বাইনোস্লেড কোবরা / খইয়া গোখরা: আব্দুল্লাহ মারুফ

চলতি বর্ষায় যাদের থেকে সাবধান থাকবেন- ২

 

আমার ছোটবেলায় আমাদের বাড়ির উত্তবের ভিটেই আমার দাদীর খুব উচু মেঝের মাটির দেয়ালের পুরাতন টিনের ঘর ছিলো, এই ঘরকে আমরা বলতাম দাদীঘর। পশ্চিম ভিটেয় ছিলো আমার মায়ের ঘর, পুব দিকে ছিলো মেজে চাচীর ঘর। সব ঘরই ছিলো অনেক উচু । গ্রামের সব ঘর-বাড়িই ছিলো মাটির তৈরী। একটু যারা অবস্থাপন্ন পরিবার তারা চেষ্টা করতো যতটা সম্ভব উচু করে ঘর বানাতে, হয়তো এর পেছোনে কাজ করতো বর্ষা-বন‍্যার চিন্তা, যদিও আমাদের গ্রামখানি অনেকটাই উচু, পাশে কুমার নদ থাকায় সচরাচর বর্ষার পানিতে গ্রাম কোনো দিনই পুরোপুরি ডুবে যায়না, বর্ষায় পানি জমলেও দু’চার দিনেই পানি নেমে যায়।

আমার জন্মের অনেক আগেই দাদা মারা গেছেন । আমার যখন দেড় বছর বয়স তখন দাদী মারা গেছেন। দাদী মারা যাওয়ার পর থেকে দাদীর ঘরটি কিছুটা অযত্নে অর্ধ পরিত‍্যাক্ত হয়ে যায়, পরে পুরোপুরি। ঘরের এক খোপে আমার চাচাত ভাই থাকতো, আর এক খোপে থাকতো আমার ভাই। তারা দুজনই ছিলো অবিবাহিত।
দাদীঘরের বয়সও অনেক বেশি হয়ে গিয়েছিলো, নিয়মিত পরিচর্যার অভাবে ঘরের ডোয়ায় নোনা ধরে গিয়েছিলো।

প্রায় প্রতি বছরই দাদীঘরে সাপ বাঁসা বাধতো, কখনো সাপের টাটকা খোলশ পাওয়া যেতো, কখনো পাওয়া যেতো সাপের বাচ্চা, আবার কখনো মারা পড়তো বড় বড় কুলীন সাপ, আমাদের দিকে গোখরা সাপের আঞ্চলিক নাম হলো- কুলীন সাপ, আর এক নাম হলো- জা’ত সাপ বা জাতি সাপ। ছোটবেলায় আমরা দাদীঘরে উঠতেই ভয় পেতাম। বাড়ীর সবাই দাদীঘরকে খানিকটা এড়িয়ে চলতে চেষ্টা করতো বলে মনে হতো, আমি অবশ‍্য কখনো অতটা মানিনি, কারন দাদীঘরের পেছোনে ছিলো দুটো বেল গাছ, একটা পুরাতন কদবেল গাছ, একটা ছিলো হা’ড়ে বেল। বেল গাছের নিচে সব সময় কিছুটা আগাছা থাকতই, এই আগাছার ভেতর পড়ে থাকতো গাছে পাকা বেল! খুব ছোট বেলা থেকেই বেল পাকার মৌশুমে প্রতিদিন খুব সকালে সবার আগে ঘুম থেকে উঠে আমার বেল কুড়াতে যাওয়া চাই, কোনো ভয়ই আমাকে সেই গাছে পাকা বেল থেকে দুরে রাখতে পারেনি! বেল কুড়াতে গিয়েই আমি প্রথম কুলীন সাপের মুখোমুখি হই অনেক ছোট বেলায়। দেখেই দে দৌড়.. পরে বড়দের ডেকে এনে আর সেই সাপ খুজে পাওয়া যায়নি। তবে আমার স্পষ্ট মনে আছে সেই বড় সাপটার ফনার পেছনের দাগটার কথা ! গ্রামের মানুষ এই দাগকে বলে খড়মের দাগ, কেউ বলে গরুর খুরের দাগ । একবার দাদীঘরের দরজার চৌকাঠের নিচ থেকে বের করা হলো এগারোটা কুলীন সাপের বাচ্চা, সেই বাচ্চাগুলোর ছোট্ট ফনার পেছনেও দেখলাম সেই একই রকমের চিহ্ন।
স্মৃতির সাথে এখন মিলিয়ে দেখি সেই দাগটা ছিলো ইংরেজি ভি বর্ণের মত, বা গরুর খুরের মত সামনের দিকে দুইদিকে ফাকা ! প্রচলিত ধারণামতে এই গরুর খুরের দাগ থেকেই এই সাপের নাম হয়েছে গো-খুরো বা গোখরা ।

এই খুরের দাগ দেখেই গোখরা সাপের দুটো প্রজাতী মনোস্লেড কোবরা বা পদ্ম গোখরা আর বাইনোস্লেড কোবরা বা খইয়া গোখরা কে সহজে আলাদা করে চেনা যায়।
সব সময় বাইনোস্লেড কোবরার ফনার পেছোনের যে দাগ সেটা হবে ইংরেজি ভি বর্ণের মত বা গোরুর খুরের মত সামনের দিকে ফাকা, মানে দুই খুরের মাথা একসাথে কখনোই মিলবে না, মাঝখানে ফাকা থাকবেই ।
মনোস্লেড কোবরা বা পদ্ম গোখরার ক্ষেত্রে সবদিক একসাথে মিলে যাবে। এটাই দুই প্রজাতীকে আলাদা করে চেনার সহজ উপায়। এছাড়াও বাইনোস্লেড কোবরাদের গলায় মনোস্লেড কোবরাদের মত কোনো কালো ব‍্যান্ড থাকবে না।

বাইনোস্লেড কোবরা প্রায় সারাদেশেই কমবেশি পাওয়া যায় তবে আমাদের অঞ্চলের প্রধান বিষধর সাপ এটাই । আমার জীবদ্দশায় আমার গ্রামে এ পর্যন্ত এই সাপের কামড়েই দুইজনের মৃত‍্যু ঘটেছে, অন‍্য কোনো সাপের কামড়ে আমার বয়সে এখনো কারোর মৃত‍্যু হয়নি। গত বছর আমাদের মাঠ থেকে সাপে কেটে পাশের গ্রাম ভবানীপুরের একজন মারা গেছে, তবে এই ক্ষেত্রে সাপটি কোন জাতের ছিলো সেটা জানা যায়নি।
বর্ষাকালে বাইনোস্লেড কোবরাদের মানুষের ঘরে বাঁসা বাধার প্রবনতা দেখা যায়, আবার ডিম পাড়তেও এরা মানুষের ঘরে বাঁসা বাধে। শীতকালে হাইবারনেশন করতেও এরা মানুষের ঘরের ইঁদুরের গর্তে আশ্রয় নিতে পারে, ঘরে ইঁদুর থাকলে ইঁদুর শিকারের লোভে মানুষের ঘরে ওঠে, যদি কেউ মুরগী পালে তবে মুরগীর ডিম-বাচ্চা শিকার করতেও এরা মানুষের ঘরে ঢুঁ মারে, অনেকবার দেখেছি গ্রামের অনেকের মুরগীর ঘর, মুরগীর টব, কবুতরের ঘর বা মানুষের ঘরে মুরগী থাকলে সেই ঘরে সাপ উঠতে । আমাদের বাড়িতেও দেখেছি, পাশের বাড়িতেও দেখেছি। প্রতি বছরই দু’চারটি সাপ আমার গ্রাম বা গ্রামের মাঠ থেকে মারা পড়তে দেখি, যার বেশিরভাগই বাইনোস্লেড কোবরা বা খইয়া গোখরা।
দু’একবার মাত্র দেখেছি পদ্ম গোখরা।

ভালো খবর হলো অত‍্যন্ত বদ মেজাজি সাপ হওয়া স্বত্তেও বাইনোস্লেড কোবরারা মানুষকে যত কামড় বা ছোবল দেয় তার শতকরা পচাশি (৮৫℅) ভাগই ড্রাই বাইট করে বা কামড় দেয় কিন্তু বিষ প্রয়োগ করে না ! এটা সায়েন্টিফিক‍্যালি প্রমানিত। আবার গোখরা সাপের অন‍্য প্রজাতী পদ্ম গোখরা শতকরা নব্বই ভাগ ক্ষেত্রে ড্রাই বাইট করে। এই দুই প্রজাতীর সাপ বেশিরভাগ সময় মানুষকে ভয় দখিয়ে তাড়িয়ে দিতে কামড় দিয়ে ছেড়ে দেয়, সাপেরা এটা করে তার নিজের স্বার্থেই, সাপেদের শিকারের বা খাবারের শরীরে থাকা হাড়-মাংশ হজম করতে তাদের বিষের প্রয়োজন হয় বলে তারা বিষ সংরক্ষন করে। এই হিসেবে যেকোনো গোখরা সাপে কাটা রোগীদের শতকরা কমপক্ষে পচাশিজন রোগীর সুস্থ হয়ে যাওয়ার কথা। এখন প্রশ্ন হলো তাহলে সাপে কাটা রোগীর বেশির ভাগেরই মৃত‍্যু হচ্ছে কেনো ? গবেষকরা গবেষণায় প্রমান করে করে দেখাচ্ছেন সাপে কাটা বেশিরভাগ রোগীই মারা যাচ্ছে ভয় পেয়ে হার্ট ফেল করে, সাপের বিষের প্রভাবে নয় !

আপনার আশপাশে কারও সাপে কাটলে তাকে অভয় দিন এবং শান্ত রাখার চেষ্টা করুন।
রোগীকে হাটাচলা করা থেকে বিরত রাখুন, এতে রক্ত চলাচল কম হবে, রোগীকে শুইয়ে দিয়ে তিন/চার ইঞ্চি চওড়া গামছা বা যেকোনো চওড়া কাপড় দিয়ে কম টাইট করে বেধে দিন ক্ষতস্থানের উপরে। রশি বা চিকন ফিতা দিয়ে শক্ত করে বাধা যাবে না, এতে রোগীর যে হাত বা পা বাধা হয়েছে সেটাতে দীর্ঘক্ষন রক্ত চলাচল বন্ধ থেকে রক্ত জমাট বেধে সেল/টিস‍্যু মরে গিয়ে বেধে রাখা হাত বা পা পুরোপুরি অচল হয়ে যাবে এবং ঐ হাত বা পা কেটে বাদ দিতে হবে। অথচ এমনটা হতে পারে যে ঐ রোগীকে সাপে কোনো বিষই প্রয়োগ করেনি।
এমন ভাবে বাধবেন যেনো সব সময় বাধনের ভেতর আপনার একটি আঙুল ঢোকানো যায়। বিষ প্রয়োগ হলে বাধন কখনোই পুরোপুরি বিষ আটকাতে পারবে না। বাধনের উদ্দ‍েশ‍্য হলো কিছুটা রক্ত চলাচল কমিয়ে দিয়ে চিকিৎসার জন‍্য কিছুটা বাড়তি সময় পাওয়া। রোগীকে স্থানান্তর করুন চ‍্যাংদোলা করে।এতেও হাটানোর থেকে রক্ত চলাচল কম হবে।

বাইনোস্লেড কোবরা বা খইয়া গোখরার বিষও পদ্ম গোখরার মতই দুই ঘন্টা পরে বিষক্রিয়ার লক্ষন প্রকাশ করে।

এক মুহুর্ত সময় নষ্ট না করে রোগীকে সোজা আপনার নিকটস্থ সরকারী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান, মনে রাখবেন আপনার হাতে সময় মাত্র দুই ঘন্টা ! এর ভেতরেই আপনার রোগীকে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পৌছোতে চেষ্টা করুন।

এখন পর্যন্ত শুধুমাত্র সরকারী মেডিকেল কলেজগুলোতেই সাপের বিষের এন্টি ভেনম এবং এবিষয়ে পর্যাপ্ত ট্রেনিং প্রাপ্ত চিকিৎসক এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব‍্যাবস্থা একসাথে পাবেন। উপজেলা স্বাস্থ কমপ্লেক্সগুলোতে সাপে কাটা রোগীর কোনো চিকিৎসা এখনো নেই। জেলা সদর হাসপাতালগুলোতে এন্টি ভেনম থাকলেও অন‍্যান্ন সমস‍্যা এখনো পর্যন্ত রয়েই গেছে অনক ক্ষেত্রেই। যদি তারা চিকিৎসা দিতে না পেরে রোগীকে মেডিকেল কলেজে রেফার তবে আপনার খুব গুরুত্বপুর্ণ সময় নষ্ট হয়ে গেলো যেটা রোগীর মৃত‍্যুর কারন হয়ে যেতে পারে, অতএব একবারেই সোজা মেডিকেল কলেজে যাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ মনে করি।

সব ধরণের ওঝা/বদ‍্য/ গাছ-গাছ‍ড়া বর্জন করুন, এতে শ‍ুধুমাত্র মহামুল‍্যবান সময় নষ্ট হয়ে রোগীর মৃত‍্যু ত্বরান্মিত হওয়া ছাড়া কিছুই হবে না।

সময়মত সঠিক চিকিৎসা পেলে আপনার রোগী সুস্থ হয়ে যাবে।

আমরা সচেতন হলে সাপের কামড়ে মানুষের মৃত‍্যুর হার অনেক কমে আসবে।
আশা করা হচ্ছে আগামী দু’এক বছরের মধ‍্যে দেশের সকল উপজেলা পর্যায়ে সাপে কাটা রোগীদের পুর্ণাঙ্গ চিকিৎসা পৌছে যাবে ।

যেকোনো সাপই আমাদের প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম‍্যের জন‍্য অত‍্যন্ত গুরুত্বপুর্ণ প্রাণী, সাপ দেখলেই মেরে না ফেলে তাড়িয়ে দিন, অথবা নিকটবর্তী রেসকিউয়ারকে খবর দিন।

চলতি বর্ষায় আপনার বাড়ির পাশের ঝোপ-জঙ্গল পরিষ্কার রাখুন। মাসে একবার বাড়ির চারপাশে ব্লিচিং পাউডার ছিটিয়ে দিন, এতে আপনি আশি শতাংশ নিরাপদ থাকবেন।

ঘুমানোর আগে আপনার বিছানাপত্র ঝেড়ে নিয়ে মশারী টানিয়ে ঘুমান ।

লেখক: আব্দুল্লাহ মারুফ

কবি ও পরিবেশ কর্মী

Sharing is caring!

Related Articles

Back to top button