পরিবেশ ও সমাজ: তরিকুল ইসলাম পলাশ

প্রকৃতি প্রেমীদের প্রতিদিনই পরিবেশ দিবস, নতুন করে দিবস পালনের কি আছে! অনেকদিন আগে জুলফিকার ভাইয়ের সাথে কুয়াকাটা ভ্রমণের বাস্তব গল্পের মতোই; ভোরে ঘুম কাতুরে নিশাচর মানুষটিকে নিয়ে লোকশূন্য সমুদ্র সৈকতে যাত্রাপথে, একজন প্রবীণ বাসিন্দার সাথে দেখা, ঘাড়ে ঠেলা জাল! প্রবল আগ্রহে সূর্য উদয় ও অস্ত কোথায় দেখা যায় জিজ্ঞাসা করতেই, উত্তর মিলেছিল ‘এটা আবার দেখার কি আছে! প্রতিদিনই তো হয়, দেশের মানুষ সূর্য দেখতে, এখানে কেন আসে তাই বুঝি না!’ বিরক্ত মুখে ইশারায় দেখিয়ে দিয়েছিলেন ‘ঐ দিকটাই ওঠে…!’ মানুষ ও পরিবেশ ভেদে, জীবনের মানে ভিন্ন ভিন্ন হয়।

ভারতের একটি প্রদেশ সিকিম। যেখানে যেতে পর্যটকদের ঘাটে ঘাটে ছাড়পত্র নিতে হয়। পরিবার-পরিজন নিয়ে, সিকিম এর পরিবেশ ও সমাজ দেখার নিবিড় সুযোগ হয়েছিল। বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানের ছাড়পত্রের জন্য অধীর অপেক্ষা, অনেকটা চাতক পাখির ন্যায়। প্রকৃতির অবসর বলে কিছু নেই, তাইতো সেখানকার বারান্দায় বসেও ভূস্বর্গের প্রাকৃতিক অপরূপ লীলা খেলা উপভোগ করা যায়! অনেকটা ঘরে বসে পূর্ণিমার চাঁদ দখার মতই, তবে প্রকৃতির সব কিছু দেখে শেষ করা দায়! আবার চলার পথে পরিবেশ ও সমাজের অপরূপ বিস্ময়, যা লিখে প্রকাশ করা দুরূহ! তবুও ভ্রমণ কাহিনীতে কিছুটা করেছিলাম বর্ণন; অবসরে গ্যাংটকের, একজন বিজ্ঞ অধিবাসীর সাথে কথোপকথনে তিনি বলেছিলেন, ‘নগরটা নাগরিকদের জন্য কিন্তু বাইরের মানুষের স্রোতে, এখন বসবাস করা দায়। কি হবে টাকা দিয়ে, যদি সুখই না থাকে?’

ইচ্ছা করলেও ভারতের অন্য কোন প্রদেশের নাগরিকদের সিকিমে জমি ক্রয়-বিক্রয় অসাধ্য। কোথাও প্লাস্টিক পণ্য নিষিদ্ধ। কোথাও কৃত্রিম পানীয় জল নেই, তার প্রয়োজনও নেই। কোথাও স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেটের অভাব প্রকট ! চলাচলে পরিবেশের নানান প্রতিবন্ধকতা, তবুও মানুষের ঢল ! সেই সমাজের বাসিন্দারা পরিবেশ ভাবনায়, পর্যটকদের জনস্রোতে উদ্বিগ্ন। তখন বাংলার প্রবীণ অভিবাসী ও বিজ্ঞজনদের মনোভাব কি, তা বড় জানতে ইচ্ছা করে-

এক সময় সীমান্তবর্তী অনেক জেলাতে কলকাতার হালচাল বিরাজমান ছিল! তাই মফস্বল শহর থেকে রাজধানী ঢাকার জীবনযাত্রা খুব বেশি পার্থক্য ছিল না। অনেক অভিজাত পরিবার বসবাসের জন্য গ্রামকে প্রাধান্য দিত। একসময় ঢাকা তিলোত্তমা নগরী ছিল! তা এখন শুধু নামসর্বস্ব। বাস্তবে, ময়লার ভাগাড় ও কংক্রিটের বস্তি! কল্প গল্পের চেরাগ ঘঁসা দৈতের ছোঁয়াই, বাস্তবে ঢাকা শহর বহুগুণে প্রাকৃতিক পরিবেশ বিলীন করে, প্রতিনিয়ত বিস্তৃত হচ্ছে। তেমনি ভাবে পাল্লা দিয়ে সম্প্রসারিত হচ্ছে মফস্বল শহর গুলো কিন্তু এখন গ্রামে সব ধরনের আধুনিক সুবিধা বিদ্যমান থাকলেও, গ্রামে বসবাসের প্রবণতা ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাচ্ছে। মফস্বল শহরের মানুষদের রাজধানীতে আসার প্রবণতা উদ্বেগজনক। এইতো কিছুদিন আগেও, ঢাকা শহর নানান বিল ঝিলে ভরা ছিল। চারিদিক সবুজ শস্য ক্ষেত, মানুষ ছিল খুবই কম। একসময় জন শক্তি বৃহত্তম সমস্যা হিসেবে আর্ভিভূত, যা চিন দেশেও ছিল। তাঁরা এখন জন সম্পদে রুপান্তরিত কিন্তু সোনার বাংলা সেই তিমিরে-

অতি আধুনিকতার ছোঁয়ায় আলাদ্দিনের চেরাগ এর গল্পের মতই, অলীক কল্পনায় কিছু পাওয়ার আশায়! ভালো লাগার অনেক কিছুই প্রতি মুহূর্তে হারিয়ে যায়! তাইতো প্রকৃতি, পরিবেশ ও সমাজ নিরাশ হয়। অধিকাংশ মানুষ সাময়িক প্রশান্তির আশায়, পরিবেশকে নিজ গণ্ডিতে, যান্ত্রিক উপায়ে নিয়ন্ত্রণ করে। কুফলে; বৃহত্তর সমাজ, প্রকৃতি ও পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে রিভার্স এফেক্ট তৈরি করে! তাই ঝিলের নগর এখন আধুনিকতার ছোঁয়ায় নামমাত্র লেক হয়ে গেছে। সবুজ বিলীন হচ্ছে। হারিয়ে যাচ্ছে, মানুষের সহিষ্ণুতা, মানবতা ও মনুষ্যত্ব! তাই বোধহয় নির্বিচারে বড় বড় মাতৃবৃক্ষ নিধন হচ্ছে! অবিশ্বাস্য সব ঘটনা ঘটে চলছে। অনেক সচেতন মানুষ; লোক দেখানো, মন ভোলানো, চোখ ধাঁধান উন্নয়নে বামনাকৃতির বৃক্ষ চর্চায় মগ্ন! প্রকৃতির সন্তান মানুষ দ্বারা আজ পরিবেশ বিপর্যস্ত। এখন বিপন্ন পৃথিবীতে প্রাণের টিকে থাকা দায়-

প্রযুক্তির যুগে নেতিবাচক বিষয় গুলো করোনার মতো মফস্বলেও সংক্রামিত। প্রচলিত প্রবাদ ‘আপন থেকে পর ভালো, পরের থেকে জঙ্গল’ এখন সেই সম্পর্কও নেই, সেই বনভূমিও নেই। তাই ‘ঘরের শত্রু বিভীষণ’ হয়ে, পরিবেশ ও ঘনিষ্ঠজনের সাথে মানুষের যত শত্রুতা! তাইতো মফস্বল শহরেও কেউ কারো তেমন চেনে না। চিরচেনা শহর গুলো অচেনা মনে হয়। গত অর্ধশত বছরে পৃথিবীর যে আমূল পরিবর্তন হয়েছে, তার প্রভাবে দরিদ্র দেশসমূহ দিশেহারা! যা হয়তো নতুন প্রজন্মের কাছে অলৌকিক গল্প মনে হবে কিন্তু ভঙ্গুর পরিবেশ ও সমাজের কুপ্রভাব বহন করতে হবে চোখ বাঁধা কলুর বলদের মতই, অনন্ত কাল-

আদি যুগের মানুষ নিরাপত্তার জন্য সংঘবদ্ধভাবে সমাজে বসবাস করত, কালের বিবর্তনে গোষ্ঠী ও পরিবার কেন্দ্রিক হয়ে ওঠে মানুষ! আধুনিক মানুষ যন্ত্র ও কৃত্রিমতার উপর অতি নির্ভরশীল কিন্তু মানুষের সমাজবদ্ধ জীবনের চিরায়ত বৈশিষ্ট্যের খুব একটা পরিবর্তন হয়নি। হওয়া সম্ভবও নয়। কারণ মানুষ একমাত্র প্রাণী, যে জন্ম হতে মৃত্যু অবধি, একে অপরের উপর নির্ভরশীল! তবে জগতের সকল প্রাণ পরিপূর্ণভাবে বৃক্ষ ও উদ্ভিদকুলের উপর নির্ভরশীল!

তেমনিভাবে প্রকৃতির সন্তান মানুষদের পক্ষে সব সময় অতি আধুনিক কাঠখোট্টা জীবন-যাপন অসম্ভব। তাই পরিবেশের সান্নিধ্যে যেতে হয়! যান্ত্রিক নগরে বসবাসের চিন্তায়, অনেকেরই প্রকৃতি,পরিবেশ-সমাজ ও প্রতিবেশকে গুরুত্ব দেয়! ঢাকার শ্যামলী পার্কের উত্তর-পশ্চিম কোণে একটি বটবৃক্ষ এ অঞ্চলের অক্সিজেনের ফ্যাক্টরি ছিল। এলাকাটিতে ছায়াময় মায়াময় পরিবেশ ছিল! কাঠফাটা দুপুরে যান্ত্রিক নগরে সুনিবিড় শীতল ছায়ায় কত পথচারী শান্তিতে বিশ্রাম নিত, কত প্রাণের বসবাস ছিল গাছটিতে, তার কোন ইয়ত্তা নেই।

আগের থেকেই শ্যামলী পার্কে অনেক বৃক্ষ ছিল। অনেক জায়গা ফাঁকাও ছিল। বিগত দুই মৌসুমে শ্যামলী পার্কে বৃক্ষ রোপন করা হয়। তার পর পর পার্কটির উন্নয়নের কাজ শুরু হয়। ইট কাঠ পাথরের নিচে চাপা পড়েছে অনেক সবুজ। তবে আধুনিকতার ছোঁয়ায় নান্দনিক হয়েছে পার্কটি। কিছু অংশে এখনো সবুজায়নের সুযোগ আছে। পার্কের জায়গায়, এই অঞ্চলের জল সরবরাহের ব্যবস্থা, সাথে লাগোয়া অত্যাধুনিক শৌচাগার। তারপরও পার্কটির অভ্যন্তরে অপরিকল্পিত ভাবে নির্মিত আছে, অস্বাস্থ্যকর টয়লেট। অনেকটা সাদা জামায় কালো দাগের মতই, পরিবেশের স্বাস্থ্য বিঘ্নিত। পার্কটিতে ভোর হতে বিচরণ করা স্বাস্থ্য সচেতন মানুষ বিব্রত, তবুও স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে চলাচল। দেখা বা বলার কেউ নেই। আবার দেখা যায়, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অনেক মানুষ মহাসড়কে শরীরচর্চা, মাঠে-ঘাটে রাস্তায় ঘাম ঝরায়! আবার বাড়িতে যেয়ে জল ঢেলে পান করেন না। তাই অনেকটা ‘গাছের গোড়া কেটে আগায় পানি দেওয়ার মতই অবস্থা’ হয়। তাইতো ক্যালোরি বা শক্তি হাওয়াই ভাসিয়ে না দিয়ে কাজে লাগানোই উত্তম। অন্য প্রসঙ্গে না যাই-

পার্কটির উত্তর-পশ্চিম কোণের সীমানা প্রাচীরের উপর অনেকটা জায়গা নিয়ে বিস্তৃত ছিল বহুকালের বট বৃক্ষ! সেই কারণে পার্ক পুনঃনির্মাণের সময় ‘মাথায় টিউমার হয়েছে, তাই মাথা কেটে বাদ দেবার মত’ সিদ্ধান্ত! অনেক প্রচেষ্টায়ও, রক্ষা করা যায়নি গাছটি কিন্তু সচেতন উন্নত দেশে, এমনকি আমাদের দেশও, অনেক নজির আছে বৃক্ষকে রক্ষা করে নির্মাণশৈলী স্থাপনার। কারণ হয়তো; অর্থের বিনিময়ে যে কোনো নির্মাণ কাজ করা যায় কিন্তু ইচ্ছা করলে ক্ষণিকেই মাতৃবৃক্ষ সৃষ্টি করা যায় না। তিরিশ কোটির অধিক শুক্রাণু হতে, যেমন একটি মানব শিশু জন্ম নেয়। তেমনি বটের, একলিঙ্গ ফুলগুলো পরাগায়নের জন্য বিশেষ জাতের পতঙ্গের উপর নির্ভরশীল। বটের অসংখ্য ফলের অগণিত বীজ পক্ষীকুলের খাবার পরিণত হয়। পাখিরা ফল খেয়ে বীজ ছড়িয়ে দেয়। যা মল ত্যাগের প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় বীজ হতে চারা অঙ্কুরিত হয়। অনুকুল পরিবেশে সহজেই বটের চারা সৃষ্টি হয়। পাখিবাহিত বটের বীজ দালানের কার্নিশ, পুরানো ফাটল ও অন্য কোন গাছের কোটরে সহজেই অঙ্কুরিত হয়। উপযুক্ত পরিবেশে বট বৃক্ষ ৫-৬ শত বছর বেঁচে থাকতে পারে-

এই ভাবেই প্রকৃতির আপন খেয়ালে, শ্যামলী পার্ক হতে কেটে ফেলা বটবৃক্ষটির চারা জন্মায় বৃক্ষ প্রেমীদের টবে। অনেক প্রচেষ্টায় রোপণের জায়গা নির্ধারিত হয়! পার্কের পরিকল্পনায় প্রাথমিক পর্যায় তিনটি বৃক্ষের চারা রোপণের অনুমোদন মেলে। যেখানে বৃক্ষটি ছিল, সেখানে কংক্রিটের মোটা আস্তরন কেটে, বৃক্ষরোপণের পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়। আজ সেই বটবৃক্ষের চারার সাথে বিরল প্রজাতির দুটি বৃক্ষ রোপণ করা হয়। পূর্ব অভিজ্ঞতা বলে, বিরল প্রজাতির ঔষধি গাছ দুটির, এখনই নাম বলতে মানা। অবুঝ কবিরাজের কারণে, অমূল্য বৃক্ষ দুটি অঙ্কুরে বিপন্ন হতে পারে-

সর্বত্রই একটা বিষয় লক্ষণীয়; বৃক্ষ কাটা খুব সহজ প্রক্রিয়া কিন্তু বৃক্ষ রোপণের জন্য কঠিন আইনের বেড়াজাল! তাইতো ঢাকা শহরে একমুঠো জায়গার উপরও বৃক্ষরোপণ করা দুরূহ! আন্তরিক সম্মিলিত প্রচেষ্টা ছিল বিধায়, এই কঠিন কাজটি বাস্তবায়ন সম্ভব হয়েছে। পরিবেশ ও সমাজের অকৃত্রিম সহায়তা ছিল! তাই সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি কৃতজ্ঞ। আবারো প্রমাণ হলো, সম্মিলিত প্রচেষ্টায় পারে অসাধ্যকে সাধন করতে। বিশ্ব পরিবেশ দিবস ইতিবাচক ধারা অব্যাহত থাকবে বিশ্বময়-

প্রকৃতির সাধকদের প্রতিটা দিনই পরিবেশ দিবস! কিন্তু এখন দিবসের অভাব নেই। তবে প্রায় সব ভার্চুয়াল আনুষ্ঠানিকতায় বন্দি। বাস্তব জীবন অন্যরকম। তাই হয়তো সবুজের উপর নির্ভরশীল গ্রীন ইকোনমি, সাগরের মাঝে ব্লু ইকোনমিতে রূপায়নের চেষ্টা করছে মানুষ! কেউ ঊর্ধ্বলোকে বসবাসের গবেষণায় কিন্তু সবই ধরণীর পরিবেশ ক্ষতি করে চলছে সহজেই। তেমনি বৃক্ষরোপণ করা খুবই সহজ একটি কাজ কিন্তু গাছের চারাকে পাবলিক প্লেসে বৃক্ষে রূপান্তরিত করতে হলে, সুসন্তান গড়ার মতোই সাধনা করতে হয় কিন্তু বাস্তব সম্মত উদ্যোগের বড্ড অভাব! চারা লাগায়ে খালাস। তার কুফলে; পরিবেশ বিপর্যয়ে বিপন্ন পৃথিবী। তাই ধরণীকে রক্ষায় বৃক্ষই মূখ্য বনাঞ্চল গড়ার থেকে রক্ষা করা জরুরী। সর্বশেষ বিশ্বের সকল বৃক্ষ বিকশিত হোক আপন মহিমায়। এই হোক পরিবেশ দিবসের অঙ্গীকার-

লেখক: তরিকুল ইসলাম পলাশ

 প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী এইড ফাউন্ডেশন

Sharing is caring!

Related Articles

Back to top button