বাঁশ-তরিকুল ইসলাম পলাশ

বাঁশ-
জন্ম হতে মৃত্যু অবধি মানুষের জীবন-জীবিকায় ‘বাঁশ’ অতপ্রোত ভাবে জড়িত, একসময় ধাত্রীরা মা ও নবজাত শিশুদের নাড়ি কাটতে বাঁশের চোচ ব্যবহার করতেন, এখনোও অনেক অঞ্চলে তার প্রচলন আছে। শেষ বিদায় বেলায় বাশেঁর বিকল্প নেই। মৃতদেহকে কবরস্থ ও শ্মশানে শব দাহ করার জন্য বাঁশের ব্যবহার অপরিহার্য। বাশেঁর কোঁড়ল উৎকৃষ্ট সবজি।

বাঁশ ফাঁপা কান্ড বিশিষ্ট ঘাসজাতীয় উদ্ভিদ। কাষ্ঠল বৃক্ষের ন্যায় বৈশিষ্ট্য থাকায়, এটিকে Bambusaceae গোত্রের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। অধিকাংশ প্রজাতির বাঁশ বড় আকারের যৌগিক ধরনের উদ্ভিদ। এগুলি অনেক বৎসর যাবৎ অঙ্গজ প্রজননের মাধ্যমে বৃদ্ধি পায় এবং কদাচিৎ ফুল ধারণ করে। বাঁশের ফুল ধরার বিষয়টি অনিশ্চিত, কিছু বাঁশে দীর্ঘদিন পরপর ফুল আসে। তিন থেকে ১২০ বছরের চক্রে ফুল আসতে পারে, তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ১৫-৬০ বছরের ব্যবধানে বাঁশের ফুল ফোঁটে। বাঁশের অধিকাংশ প্রজাতিই জমকালো ফুল প্রদানের পর মৃত্যুবরণ করে।

গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর নিকট বাঁশের গুরুত্ব অপরিসীম। গৃহের অবকাঠামো নির্মাণ, সাকো ও মঞ্চ তৈরী, মই, মাদুর, ঝুড়ি, পাখা, ফাঁদ, হস্তশিল্পসহ নিত্যদিনের ব্যবহার্যে বাঁশ বহুল ব্যবহৃত হয়। দেড় হাতের বাঁশেরলাঠি বাঙালির একসময়কার আত্মরক্ষার একমাত্র হাতিয়ার ছিল। দেশের কোন কোন অঞ্চলে বাঁশের পাতা গোখাদ্য ও ঘরের চালার ছাউনি হয়। গৃহস্থালির কাজে ব্যাপকভাবে ব্যবহার হয় বিধায়, বাঁশকে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর দারুবৃক্ষ (timber) বলা হয়। এখনও ঋষি সম্প্রদায় চামড়ার কাজ ছাড়াও বাঁশ বেতের দ্বারা বিভিন্ন পণ্য তৈরি করেন। উষ্ণমন্ডলীয় এলাকার দেশসমূহে কাগজ তৈরির প্রধান উপাদান হিসেবে বাঁশ উল্লেখযোগ্য। বাঁশঝাড় ঝড়ো হাওয়া প্রতিরোধ ও ভূমির ক্ষয়রোধক। প্রচলিত প্রবাদ আছে ‘বাঁশের হাজার ব্যবহার’-

একসময় হরহামেশা দেখা যেত বাশেঁর অঙ্কুরিত চারা বা পোয়ার উপর মাটির হাঁড়ি বা কলসি দিয়ে ঢেকে রাখাতে, কিছুদিন পর বাশঁটি ঢাকনির আকার ধারণ করে সবজিতে রূপান্তরিত হয়। কচি বাঁশের ডগা মুখরোচক সবজি হিসেবে খাওয়ার উপযোগী। এ ধরনের কচি ডগা স্থানীয়ভাবে ‘বাঁশ কোঁড়াল’ নামে পরিচিত। বাঁশ পাতার রস কাশি কমায়। বাশেঁর কোঁড়াল হাঁপানি রোগীদের সুস্থ থাকতে ভূমিকা রাখে। দেহের কোলেস্টেরলের মাত্রা কমিয়ে হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়। এটি উচ্চ রক্তচাপ ও ক্যান্সারের ঝুঁকিও কমায়। কোষ্ঠ্যকাঠিন্য দূর করে। ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য বাঁশের কোঁড়ল উপকার।

পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি জনগোষ্ঠী বর্ষার মৌসুমে বহুল পরিমাণে বাশেঁর কোঁড়ল খেয়ে থাকে। পার্বত্য চট্টগ্রামের বিশেষ প্রকারের বাঁশকে স্থানীয়ভাবে ‘বরুবাঁশ’ বলে। এটার অঙ্কুরিত বাঁশ হতে সবজি হয়। বাস্তবিকই এটা একটা ডেলিকেসি তথা উপাদেয় খাদ্য। তবে এখন, এ দেশের হাটে-বাজারে বাঁশের সবজি সহজলভ্য নয় কিন্তু উন্নত বিশ্বের খাদ্যের তালিকায় বাঁশের সবজি বিখ্যাত। ইংরেজিতে এটাকে বলে ‘ব্যাম্বু-শুট’। টিনে প্রক্রিয়াজাত চীনা ব্যাম্বু-শুটস দেশের অভিজাত ডিপার্টমেন্টাল স্টোরসমূহে পাওয়া যায়। এটার আদর্শ কম্বিনেশন হচ্ছে হাঁসের মাংস ও বাঁশ কোঁড়ল আর শুটকি ।

কাজেই দেখা যাচ্ছে; বাঁশ শুধু দেওয়াই নয়, খাওয়াও যায়। বাঁশের অবিচ্ছেদ্য অংশ কঞ্চি, বাঁশের ডাল পালা। তবুও বাঁশের সাথে কঞ্চির তুলনা। তেমনি ভাবে, এই অমূল্য রতন উদ্ভিদটির নাম, কেন গালি বা নেতিবাচক হিসেবে ব্যবহৃত হয়! সেই চমকপ্রদ ইতিহাসের দিকে একটু দৃষ্টি দেয়া যাক-

একসময় গ্রামের ঘরবাড়ির অধিকাংশই বাঁশের খুঁটি ও শণ বা খড়ের চালের ছিল। একবার পাকিস্তান আমলে প্রচণ্ড ঘূর্ণিঝড়ে নোয়াখালীর গ্রামাঞ্চল বিধ্বস্ত হয়। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর আবদুল মোনেম খান, তথা ছোটলাটের দোর্দণ্ডপ্রতাপ ছিল। তিনি ঘূর্ণিঝড়কে বলতেন ‘ঘুণ্ডাবাত্যা’ আর প্রেসিডেন্টের নামের সাথে সব সময় উচ্চারণ করতেন ‘আমার প্রিয় প্রেসিডেন্ট’। ঘূর্ণিঝড়ের পরবর্তী নোয়াখালী পরিদর্শন করে, জনসভায় তিনি বলেছিলেন; ‘আমার প্রিয় প্রেসিডেন্ট ফিল্ড মার্শাল মোহাম্মদ আইয়ুব খান, আপনাদের নোয়াখালীর ঘুণ্ডাবাত্যার পরিপ্রেক্ষিতে অনেক বাঁশ দিয়েছেন। প্রয়োজন বোধে আমিও আরও বাঁশ দেব।’ লোকজন তখন বলাবলি করতে শুরু করে; ‘বাঁশ যা দেওয়ার দিয়েছেন, মেহেরবানি করে আর বাঁশ দিয়েন না।’ কালের বিবর্তনে প্রচলিত প্রবাদটি , এ যুগেও নানারূপে বহুল ব্যবহৃত-

এতদিন ছিল মুখে মুখে প্রচলিত প্রবাদ কিন্তু এখন আধুনিক যুগে বাঁশ প্রকৃতি থেকে হারিয়ে যেতে বসলেও, মানুষ বাঁশের বৈচিত্র্যতা অব্যহত রেখেছে। নেতিবাচক কথার সাথে কাজেও বাঁশের ব্যবহার উদ্বেগজনক। এ দেশে বাঁশের অগণিত ব্যবহারের সঙ্গে সম্প্রতি যোগ হয়েছে কালভার্ট ও ভবন নির্মাণে লোহার রডের সঙ্গে বাঁশের মিশ্রণ! ঠিকাদার রাতের আধারে বিখ্যাত স্থপতি বনে যায় কিন্তু নিজের ল্যাবরেটরীতে পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করেই বাস্তবে প্রয়োগ! এটাই সমস্যা..! নেতিবাচক কচকচানি বাদ দিয়ে বাঁশের ইতিবাচক আরো কিছু বিষয় দেখার চেষ্টা করি-

নথিপত্রে ভিয়েতনামে বাঁশের ব্যবহারের তেমন তথ্য নেই কিন্তু আজ থেকে অনেক আগে মাতৃভূমিকে রক্ষায় স্বদেশী ভিয়েতনামিরা বাঁশ ঝাড়ের মাটির নিচে, মূলত বাঁশ ও কঞ্চির সাহায্যে বিশাল ক্যান্টনমেন্ট দুর্গ তৈরি করেছিল। বাঁশ-কঞ্চির বিভিন্ন ফাঁদে মার্কিন বাহিনী পরাস্থ হতো। অত্যাধুনিক ভিয়েতনামে, এখনোও বাঁশের বহুল প্রচলন আছে। ভিয়েতনামের গ্রাম অঞ্চলের মানুষ মাঝে বাঁশের উৎপাদন-পরিচর্যা ও প্রচলন লক্ষণীয়। তবে ভিয়েতনাম বাঁশকে প্রকৃতিগত ভাবে প্রক্রিয়াজাত করণের মাধ্যমে টেকসই করে নানা ধরনের কাজ করে চলছে। এক গহীন গ্রামে বসবাসরত ভিয়েতনামি কমরেড কথা প্রসঙ্গে বলেছিলেন; ‘বাঁশের জন্মস্থান কোথায় জানি না, তবে বাঁশ ভিয়েতনাম এর জাতীয় উদ্ভিদ হলে মন্দ হয় না’। ভারতে যেমন; রাস্তার মাঝে বা পাশে প্রাচিন বটবৃক্ষ চোখ পড়ে, ঠিক তেমনিভাবে ভিয়েতনামে পাকা রাস্তার মাঝখানে বাঁশঝাড় বিস্ময়কর!

খানজাহান আলী বাঁশের সাকো নির্মাণ করে ভৈরব নদ পার হয়ে মুড়লীতে আগমন করেন বলে জানা যায়। নারকেলবাড়িয়া গ্রামে তিতুমীর বাঁশ দিয়ে তৈরি করেছিলেন কেল্লা, সেখানেই ব্রিটিশ ও জমিদারদের বিরুদ্ধে লড়ার জন্য দুর্গ গড়েছিলেন। একসময় নীলকরদের প্রতিহত করতে, বাঙলার সাধারণ কৃষকেরা বাঁশের চোঙ্গে আগুন ধরিয়ে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে ছুড়ে মারতো, এতে ভীতসন্ত্রস্থ ছিল দখলদার ব্রিটিশ বাহিনী। একসময়কার শ্রদ্ধেয় শিক্ষকগণ ছাত্রদের দুষ্টুমি নিবারণে বাঁশের কঞ্চি থেরাপি দিতেন।

গ্রাম বাংলার লাঠি খেলায় বাঁশের ব্যবহার। দেশের কৃষকদের বাঁশের মাথাল ও নাঙলা নড়ি অবিচ্ছেদ্য অংশ। বাঁশের বাঁশিতে মানুষের পাগল করে মন। বাঁশ নিয়ে কত শত কবিতা ও গান সৃষ্টি করেছেন কবি-সাহিত্যিকরা, ফটোগ্রাফার কত ছবি তুলেছেন, তার কোন ইয়াত্তা নেই। অনেকের পাঠ্যপুস্তকের বিখ্যাত সেই ‘কাজলা দিদি’ কবিতাটি মনে প্রানে দোলা দেয় ‘বাঁশ-বাগানের মাথার উপর চাঁদ উঠেছে ওই,মাগো আমার শোলক্-বলা কাজলা দিদি কই?…’ যা বাস্তবের সাথে মিলেমিশে একাকার ছিল, তাই হয়তো মুখস্থবিদ্যা নিষ্প্রয়োজন ছিল।

তাইতো প্রবাদ বাক্যে, ‘মুখস্তগত বিদ্যা, পরহস্তে ধন, নহে বিদ্যা নহে ধন হলে প্রয়োজন’ এর মতই; পরিবেশ বিপর্যয়ে প্রকৃতির চোখ বন্ধ, মানুষের মুখে মুখোশ। তবুও প্রায় সবে ফটোসেশনের জগতে বন্দী। তাই পরিবেশ ও মানব মুখোমুখি সংঘর্ষে বাংলা প্রকৃতি হতে হারিয়ে গেছে বাঙালির প্রধান খাদ্য ধানের বিপুল প্রজাতির ভান্ডার। তেমনি ভাবে হারিয়ে গেছে, অনেক প্রজাতির প্রাণী।

বিশ্বায়নের কুপ্রভাবে বৈদেশিক আগ্রাসনে দেশীয় প্রজাতির বৃক্ষ-উদ্ভিদ ও প্রাণী অস্তত্ব সংকটে। এমনকি খেলার মাঠ সমূহে দূর্বা ঘাসের পরিবর্তে অনেটাই কৃত্রিম ঘাস ব্যবহৃত হচ্ছে। দেশীয় বাঁশের ক্ষেত্রেও এমনটি ঘটছে। তাই হয়তো; জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও ইকো-ট্যুরিজম উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায়, দেশের একমাত্র জাতীয় বাঁশ উদ্যান করা হয়েছিল, সিলেট শহরতলীর বিমানবন্দর এলাকার বন বিভাগের ফরেস্ট স্কুল অ্যান্ড ট্রেনিং ইনস্টিটিউট চত্বরে কিন্তু জাতীয় বাঁশ উদ্যানে বাঁশের চিহ্নও নেই। এই ধরনের প্রায় সব উদ্যোগের হালচাল একরমই..

প্রকৃতির সন্তান মানুষ পরিবেশকে অতিমাত্রায় ক্ষতিসাধন করে চলছে। তাই প্রকৃতির বিরূপ প্রতিক্রিয়ায় পরিবেশ বিপর্যয়ে বিপন্ন পৃথিবীতে, এখন প্রাণের টিকে থাকা দায়। এইভাবে জীববৈচিত্র্য হারায়ে পৃথিবী ধ্বংস হচ্ছে। অনিবার্য সত্য একদিন পৃথিবী ধ্বংস হবে। তবে মানুষ তা বিলম্বিত অথবা ত্বরান্বিত করতে পারে। দেশে নির্বিচারে বাঁশের ঝাড় উজাড় হচ্ছে কিন্তু নেতিবাচক প্রবাদ বাক্য ঠিকই ব্যবহৃত। সামাজিকভাবে মুখে মুখে প্রচলিত, বাঁশতলা-নিম-হিজল-তমাল-ছাতিয়ান-বটতলা ইত্যাদি পরবর্তীতে কাগজ-কলমে নামকরণ হলেও, এখন বাস্তবে অনেক জায়গায় সেই বৃক্ষের অস্তিত্ব নেই। তাই শঙ্কা; অদূর ভবিষ্যতে অনেক জিনিসের মতই দেশীয় বাঁশও ভার্চুয়াল জগতের বাসিন্দা হবে! নিশ্চয়ই সেটা সচেতন মানুষের কাম্য নয়।

লেখক: তরিকুল ইসলাম পলাশ প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী এইড ফাউন্ডেশন

 

 

Sharing is caring!

Related Articles

Back to top button