আদিবাসী ইস্যুতে ক্ষমতাসীনদের অবস্থান এবং মূলধারার জনগোষ্ঠীর দৃষ্টিভঙ্গি ও মনস্তত্ব: মিঠুন কুমার কোচ

খাসিয়া ও গারো আদিবাসীদের পান জুম দখল, দুর্বৃত্তদের দ্বারা খাসিয়াদের সহস্রাধিক পান গাছ কর্তনের সংবাদ খুব বেশিদিন আগের নয় এবং এ ধরনের সংবাদ এবারই প্রথম নয়। পাহাড় ও সমতলের আদিবাসীদের ওপর অত্যাচার, নির্যাতন, তাদের ভূমি দখল ও নিজ ভূমি থেকে উচ্ছেদের ঘটনাগুলো কিছুদিন পরপরই বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে নিয়মিত। কিন্তু বারবার কেন ঘটছে এ ধরনের ঘটনাগুলো? এই ঘটনাগুলো যারা ঘটাচ্ছে, নেপথ্যে থেকে যারা কলকাঠি নাড়ছে, তাদের বিচার বা শাস্তি কি আদৌ হচ্ছে? উত্তর খুঁজে পেতে খুব বেশি বেগ পাওয়ার কথা না, কারণ এসব প্রত্যেকটি ঘটনার বিচার হলে, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হলে বারবার এমন ঘটনা ঘটানোর সাহস পেত না অপরাধীরা। বরং বিচার ও শাস্তি না হওয়ার দরুণ অপরাধীরা আরো বেপরোয়া হয়ে ওঠে। আর এতে করে ধারাবাহিকভাবে চলতে থাকে আদিবাসী ও সংখ্যালঘু নির্যাতন। একই কায়দায় চলে ক্ষমতাসীনদের দুর্বল ও অর্থবিত্তহীনদের প্রতি নির্যাতন। আইনের ফাঁকফোকর ও অর্থ-বিত্ত, ক্ষমতা, প্রভাব-প্রতিপত্তির জোরে অপরাধীরা ছাড়া পেয়ে বীরদর্পে ঘুরে বেড়ায়। আর তাতে ন্যায়বিচার তো দূরের কথা, উল্টো অপরাধীরা ভুক্তভোগীদের হুমকি-ধামকি দিয়ে কোণঠাসা করে রাখে। এমন পরিস্থিতিতে অপরাধী ও অপরাধের মাত্রা বাড়বে এটা অনুমিতই। তবে সংখ্যালঘু ও আদিবাসী নির্যাতনের বেলায় এতোটা সরলীকরণ করা হলে তা হবে স্থুল এক চিন্তা। আদিবাসী ও সংখ্যালঘু নির্যাতনের কারণগুলো কখনোই এতোটা সরলরৈখিক নয়, বরং এর পেছনে বহুমাত্রিক কারণ এবং বিভিন্ন স্তরের স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর কালোহাত বিন্যস্ত থাকে। যে কারণে বারবার সংখ্যালঘু ও আদিবাসীদের ওপর নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। কিন্তু কোন সরকার, প্রশাসন কেন এইসব ঘটনার বিচারে খুব তৎপর ও আন্তরিক নয় সেটা এক গভীর উদ্বেগের কারণ এবং অস্তিত্বের প্রশ্নে সংখ্যালঘু ও আদিবাসীদের জন্যে এই বিষয়গুলো অত্যন্ত পীড়াদায়ক ও বিষাদ জাগানিয়া। এই প্রেক্ষিতে নেপথ্যের কারণগুলো খুঁজতে গেলে অনেক বিষয় সামনে চলে আসে। সেই বিষয়গুলো নিয়েই একান্ত উপলব্ধিজাত এই লেখার প্রয়াস।
হাল আমলে ইন্টারনেটের বদৌলতে ফেইসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ইউটিউব তুমুল জনপ্রিয় হয়ে ওঠায় সংবাদমাধ্যমগুলোও তাদের সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে এই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোর দিকে ঝুঁকছে, বলা যায় প্রিন্ট মিডিয়ার চেয়ে ইলেকট্রনিক মিডিয়া অধিকতর জনপ্রিয় হয়ে উঠছে সময়ের সাথে সাথে। আগেকার মত সর্বশেষ খবর জানার জন্যে মানুষ এখন আর খবরের কাগজের ওপর নির্ভরশীল নয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিনোদনের সাথে সাথে সর্বশেষ সংবাদগুলো পাওয়ার কারণে মুহূর্তের মধ্যেই মানুষ জেনে যাচ্ছে নানা ধরনের খবর, তথ্য ও চাঞ্চল্যকর সংবাদগুলোও। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ধরনের খবর ভাইরাল হয় আর সেইসব কারণে সরকার, প্রশাসন অনেক ক্ষেত্রে বাধ্য হয় সংশ্লিষ্ট ঘটনার সুরাহা করতে বা প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিতে। কিন্তু আদিবাসীদের ভুমি দখল, নির্যাতনের ঘটনাগুলো সেই অর্থে ভাইরাল হতে দেখা যায় না, তাই সরকার, প্রশাসনও আদিবাসী ইস্যুতে পদক্ষেপ নিতে কোন চাপ অনুভব করে না। সংখ্যায় কম বলে ভোটের রাজনীতিতেও আদিবাসীরা কখনই গুরুত্বপূর্ণ ছিল না, নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারক ছিল না, ভোটব্যাংক হিসেবেও তারা প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি কোনকালে। রাজনৈতিক দলগুলোও আদিবাসীদের একটি নির্দিষ্ট দলের চিরায়ত অনুসারী হিসেবে ধরে নেয়, তাই সেই দলের তাদের ভোট বা সমর্থন হারানোর আশঙ্কা পারতপক্ষে থাকে না, অন্যদিকে যারা আদিবাসীদের বিপক্ষ দলের অনুসারী বলে বিশ্বাস করে তারাও একই কারণে তাদের প্রতি এক ধরনের বিরূপ মনোভাব পোষণ করে থাকে। তাই রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে আদিবাসীরা কখনোই সেই অর্থে গুরুত্ব পায়নি। বরং এদেশের আদিবাসী ও সংখ্যালঘুরা নির্বাচনোত্তর সাম্প্রদায়িক সহিংসতার শিকার হয়ে এসেছে বারবার, যে ঘটনাগুলোর দৃষ্টান্তমূলক বিচার ও শাস্তির প্রদানের ঘটনা দেশবাসীর কাছে রহস্যাবৃত ও অজানাই রয়ে থেকে গেছে বরাবর।
আদিবাসী হিসেবে নিজেদের আত্মপরিচয় প্রদানের কারণে দেশের মূলস্রোতের সিংহভাগ মানুষ আদিবাসীদের প্রতি খুব বেশি সংবেদনশীল নয়, কারণ তারা নিজেদের আদিবাসী হিসেবে যে দাবী করে তা অনেকেরই অপছন্দের একটি বিষয়। উপজাতি, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা প্রভৃতি অগ্রহণযোগ্য ও অসম্মানজনক অভিধায় অভিহিত করতেই ভালবাসে এদেশের অধিকাংশ জনসাধারণ। আত্মপরিচয় নির্ধারণের অধিকার থেকে আদিবাসীদের বঞ্চিত করে সরকার ও বিভিন্ন রাজনৈতিকদলগুলোও নিজেরা রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকার চেষ্টা করে এবং সাধারণ জনগণও উপজাতি, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ক্ষুদ্র জাতিসত্তা সম্বোধন করে নিজেদের অপেক্ষাকৃত উন্নততর ভেবে আত্মতৃপ্তি লাভ করে থাকেন। আবার আরেকটি অংশ রয়েছে যারা ছোটবেলা থেকেই পাঠ্যপুস্তকে পড়ে, বিভিন্ন গণমাধ্যম বা লোকমুখে উপজাতি, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা শব্দগুলো শুনে তাদের জানার পরিধি থেকেই উল্লিখিত শব্দগুলো ব্যবহার করেন। পাহাড়ি আদিবাসীরা সাপ, ব্যাঙ বিভিন্ন পোকামাকড় ভক্ষণ করে- ঢালাওভাবে এই জাতীয় নেতিবাচক প্রচারণার কারণেও মূল জনগোষ্ঠীর মধ্যে তাদের প্রতি এক ধরনের অবজ্ঞা বা ঘৃণাসূচক মনোভাব গড়ে ওঠে। বিভিন্ন সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ও প্রজাতন্ত্রের চাকরীতে বর্তমানে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণী বাদে খুব সামান্য অংশে “উপজাতি/ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী/ক্ষুদ্র জাতিসত্তা কোটা” নামে কিছু প্রাধিকার কোটা প্রচলন থাকার কারণে অনেকেরই ধারণা- এদেশে বসবাসরত আদিবাসীরা মূল জনগোষ্ঠীর চেয়ে বেশি সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে এবং তারা পৃথিবীর অন্যান্য প্রান্তের সংখ্যালঘু ও আদিবাসীদের চেয়ে অনেক ভাল আছে, নিরাপদে আছে। তাই অধিকাংশ বাঙালি মানসে আদিবাসীদের জন্যে তেমন সহানুভূতি বা অনুরাগ কাজ করে না প্রকৃতিগতভাবেই। আদিবাসীদের ভূমি দখল, নির্যাতনের ঘটনাগুলো তাদের অনেকের কাছে বিচ্ছিন্ন, বিক্ষিপ্ত কিছু ঘটনা বলে প্রতীয়মান হয়, অনেক ক্ষেত্রে সেভাবেই উপস্থাপন করা হয় ঘটনাগুলো। যার কারণে প্রকৃত ঘটনাগুলো আড়ালে রয়ে যায় বা বিভিন্ন গণমাধ্যমে অধিক গুরুত্বসহকারে প্রকাশিত হয় না, তাতে লঘু হয়।তাতে লঘু হয়ে যায় ঘটনার গুরুত্ব। সংবাদ হিসেবে পরিবেশনের ক্ষেত্রেও হটকেক হিসেবে বিবেচিত হয়না আদিবাসী সংক্রান্ত ইস্যুগুলো।
দেশের বিভিন্ন ইস্যুতে ঘটে যাওয়া অনেক ঘটনাগুলো যেমন ব্যাপক আলোচিত হয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেভাবে বিস্তর চর্চিত হয়, প্রচুর শেয়ার ও প্রতিক্রিয়া পায়; প্রতিবাদ, আন্দোলন হয়; আদিবাসীদের মানবাধিকার লঙ্ঘন ও তাদের ভূমি বেদখল, নির্যাতন, ধর্ষণের ঘটনাগুলো সেই তুলনায় খুবই কম আলোচিত, চর্চিত হয়, খুব কমই শেয়ার হয়, তাদের বিরুদ্ধে ঘটিত অত্যাচার-নির্যাতনের প্রতিবাদে বড় পরিসরে আন্দোলন সংগ্রাম খুবই বিরল। কাশ্মীর, রোহিঙগা, ফিলিস্তিন প্রভৃতি আন্তর্জাতিক ইস্যুতে এদেশের একটি বিশাল অংশ যেমন প্রতিক্রিয়া, তৎপরতা প্রদর্শন করে এবং সহজাতভাবেই সহমর্মিতা অনুভব করে, তার সিকিভাগও নিজ দেশের আদিবাসী ও সংখ্যালঘুদের প্রতি দেখা যায়না। ধর্মীয় ইস্যুতে এদেশবাসী যতোটা তৎপর, মানবিক ও মানবাধিকার লঙ্ঘন ইস্যুতে ততোটাই নিষ্ক্রিয়, সংখ্যালঘু ও আদিবাসী নির্যাতন প্রশ্নে তারা ততোধিক নীরব।
যে সমস্ত কারণে সরকার কিংবা প্রশাসন আদিবাসীদের বিরুদ্ধে ঘটা মানবাধিকার লঙ্ঘন, ভূমি বেদখল, অত্যাচার-নির্যাতনের ঘটনাগুলোর বিচার করতে কোন ধরনের চাপ বা তাগিদ অনুভব করেনা বলে প্রতীয়মান হয় সঙ্গত কারণেই। আর তাতে অধিকাংশ ঘটনার বিচার হয়না, এতে করে অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে, যে কারণে আদিবাসীদের ওপর অত্যাচার নির্যাতন কখনোই থেমে থাকেনা, বরং ক্রমাগত বাড়তেই থাকে।
খাসিয়াদের হাজার হাজার পানগাছ কেটে ফেলা, তাদের ভূমি বেদখল, তাদের ওপর শারীরিক- মানসিক নির্যাতন, হুমকি-ধামকি দেওয়া- কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং তা বিচারহীনতা, পুলিশ ও প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা, স্থানীয় সরকার ও নেতৃবৃন্দের নীরবতা এবং আদিবাসীদের ওপর নির্যাতন ও উচ্ছেদ ষড়যন্ত্রেরই ধারাবাহিকতা। সমতলের আদিবাসীদের জন্যে পৃথক ভূমি কমিশন গঠন আদিবাসী ও সুশীল সমাজের দীর্ঘদিনের দাবী। সংসদে সমতলের আদিবাসীদের জন্যে পৃথক ভূমি কমিশন গঠনের জন্যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও সেটা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকার কর্ণপাত করছে না এবং বরাবরই আদিবাসীদের এই দাবী উপেক্ষিত থাকছে। আদিবাসীদের মানবাধিকার লঙ্ঘন, ভূমি বেদখল ও উচ্ছেদ ইস্যুতে সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে হুশিয়ারি ও ন্যায়-বিচার করার ঘোষণা দিতে দেখা যায়না বললেই চলে। সিলেটের খাসিয়া ও টাঙ্গাইলের মধুপুরের গারো ও কোচসহ অন্যান্য আদিবাসীদের ওপর অত্যাচার-নির্যাতন, ভূমি বেদখল ইস্যুতেও আমরা সরকারের উচ্চ মহলের একই আচরণের পুনরাবৃত্তি দেখি। আদিবাসীদের এত পেশীশক্তি, রাজনৈতিক শক্তি ও পর্যাপ্ত অর্থনৈতিক সক্ষমতা নেই যে নিজেরা এসব ঘটনার মোকাবেলা করবে। আদিবাসীদের এই সমস্ত প্রতিকূলতা, সীমাবদ্ধতার কারণে ন্যায় বিচার অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আলোর মুখ দেখে না, আর এতে নিয়মিত ঘটতে থাকে আদিবাসীদের ভূমি বে-দখল, নিজ ভূমি থেকে উচ্ছেদ ও অত্যাচারের মত নিত্ত-নৈমিত্তিক ঘটনা। অথচ সরকার ও প্রশাসন চাইলেই তাৎক্ষনিক পদক্ষেপ নিতে পারে, যার দৃষ্টান্ত আমরা কিছুদিন আগেও দেখেছি। খাসিয়াদের বেদখল হয়ে যাওয়া ৭০ একর জুমের জায়গা উদ্ধারে মৌলভিবাজারের বড়লেখা উপজেলা প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী স্বল্প সময়ে ৭ দিনের মধ্যে উদ্ধার অভিযান চালিয়ে দখলমুক্ত করে খাসিয়াদের বুঝিয়ে দিয়েছে, যা প্রশংসার দাবিদার। সরকার ও প্রশাসনের এমন উদ্যোগ নিয়মিত অব্যাহত রাখা, সমতলের আদিবাসীদের জন্যে পৃথক ভূমি কমিশন গঠন, সংখ্যালঘু মন্ত্রণালয় গঠন, প্রতিশ্রুত পার্বত্য চুক্তি অবিলম্বে বাস্তবায়ন, সরকার, প্রশাসন ও নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে সংখ্যালঘু ও আদিবাসীদের প্রতিনিধিত্ব ও ক্ষমতায়ন নিশ্চিতকরণ, সংসদে আদিবাসীদের আসন সংরক্ষণ ও সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদান ব্যতীত তাদের অস্তিত্ব ও অধিকার রক্ষা করা অবাস্তবসম্মত রয়ে যাবে এবং এদেশের সংখ্যালঘু আদিবাসীরা প্রান্তিক থেকে প্রান্তিকতর হতে হতে একসময় অস্তিত্বহীনতার মুখে পতিত হবে, তাতে দেশ হারাবে তার নৃ-তাত্ত্বিক, সাংস্কৃতিক, ভাষাগত বর্ণীল ও বৈচিত্র্যময় এক অনন্য বৈশিষ্ট্য।

লেখক:মিঠুন কুমার কোচ
যুগ্ম আহ্বায়ক, বাংলাদেশ কোচ আদিবাসী ইউনিয়ন;
সহ সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ আদিবাসী যুব ফোরাম।

Sharing is caring!

Related Articles

Back to top button