগানো আছে, আমার মৃত্তিকায় তা আর ও ঢেলে দাও, ঢেলে দাও সুন্দর। সবুজের চোখে দেখলে পৃথিবীতে হাজার বছর বাঁচতে ইচ্ছে করে, বাস্তবের চোখে পৃথিবী কত ছোট! এই ছোট জীবন, দিশা-বিদিশা। এসো, এসো ঝিনুক কন্যা, মিশে যাই, মিশে যাই, মিশিয়ে দাও সুন্দরের বিহ্বল বেদনায়। কতদিন বাঁচি আমরা। বঙ্গোপসাগর তীর থেকে ডাক দিতে ইচ্ছে হয় আমার একটি নতুন পৃথিবীর, মানবিক পৃথিবীর নির্মাণের জন্য নতুন রেনেসাঁ, নতুন বিপ্লবের। কিন্তু এখানে কেউ সময়ের বেদনা বুঝে না। ব্যক্তির বিকাশও এখানে রুদ্ধ, সামষ্টিক স্বপ্নও দেখতে জানে না কেউ। সে পথে ব্যক্তিগত সম্পদ সবচেয়ে ক্ষতি করেছে। ব্যক্তিক, শ্রেণির দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে আর কিছুই দেখতে পারে না। এ এক বড় জট। বিপ্লব কি জানো বঙ্গোপসাগরীয় সন্তানসন্ততি? রেনেসাঁ কাকে বলে জানো? রেনেসাঁস হচ্ছে শুধু জানা, পড়া, অর্জন করা, নিজেকে সমৃদ্ধ করা, উন্নত করা, রুচি তৈরি করা, বেদনা, কষ্ট হজম করতে শেখা, রাজনীতি সম্পর্কে বুঝাপড়া করতে শিখা । আর বিপ্লবে সেই সুন্দর প্রয়োগ করে, অসুন্দর পৃথিবীর দখল নিয়ে তাকে সাজানো, মানুষের যত সম্ভাবনা আছে, তার বিকাশের জন্য যা সম্ভম তা করা। প্রিয় বঙ্গোপসাগরীয় সন্তান-সন্ততি এ পথের প্রধান বাধা আমরা নিজেরা। আমরা চাই না নতুন কোন জীবন, নতুন কোন রেনেসাঁস। অভ্যস্ত জীবনের ঝলোমলো আঙিনায় আমরা সেজেগুজে থাকবো। নতুন জীবনকে নতুন বসন্ত কে স্বাগত জানাতে পারি না।
দীর্ঘভূমি, উপত্যকা আর তার বুকে বেড়ে ওঠা প্রকৃতির সম্তান আমরা। মধু ও বিষ পান করি, সবুজে ভেসে থাকি, নীলে ডুবে যাই। বঙ্গোপসাগরের ইউরেখা দিয়ে ঘিরে রাখা এই সঘন স্বর্গে, সৃষ্টির রূপরেখা যিনি দিয়েছেন তার কথা ভেবেছি আমি।
এই প্রান্ত উপত্যকার ঝিরিঝিরি শব্দবাঁশী, সাগরের প্রাগৈতিহাসিক গর্জনের দ্বান্দ্বিকতা; লতায় পাতায় জড়ানো আবেশ
এখানে ঝরে ঝরে পড়ে। উরু উপত্যকায়, ভ্রু ভঙির নীল বারান্দায় ঝিনুকিনী তোমার আবেশের ঢংয়ে আমি আবেশিত হই। এখানে ঘুরেছি। আজ বার জুলাই। কোন বাধা না মেনে, একটি ছোট্ট মোটরবাইকে করে, আমি ও মোহাম্মদ বিন ম্যাক্স এ মধুর হৃদয়জগত ঘুরে বেড়াচ্ছি, ঘুরে বেড়াচ্ছি এ বাস্তবতার জগত। বৃক্ষে বৃক্ষে পাহাড়ি পাখির ডাক, গুল্মের আকর্ষণ।
সাগরের ঘননীল, আকাশের ঘাঢ় নীল আর উপত্যকাজুড়ে সবুজ রঙিন। আকাশে মেঘের ভরা মজমা।
ঘুরেছি রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্প। তিন বছর আগের রোহিঙ্গা ক্যাম্প আর আজকের রোহিঙ্গা ক্যাম্পের কত পরিবর্তন। জাতিসংঘের অংশরীদার প্রতিষ্ঠানগুলো (এনজিও) এ অঞ্চলের চেহারায় পাল্টে দিয়েছে। পাহাড় এখন সাজানো-গোছানো, ব্রিজ কালভার্ট পিচ করা রাস্তা, ঝকঝকে তকতকে মসৃণ। রাস্তায়, পাহাড়ের গলি গুফচিতে রোহিঙ্গা নরনারীর জটলা। ভবিষ্যতহীন মানুষের চোখে দৃষ্টিহীন এই পৃথিবী, গণহত্যায় আহত রোহিঙ্গা, প্রিয়জন হারানো রোহিঙ্গা, মায়ানমারের জেলখানায় বন্দি রোহিঙ্গা। আশাহীনতায় বেড়ে ওঠা রোহিঙ্গা, ক্যাম্পের রোহিঙ্গারা এসব স্মৃতি বুকে নিয়ে এখানে বেঁচে থাকে। পাহাড় আকাশ এখানে নির্মল সুন্দর, সবুজ এখানে বেহুশ করে দেয়। এখানে জটলা বাধে কৌশলী রোহিঙ্গা। আমি সবুজ নীলের এই রাজ্যে ঘুরি, কি নীলাভ আকাশ, সাদা মেঘের বেদনা আচ্ছন্ন করে রাখে যে কাউকে। এ প্রকৃতি এ পরিবেশ এ বঙ্গোপসাগরীয় উপত্যকাকে স্বর্গ করে গড়ে তুলেছিল। এ পাশে বাংলাদেশের পাহাড়, টিলা, ঐ পাশে মায়ানমারের পাহাড় উপত্যকা। পৃথিবীর প্রান্তের এই দিগন্তের শেষ সীমানা আমার জন্মভূমি, আমার জন্মভিটে, আমার আঙিনা। সারাদিন এখানে সবুজের বুকে চোখ ডুবিয়ে কেটে দেওয়া যায়, সারাদিন এখানে অবাক আকাশে দিগন্তের খোঁজে হয়রান হওয়া যায়। একটি অপূর্ণ বেদনা বুকে নিয়ে ফিরে আসতে হয় ঘরে।

আজ সারাদিন বঙ্গোপাসাগরের তীরে, আমরা মন উড়িয়েছি। বাজিয়েছি বঙ্গোপসাগরের বাঁশী। আজ সারাদিন এই ভূ-ভাগে বেদনা পুড়িয়েছি। কি সৌভাগ্য আমাদের। কাশ্মিরের উপত্যকার মত এখানে কোন রাজনৈতিক সীমানা ও ভূখন্ড নিয়ে রাষ্ট্রবিরোধ নেই। অন্তত দেশের নাগরিক হিসেবে আমরা ঘুরছি পাখির স্বাধীনতা নিয়ে। সবুজে এঁকেছি স্বর্গ। কয়েকজন রোহিঙ্গা নারীর সঙ্গে কথা বলে বুঝেছি স্বর্গীয় হুর এদের চেয়ে বেশি সুন্দর হবে না কেন! যেন ফুটে আছে বসরার গোলাপ, আমি সেই রক্তগোলাপকে মনে মনে বনে বনে ছিড়তে চেয়েছি, আমি জীবনানন্দের ‘অন্ধকার’ কবিতার মতো মিশে যেতে চেয়েছি, তার স্তনে, যোনিতে, তখনই আমাকে ডেকেছে বঙ্গোপসাগরীয় পাহাড়ি তিতির। বঙ্গোপসাগরীয় বেদনার কন্যা। দুইজনই বঙ্গোপসাগরীয় বেদনার কন্যা। একটি ইরাকের বসরার গোলাপ, আরেকটি সিরাজের রক্ত গোলাপ। হাফিজ যার পান করেছিল, আধ্যাত্মিক মধু ও মিষ্টতা। আমি ও পান করেছি তা। আমার হৃদয় তাই বুঝি এতো বেশি গতিময়, আবেশিত তরতাজা।

লেখক: মনির ইউসুফ,

সভাপতি- কবিতার রাজপথ , প্রধান সমন্বয়ক-বিপ্লবী লেখক আন্দোলন

Sharing is caring!

Related Articles

Back to top button