বাঁধ ভাঙ্গার গল্প:পূর্ণোপমা কর্মকার, সবুজ পৃথিবী

(দুই বাংলার জন্যই লেখাটি সমান প্রাসঙ্গিক  পশ্চিমবাংলার শিক্ষামূলক ওয়েবসাইট সবুজ পৃথিবীর সৌজন্যে ও অনুমতিক্রমে গ্রীন নিউজের পাঠকদের জন্য প্রকাশ করা হলো)

সুন্দরবন হলো বঙ্গোপসাগরের গঙ্গা, ব্রক্ষ্মপুত্র, এবং মেঘনা নদীর সঙ্গমে গঠিতব-দ্বীপের একটি ম্যানগ্রোভ অঞ্চল। এটি ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের হুগলি নদী থেকে বাংলাদেশের খুলনা বিভাগের বালেশ্বর নদী পর্যন্ত বিস্তৃত। মোটামোটি ভাবে, সুন্দরবন অঞ্চলের ৬০% পড়েছে বাংলাদেশে (৬০০০ বর্গ কি.মি.) এবং বাকী ৪০% পড়েছে ভারতে (৪০০০ বর্গ কি.মি.)। সুন্দরবন বাংলাদেশের খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, পটুয়াখালী, ও বরগুনা জেলা জুড়ে বিস্তৃত এবং ভারতের উত্তর চব্বিশ পরগনা ও দক্ষিণ চব্বিশ পরগণা জেলা জুড়ে বিস্তৃত। সুন্দরবনের গুরুত্বের কথা বলে শেষ করা যাবেনা। বাংলাদেশ, ভারত উভয় দেশের জন্যই সুন্দরবন অশেষ গুরুত্ব বহন করে। সুন্দরবনকে বাংলাদেশের ফুসফুস বলা হয়। সুন্দরবন শুধুমাত্র প্রাকৃতিক নয়, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবে এর এক তৃতীয়াংশই তো মধ্যে হ্রাস পেয়েছে যার ফলস্বরূপ বাংলাদেশে মারাত্মক পরিবেশগত হুমকির সৃষ্টি হচ্ছে। বাংলাদেশের মোট বনাঞ্চলের ৪০%  ই সুন্দরবনে রয়েছে। সুন্দরবন বাংলাদেশের প্রাকৃতিক রেলিং হিসেবে কাজ করে। এই বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন উপকূলীয় ক্ষয়, সুনামি, এবং জলোচ্ছ্বাস থেকে বাংলাদেশকে রক্ষা করে। সুন্দরবন কলকাতা মেট্রোপলিটন শহরকেও বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষাকরে। সুন্দরবনের গুরুত্ব ও এর স্বাতন্ত্রের কথা বিবেচনা করে ইউনেস্কো ১৯৮৭ সালে ভারতীয় অংশকে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে ঘোষনা করে। পরবর্তিতে ইউনেস্কো ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশ অংশকে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে ঘোষনা করা হয়।

প্রায় ১৭০-১৭৫ বছর আগে ইংরেজরা সন্দরনের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ইজারা দেয় এবং মেদিনীপুর ও বর্তমান বাংলাদেশের যশোর, খুলনা, থেকে প্রচুর ভূমিহীন মানুষ সুন্দরবনে বসত গড়ে তুলতে আসেন। প্রথমেই তারা ম্যানগ্রোভ জঙ্গল সাফ করে যাবতীয় বন্যপ্রানী দের বিতাড়িত করে আর তারপর তা রাজোয়ার আর কোটালের জল যাতে দিনে দুই বার ঢুকে পড়ে চাষবাস আর বসবাসের জমি ভাসিয়ে না দেয় তাই নদীর তীর বরাবর বাঁধ তৈরি করেন। কারন তারা যেখানে বসবাস করতে শুরু করেছিলন সেই জায়গা গুলি কোন দিনই মাটি ফেলে এত উঁচু করা সম্ভব হয়নি যাতে জোয়ারের জল ঢোকা আটকানো যায়, আর নদীর লবণাক্ত জল ঢুকলে চাষাবাদ করা সম্ভব হবেনা, পানীয় জল ও পাওয়া যাবেনা। তাই যত গুলো দ্বীপে মানুষ বসবাস করা শুরু করল, ১০২ টা দ্বীপের মধ্যে ৫৪ টা দ্বীপেই বড়বড় মাটির দেওয়াল বা বাঁধ দেওয়া হলো। আর মানুষের জীবন ধারনের ব্যাবস্থা করতে গিয়ে নষ্ট করা হলো ম্যানগ্রোভের জঙ্গল। ফলস্বরূপ এই স্বাভাবিক জোয়ার ভাটায় পলি আসা বন্ধ হয়ে গিয়ে পার্শ্ববর্তী জঙ্গল এলাকার তুলনায় এই মানুষ গুলোর বসবাসকারী দ্বীপ হয়ে গেল আরও নিচু আর স্বাভাবিক জোয়ার ভাটায় বাধা পাওয়ায় নদী গুলোর চরিত্রও পাল্টাতে থাকে, কোথাও পাশের দিকে চওড়া আবার কোথাও সরু হতে থাকে। কিন্তু বছরে ২০ মিলিয়ন টন পলি বহন করে নিয়ে আসছে গঙ্গা নদী, সেটা হুগলী মাতলা মোহনা অঞ্চলে এইভাবে বাধা প্রাপ্ত হয়ে আঁকাবাঁকা হয়ে নদীখাতের নানান অংশে জমতে থাকে, কিন্তু তার উল্টো দিকেই জলের তোড়ে বাঁধের মাটি তলা থেকে সরে গিয়ে ভাঙতে থাকে পাড়। কিন্তু প্রতি বছর নদীবাধ মেরামত করা হলেও নদী ও প্রকৃতি কার ও কথা শোনে না। যে বিপুল ম্যানগ্রোভ অরণ্য এই দ্বীপ গুলির পাশে জলের কাছে ছিল, অধিকাংশ জায়গায় তা আর নেই অনেক বছর ধরে। আর ভাঙনের হারও সব জায়গায় সমান নয়। বহু জায়গায় নদী বাধ সাংঘাতিক ভঙ্গুর অবস্থায় পড়ে আছে বছরের পর বছর আর তার পাশেই চরম অনিশ্চিত জীবন কাটাচ্ছে সুন্দরবনের মানুষ।

সিডর, আইলা, আম্পান, বুলবুল, ফনি এবং সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ইয়াস, এই সব দুর্যোগে সুন্দরবন বাংলাদেশ ও ভারতে পশ্চিমবঙ্গের মানুষকে আপোষহীন ভাবে রক্ষা করে চলেছে। বাংলাদেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রান মন্ত্রণালয় এর হিসেব মতে, ইয়াসের প্রভাবে জোয়ারের জল বেড়ে উপকূলীয় ৯ টি জেলার ২৭ টি উপজেলায় ক্ষতি হয়েছে। সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর, আশা শুনি, কালিগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় বেড়ি বাঁধ ভেংগে লোকালয়ে জল ঢুকে গিয়েছে। অতিপ্রবল ঘুর্ণি ঝড় ইয়াস বাংলাদেশ উপকূলে সরাসরি আঘাত না আনলেও স্বাভাবিকের চেয়ে বেশী জোয়ারে অধিকাংশ এলাকায় বাধ ভেংগে বাড়িঘড়, মাছের ঘের, ফসলি জমি ডুবে গিয়েছে। খুলনা জেলার কায়রা, পাইকগাছা, দাকোপ ও বাটিয়াকোপ উপজেলার অন্তত ১০ টি স্থানে বাধ ভেঙেছে এবং উপকূলীয় মোট ২৭ কি.মি. বেড়ি বাঁধ ভেংগে গিয়েছে। এদিকে ভারতের দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার কাকদ্বীপ, নামখানা, ধামাখালি, গোসাবা, কুলপি, ক্যানিং সর্বত্র বাধ ভেংগে গ্রামের পর গ্রাম ভেসে গিয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১৩৪ টি বাঁধ ভেংগেছে, যার প্রায় বেশীর ভাগই দক্ষিণ চব্বিশ পরগণায়।

তবে কিছু কিছু উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে যা উপকূলীয় মানুষ গুলোকে অসীম ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করতে পারবে। যেমনঃ

প্রাকৃতিক বাঁধ তৈরি করাঃ
ম্যানগ্রোভ চারা লাগিয়ে প্রাকৃতিক বাধ তৈরি করা যেতে পারে। যদিও তা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। প্রধান নদী বা ডাইকের সামনে ম্যানগ্রোভ অরণ্য তৈরি করতে হবে। আর সেটা করতে হবে ম্যানগ্রোভের স্বাভাবিক সাকশেসন অনুযায়ী যেমনঃ ধানী ঘাষ, বানি, খলসে, গোলপাতা, কেওড়া, গর্জন, কাঁকড়া, ধুঁধল, পশুর, সুন্দরী, গেওয়া। ম্যানগ্রোভ অরণ্যের অন্যতম বৈশিষ্ট হলো এই সব গাছের গুড়ি গুলো যেমন তীরের দিকে ধাবমান জলের স্রোত কমায়, তেমনি তীব্র ঝড়ের বা প্রবল জোয়ারে তার জলের বাইরে বেরিয়ে থাকা বড়বড় ক্যানোপি গুলো উঁচউঁচু ঢেউ গুলোকে আটকে দেয়। কনক্রিটের তৈরি বাঁধের থেকেও এই বাঁধ বেশি কার্যকর হবে।

প্রবল বাতাস ও সল্ট স্প্রেরোধী গাছঃ
উপকূলবর্তী অঞ্চলে ট্রপিকাল সাইক্লোনের বিপুল হাওয়ার বেগ প্লাবন আনে তাই নয়, বিপুল পরিমান সল্ট স্প্রে আর লবণাক্ত এরোসল তৈরি করে যা ভূমি থেকে বহু কিলোমিটার উপরে উঠতে পারে যা গাছের পাতা ও মুকুলে নেক্রোসিস তৈরি করে গাছের পাতা হলুদ করে দেয়। এই এরোসল যদি মাটিতে পড়ে গাছের মূলতন্ত্রে প্রবেশ করে তা হলে গাছ শুকিয়ে যাবে। ফলস্বরূপ গাছ মারা যায়। এই জন্য বিশেষ কিছু গাছ যেমনঃ কাজুগাছ, নিমগাছ, দইগোটা, তাল, নারকেল, ঝাউ, দেশীতুলা, সমুদ্রজবা এই সব গাছ বপন করা যেতে পারে যা প্রবল ঝড়ও সল্ট স্প্রেরোধী।

সরকারের সদিচ্ছাঃ
বিশ্ব উষ্ঞায়নের প্রভাবে সুন্দরবন অঞ্চল আজ গভীর সংকটে। এই সব অঞ্চলে প্রাকৃতিক বিপর্যয় হবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এই জন্য চাই দুই বাংলার সরকারেরই সদিচ্ছা ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা,  করতে হবে ক্লাইমেটরিজিলিয়ান্ট প্লানিং।

লেখক: পূর্ণোপমা কর্মকার, সবুজ পৃথিবী

Sharing is caring!

Related Articles

Back to top button