মাতৃভাষা বাংলায় আবহাওয়া বিজ্ঞান চর্চা (পর্ব ৩): মোস্তফা কামাল পলাশ

কালবৈশাখী ঝড় সৃষ্টির বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা ও কালবৈশাখী ঝড় সৃষ্টির প্রধান উপকরণ গুলো কি কি

মাতৃভাষা বাংলায় আবহাওয়া বিজ্ঞান চর্চা (পর্ব ৩: কালবৈশাখী ঝড় সৃষ্টির বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা ও কালবৈশাখী ঝড় সৃষ্টির প্রধান উপকরণ গুলো কি কি? )

চলুন জেনে নেই কালবৈশাখী ঝড় সৃষ্টির বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা ও কালবৈশাখী ঝড় সৃষ্টির প্রধান উপকরণ গুলো কি কি?

আগামীকাল থেকে আবারও দেশের বিভিন্ন স্থানে কালবৈশাখী ঝড় শুরু হবে ও এপ্রিল মাসের ২৯ তারিখ থেকে দেশব্যাপী শক্তি কালবৈশাখী ঝড় শুরু হবে। মে মাসের ১ ও ২ তারিখে প্রায় সারা দেশে কালবৈশাখী ঝড় হওয়ার সম্ভাবনা নির্দেশ করতেছে আবহাওয়া পূর্বাভাষ মডেল গুলো। ১ সপ্তাহ পূর্বেই আবহাওয়া পূর্বাভাষ মডেলগুলো কেমন করে বলতে পড়তেছে কালবৈশাখী ঝড় সৃষ্টি হবে তার কিছু ব্যাখ্যা দিচ্ছি নিচে:

কালবৈশাখী ঝড় সৃষ্টির জন্য প্রধানত ৩ টি উপাদান দরকার।

১) ভূ-পৃষ্ঠের তাপমাত্রা অত্যধিক বেশি থাকা যার কারণে ভূ-পৃষ্টের উপরের বায়ু গরম হয়ে বায়ুর ঘনত্ব কমে যায় ও কোন স্থানের বায়ু হালকা হয়ে পরে ও যথেষ্ট অস্থিতিশীল হয়ে আকাশে উঠে গিয়ে মেঘের সৃষ্টি করে। আপনারা ইতিমধ্যেই জেনেছেন যে গতকাল যশোর জেলায় প্রায় ৪২ ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রা উঠেছিল যা নাকি গত ১২ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। আজকেও দেশেই অনেক স্থানে ৪০ ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রা উঠবে বলে মনে করি। এই রেকর্ড ব্রে-কিং তাপমাত্রার কারণে ঐ সকল স্থানের বায়ুর ঘনত্ব কমে গিয়ে আকাশে উঠে যাচ্ছে ও ঐ স্থানের বায়ুর স্থান দখল করতে বঙ্গোপসাগর থেকে জ্বলিয় বাস্পযুক্ত বায়ু বাংলাদেশে ও ভারতে পশ্চিম বঙ্গের স্থল ভাগে প্রবেশ করা শুরু করেছে। শক্তিশালী কালবৈশাখী ঝড়ের মাধ্যমে ঐ সকল স্থানের বাতাস ঠাণ্ডা না হওয়া পর্যন্ত বঙ্গোপসাগর থেকে জ্বলিয় বাস্পযুক্ত বায়ু বাংলাদেশে ও ভারতে পশ্চিম বঙ্গের স্থল ভাগে প্রবেশ অব্যাহত থাকবে।

২) বায়ুতে পর্যাপ্ত পরিমাণে জ্বলিয় বাষ্পের উপস্থিতি থাকা। মার্চ ও এপ্রিল মাসের শুরুর দিকের কালবৈশাখী ঝড়গুলো হতে খুব বেশ বৃষ্টিপাত হয় না ধূলি ঝড় ছাড়া। কারণ এই সময় বায়ুতে জ্বলিয় বাষ্পের উপস্থিতি থাকে খুবই কম। ফলে কালবৈশাখী ঝড়গুলো হতে যে সামান্য পরিমাণ বৃষ্টি হয় তা মাটিতে পরার পূর্বেই বাষ্পায়িত হয়ে যায় আকাশে থাকা অবস্থাতেই। গত ১ মাসে দেশের বিভিন্ন স্থানে যে কালবৈশাখী ঝড়গুলো হয়েছে সেই কারণে মাটিতে কিছু পরিমাণ আর্দ্রতা রয়ে গেছে। মাটির এই আর্দ্রতা বাষ্পীভূত হয়ে বায়ুতে জ্বলিয় বাষ্প আকারে উড়ে গিয়ে যে মেঘ সৃষ্টি করবে সেই মেঘে বৃষ্টির পরিমাণ অপেক্ষাকৃত বেশি থাকবে মার্চ ও এপ্রিল মাসের শুরুর দিকের কালবৈশাখী ঝড়গুলো অপেক্ষা। যার কারণে এই সপ্তাহের কালবৈশাখী ঝড়গুলো থেকে অপেক্ষাকৃত বেশি বৃষ্টিপাত হবে।

৩) প্রাকৃতিক বা যান্ত্রিক বল যা ভূ-পৃষ্ঠ থাকে ঠেলা দিয়ে জ্বলিয় বাষ্পকে আকাশের অনেক উপরে নিয়ে গিয়ে মেঘের সৃষ্টি করবে। যেমন বঙ্গোপসাগর থেকে জ্বলিয় বাষ্প বাংলাদেশের স্থল ভাগে প্রবেশ করে তা ভারতে মেঘালয়ের পর্বতমালায় আঘাত করে মেঘের সৃষ্টি করে যে মেঘ থেকে সিলেট বিভাগের জেলাগুলোতে বৃষ্টিপাত হয়। দুটি ট্রেন যখন মুখোমুখি সংঘর্ষ করে তখন অপেক্ষাকৃত হালকা ইঞ্জিনটি ভারি ইঞ্জিনের উপরে উঠে যায় যেমন করে ঠিক তেমনি করে গরম, আর্দ্র (অপেক্ষাকৃত হালকা) বাতাস অপেক্ষাকৃত ঠাণ্ডা ও শুষ্ক (অপেক্ষাকৃত ভারি) বাতসের মুখোমুখি সংঘর্ষের সময় গরম বাতাস ঠাণ্ডা বাতাসের উপরে উঠে গিয়ে মেঘের সৃষ্টি করে যে মেঘ থেকে বৃষ্টি হয়। কিংবা উচ্চ আকাশে দক্ষিণ-পশ্চিম দিক থেকে উত্তর-পূর্ব দিকে খুবই শক্তিশালী বায়ু প্রবাহিত হওয়া। ৩ নম্বর কারণটি অন্য একদিন আরও বিস্তারিত ব্যাখ্যা করবো।

কোন কালবৈশাখী ঝড় দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার জন্য চতুর্থ আর একটি প্রভাবক দরকার তা হলও ভূ-পৃষ্ঠ হতে উপরে উঠার সাথে-সাথে বায়ুপ্রবাহের দিক ও মানের পরিবর্তন হওয়া। অর্থাৎ, ভূ-পৃষ্ঠে বায়ু যদি দক্ষিণ দিক থেকে উত্তর দিকে দিকে প্রবাহিত হয়ে তবে ভু-পৃষ্ঠ থেকে ১০ কিলোমিটার উঁচুতে বায়ু প্রবাহিত হবে পশ্চিম দিক থেকে পূর্ব দিকে। বিভিন্ন উচ্চতায় বায়ুর প্রবাহের দিকের ভিন্নতার জন্য মেঘের মধ্যে ঘূর্ণন সৃষ্টি হয় ও কালবৈশাখী ঝড় দীর্ঘস্থায়ী হয়। এই ঘূর্ণনের পরিমাণ খুবই বেশি হলে টর্নেডো সৃষ্টি হয়। অন্য সময় আরও বিস্তারিত ব্যাখ্যা করবো এই বিষয়টি।

এই মুহূর্তে জেনে রাখুন যে আগামীকাল থেকে রংপুর, রাজশাহী ও সিলেট বিভাগের অনেক জেলায় উপরোক্ত ৪ টি উপপাদনের ২ থেকে ৩ টি উপস্থিতি দেখা যাবে ও ২৯ তারিখ থেকে ৪ টি উপাদানের উপস্থিতি দেখা যাবে প্রায় সারা দেশে। মে মাসের ১ তারিখ থেকে উপরোক্ত ৪ টি উপাদানের উপস্থিতি সারা দেশ ব্যাপী ব্যাপক পরিমাণে দেখা যাবে। যে কারণে মে মাসের ১ ও ২ তারিখে পুরো দেশ ব্যাপী শক্তিশালী কালবৈশাখী ঝড় ও বজ্র সহ শিলাবৃষ্টি দেখা যাবে। চট্টগ্রাম বিভাগের মানুষরা ঐ ২ দিন বৃষ্টি থেকে বঞ্চিত হওয়ার কোন কারণ দেখছি না।

লেখক: মোস্তফা কামাল পলাশ

সভাপতি-স্কুল অফ এনভারমেন্ট এন্ড সাস্টেনিবিলিটি স্টুডেন্ট’স অ্যাসোসিয়েশন 

 

Sharing is caring!

Related Articles

Back to top button