কেমন আছে সুন্দরবন?

 

(প্রতিবেদনটি সুন্দরবনের ভারতীয় অংশের হলেও বাংলাদেশ অংশে ও এই চিত্র ভিন্ন নয়)

সুন্দরবন বিপন্ন। একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগ, নদীর ভাঙন, মাটি ও জলের লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়া, এসবেরই নিট ফল সুন্দরবনের বিপন্নতা। লোভ-তাড়িত, অপরিকল্পিত উন্নয়ন সুন্দরবনের বিপন্নতাকে কমায় নি, বরং আরো কয়েকগুণ বাড়িয়ে তুলেছে।

কয়েক দশক ধরে নির্বিচারে ম্যানগ্রোভ ধ্বংস হয়েছে। ভৌগোলিক ভাবে দুর্বল জায়গাগুলোতে তৈরি হয়েছে হোটেল, রিসর্ট,ইঁটসিমেন্টের অগুন্তি কাঠামো। দীর্ঘমেয়াদি পরিপ্রেক্ষিত মাথায় রেখে সুস্থায়ি উন্নয়নের যথাযথ কোনো পরিকল্পনাই করা হয় নি সুন্দরবনের জন্য। ঘূর্ণিঝড় ইয়াস ও তার পরের জলোচ্ছ্বাস সুন্দরবনের এই ভ্রান্ত উন্নয়নকে আরো একবার বেআব্রু করে দিয়েছে।

ইয়াসের পর কেটে গিয়েছে বেশ কয়েকটা দিন। এই মুহূর্তে ঠিক কেমন আছে সুন্দরবন? কী ভাবছেন বা কী চাইছেন সুন্দরবনের মানুষ? সেটা জানতেই সবুজমন-এর পক্ষ থেকে রওনা দিয়েছিলাম সুন্দরবনের পথে। যা দেখলাম, যা বুঝলাম তাতে দুশ্চিন্তা বাড়লো ছাড়া কমলো না।

কলকাতা থেকে বাইকে সোজা বারুইপুর। সেখান থেকে ক্যানিং। এ পর্যন্ত রাস্তা, ‘হেমামালিনীর গালের মতো’ মসৃণ না হলেও, বেশ ভালো। ক্যানিং ব্রীজ ধরে মাতলা নদী পেরোনোর পরেই দুর্ভোগ শুরু। বাসন্তী হয়ে গদখালি পর্যন্ত রাস্তা খুবই খারাপ। তার ওপর গত কয়েকদিনের বৃষ্টিতে রাস্তায় জলকাদা জমে অবস্থা আরো বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে।

যাওয়ার পথেই চোখে পড়লো ত্রাণের বহর নিয়ে সুন্দরবনের পথে ছুটে চলেছে সারি সারি গাড়ি। বড়ো ট্রাক, ম্যাটাডোর, বোলেরো… প্রত্যেক গাড়ির সামনে লটকানো ব্যানার, অমুক সংঘ, অমুক সমিতি, কিংবা তমুক সোসাইটি। সবাই বিপন্ন সুন্দরবনের মানুষকে ত্রাণ পৌঁছে দিতে হুড়মুড়িয়ে ছুটে চলেছেন। কে কার আগে যাবেন, কে কাকে ওভারটেক করবেন, তা নিয়ে চলছে রীতিমতো প্রতিযোগিতা।

গদখালি থেকে বাইক নিয়ে খেয়ায় বিদ্যাধরী নদী পার হলাম। মওকা বুঝে কলকাত্তাইয়া বাবুদের থেকে যতোটা বেশি হাতিয়ে নেওয়া যায় তার জন্য তৎপর খেয়া মাঝির দল (ওদেরকে কে বোঝাবে যে সবুজমন-এর লোক কলকাত্তাইয়া বাবু নয়)। বাইক পার করার জন্য সব মিলিয়ে প্রায় শ খানেক টাকা দিতে হলো (ধারণার বাইরে!)। আরো মজা হচ্ছে, খেয়াঘাটে কোথাও কোনো রেট চার্ট নেই।

খেয়ায় নদী পার হয়ে চলে এলাম গোসাবা বাজারে। সেখান থেকে স্থানীয় লোকদের সঙ্গে নিয়ে দু দিন ধরে চষে বেড়ালাম সোনাগাঁ, দুলকি, কাটাখালি, আরামপুর, পাখিরালয় সহ গোসাবার বেশ কিছু গ্রামে। যা দেখলাম, যা বুঝলাম মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে গেলো।

মর্মান্তিক প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের পর ত্রাণ তৎপরতা যে নেই তা নয়। সারা বাংলা থেকে বহু সংস্থা ও দাতব্য প্রতিষ্ঠান আসছেন, ত্রাণ দিচ্ছেন। চাল, ডাল, সর্ষের তেল, আলু, কুমড়ো, সবজি, চিঁড়ে, মুড়ি… ত্রাণ নিতে দূর দূরান্ত থেকে লাইন দিয়ে মানুষ আসছেন। বহু জায়গাতেই স্থানীয় গ্রামবাসীরা বহিরাগত ত্রাণের ওপর নির্ভর করে কমিউনিটি কিচেন চালাচ্ছেন। সেখানে দু বেলা পাত পেড়ে খাচ্ছেন শত শত মানুষ। পানীয় জলের সমস্যা খুব বেশি চোখে পড়লো না।

তবে সমস্যা আছে অন্য জায়গায়। একটা বড়ো সমস্যা হলো ত্রাণের অসম বণ্টন। যেমন, দুর্গাদোয়ানি নদীর বাঁধ ভেঙে যেখানে ব্যাপক বানভাসি হয়েছে সেখানে গিয়ে শোনা গেলো অভিযোগ। পাখিরালয়ের মতো জায়গা, যেগুলো পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে বেশি পরিচিত, সেখানে নাকি ত্রাণ বেশি আসছে। অথচ প্রত্যন্ত গ্রামগুলিতে যেখানে ত্রাণের প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি, সেখানে যথেষ্ট ত্রাণ পৌঁছাচ্ছে না।

আরো একটা মস্তো বড়ো পরিবেশ-অন্যায় চোখে পড়লো। ত্রাণের সাথে উপরি পাওনা হিসেবে সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্রে জমা হচ্ছে বিপুল পরিমান প্লাস্টিক আবর্জনা। এটা নিয়ে কারোর কোনো হেলদোল নেই।

এই দুর্যোগে সরকারি ত্রাণের অপ্রতুলতা চোখে পড়ার মতো। তবে যেসব জায়গায় নদীবাঁধ ভেঙেছে, সেখানে জেসিবি মেশিন দিয়ে জরুরি ভিত্তিতে বাঁধ মেরামতির কাজ চলছে। অবশ্য সরকারি কাজে মাত্রাছাড়া দুর্নীতি নিয়ে সুন্দরবনে কান পাতলে অনেক কিছুই শোনা যায়। গত কয়েক বছরে কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছিলো নদীবাঁধে ও ম্যানগ্রোভ বনায়নে। অভিযোগ, তার সৎব্যবহার হয়নি, পকেট ভরেছে কন্ট্রাক্টর ও স্থানীয় নেতাদের।

সুন্দরবনের জনসাধারণের একাংশ এখন স্থায়ী কংক্রিটের নদীবাঁধ চাইছেন। পরিবেশ-বিশেষজ্ঞরা অনেকেই আবার মনে করছেন, কংক্রিটের নদী বাঁধ দিয়ে সুন্দরবনের নদীকে শাসন করার খোয়াব না দেখাই ভালো। বিতর্ক চলছে।

ত্রাণ দিয়ে যে মানুষের সমস্যার স্থায়ী কোনো সমাধান আসলে সম্ভব নয়, সেটা খুব ভালো করেই বুঝতে পারছেন জনসাধারণ। তাই সুন্দরবনের সদর্থক উন্নয়নের দাবিতে ধীরে ধীরে প্রবল হচ্ছে জনমত। গড়ে উঠছে আন্দোলন। আসলে প্রকৃতিকে শাসন করে, ইচ্ছেমতো লোভলালসা চরিতার্থ করে প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়। প্রকৃত উন্নয়ন হতে পারে প্রকৃতির সাথে সমন্বয় করেই। তার জন্য দরকার মেয়াদি পরিকল্পনা, পরিবেশ-বান্ধব কৃষি, সামাজিক ন্যায় ও প্রগতিশীল চিন্তাভাবনা।

সুন্দরবনের বিস্তীর্ণ অংশে এখনো চাষের জমি জলের নীচে তলিয়ে আছে। লোনা জল ঢুকে যাওয়ায় মাটির লবণাক্ততা বেড়ে গেছে। নষ্ট হয়েছে খেতের ফসল, শাক সবজি। মারা গেছে পেঁপে, কাঁঠাল, আম, জাম সহ অসংখ্য ফলের গাছ। আরো বহু গাছপালা মৃত্যুপথ যাত্রী। সুন্দরবনের বিভিন্ন গ্রামের বাসিন্দা প্রশান্ত মন্ডল, জামিরুল লস্কর, তপন সর্দার, কিংকর দেবনাথরা জানালেন, আগামি দুতিন বছর এখানকার জমিতে চাষাবাদ করা সম্ভব হবে না।

সামনে অন্ধকার ভবিষ্যৎ। তবু হার না মেনে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ, লড়াই চালাচ্ছেন সুন্দরবনের মানুষ। এই লড়াইয়ে আমরা কীভাবে তাদের পাশে দাঁড়াতে পারি?

সৌজন্যে: সবুজ মন

Sharing is caring!

Related Articles

Back to top button