বায়ু দূষণ এবং ভারত বর্ষ: ভবিষ্যৎ রূপরেখা

বায়ু দূষণ

 

(সবুজ পৃথিবী নামে ভারতের একটি এডুকেশন সাইট থেকে গ্রীন নিউজের পাঠকদের জন্য অনুমতিক্রমে নিবন্ধটি গ্রীন নিউজে প্রকাশ করা হলো।)

ভারতবর্ষে বর্তমানে বায়ু দূষণ নিয়ে রীতিমতো মাতামাতি হচ্ছে। নিয়মিত বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় লেখালিখি চলছে, আলোচনাচক্র বসছে, খবরের কাগজে দিল্লি ছাড়াও বিভিন্ন অঞ্চলের বায়ু দূষণ নিয়ে একাধিক প্রবন্ধ চোখে পড়ছে। এরইমধ্যে একাধিক তথ্যাবলী হাতে আসছে আমাদের, যেমন বিখ্যাত জার্নাল ল্যানসেটে প্রকাশিত এক বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ দেখা গেছে যে বায়ু দূষণের ফলে হওয়া রোগ এবং তার চিকিৎসার কারণে প্রতিবছর ভারতবর্ষের ৩৭ মিলিয়ন ইউ এস ডলার খরচা হচ্ছে। ভারতবর্ষের প্রতি পাঁচটি মৃত্যুর একটি হচ্ছে বায়ু দূষণের কারণে। বৈজ্ঞানিক গবেষণায় আরো প্রকাশ ভারতবর্ষে বাইরের বায়ু দূষণ আউটডোর পলিউশনের পরিমাণ দ্বিগুণ বেড়েছে শেষ তিন দশকে। যদিও ইনডোর পলিউশন বা ঘরের মধ্যে কার বায়ু দূষণের পরিমাণ শেষ তিন দশকে বেশ কমেছে কিন্তু তাও প্রতিবছর যথেষ্ট পরিমাণ মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়ে যায়।

বিভিন্ন ইন্টার্গবর্ণমেন্টাল এজেন্সির রিপোর্ট অনুযায়ী বিশ্বের দশটি মোট বায়ু দূষণকারী শহরটি অবস্থিত ভারতবর্ষে। বায়ু দূষণের জন্য কুখ্যাত সিন্ধু-গাঙ্গেয় উপত্যকার বিভিন্ন রাজ্যগুলিতে যেমন উত্তর প্রদেশ, বিহার, পাঞ্জাব, হরিয়ানা, পশ্চিমবঙ্গতে বায়ু দূষণের মাত্রা ভারতবর্ষের অন্যান্য রাজ্যগুলির থেকে অনেকটাই বেশি। এরমধ্যে দিল্লির কুখ্যাত বায়ু দূষণের সম্পর্কে কমবেশি আমরা সকলেই ওয়াকিবহাল, বায়ু দূষণের ফলে একটা সময় স্কুল অব্দি বন্ধ করে দিতে হয়েছিল দিল্লিতে। পি.এন.এ.এস জার্নালে প্রকাশিত সম্প্রতি এক বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধে দেখা গেছে যে শুধুমাত্র শহরাঞ্চলে নয় বায়ুদূষণ গ্রামাঞ্চলেও যথেষ্ট পরিমাণ চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। সমস্যাটা ঠিক কোথায়? কতটা ঠিকভাবে বলা হচ্ছে এই অনুসন্ধানগুলিতে? বায়ু দূষণ থেকে বাঁচতে আমাদের কি করা দরকার? এই সমস্ত নিয়ে আজকে এই প্রবন্ধের অবতারণা।

বায়ু দূষণকারী পদার্থ গুলির মধ্যে যেটি সবথেকে উল্লেখযোগ্য তাহলো পিএম 2.5। পিএম 2.5 বা পার্টিকুলেট ম্যাটার 2.5 হল আণুবীক্ষণিক কনা যার এরোডায়নামিক ডায়ামিটার ২.৫ মাইক্রোনের থেকে কম হয়। এই কণাগুলি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ এই কণাগুলোর ক্ষুদ্র আকারের জন্য এরা অনায়াসেই আমাদের ফুসফুসের মধ্যে দিয়ে রক্তবাহী নালীতে প্রবেশ করতে পারে। ফলে আমাদের ক্ষতি করার সম্ভাবনা এই কণাগুলি দ্বারা অনেক বেশি হয়। এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা ভালো যত ছোট কনা হবে ততই তার পেনিট্রেশন ক্ষমতা বেশি হবে। পি এম ২.৫ এর বাতাসে উপস্থিতি পরিমাপক যন্ত্র ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলে পলিউশন কন্ট্রোল বোর্ড এর মাধ্যমে বসানো হয়, মূলত দুই ধরনের যন্ত্র ব্যবহার করা হয় – এক ধরনের যন্ত্র হল অটোমেটিক যা প্রতি মুহূর্তের তথ্য দিতে সম্ভব, অন্য ধরনের যন্ত্রটিতে ম্যানুয়ালি বা হাতে করে ফিল্টার পেপার এর উপরে ধূলিকণা সংগ্রহ করে তার ওজন করা হয়।

ন্যাশনাল এয়ার কোয়ালিটি মনিটরিং প্রোগ্রাম এর আন্ডারে ভারতবর্ষের ৩৪৪ টি শহরে ৭৯৩ টি ম্যানুয়াল স্টেশন রয়েছে। অন্য দিকে ১৬২ টি শহরে ২৬৯ টি অটোমেটিক স্টেশন রয়েছে যা নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে বায়ু দূষক এর পরিমান আমাদের জানাতে থাকে। আমরা যদি ভারতবর্ষের দশ লক্ষেরও বেশি জনসংখ্যা আছে এরকম শহর গুলোর দিকে তাকাই, তাহলে আমরা দেখতে পাব, ৫৪ টি শহরের মধ্যে ১৩ টি শহরে কোন অটোমেটিক স্টেশন নেই, 25 টি শহরের মাত্র একটি করে অটোমেটিক স্টেশন রয়েছে। দিল্লি ছাড়া ভারতের কোন শহরে যথেষ্ট পরিমাণে এয়ার কোয়ালিটি মনিটর নেই। যে সমস্ত শহরে একটি বা দু’টি এয়ার কোয়ালিটি মনিটর রয়েছে সেই সমস্ত শহরে সেই মনিটর গুলি থেকে প্রাপ্ত তথ্য আদৌ সেই শহরের সম্পূর্ণ চিত্র কে রিপ্রেজেন্ট করতে পারে কিনা তা নিয়ে আশঙ্কা থেকেই যায়। যেমন সম্প্রতি খবরের কাগজে দুর্গাপুরের বায়ু দূষণ কলকাতা কেউ ছাড়িয়ে গেছে এরকম একটি খবর আমরা দেখেছি। সেই প্রসঙ্গে বলতে হয় কলকাতাতে যেখানে অটোমেটিক মনিটরিং স্টেশনের সংখ্যা ৭ টি সেখানে দুর্গাপুরে মাত্র ১ টি, এখন কথা হচ্ছে এই দুটি শহরের বায়ু দূষক পরিমাপ কোন যন্ত্রের পার্থক্য এতই বেশিএদেরকে তুলনা করা কখনই উচিত হবে না।

সম্প্রতি গ্রিনপিসের একটি রিপোর্টে প্রকাশ ভারতবর্ষের বর্তমান সংখ্যার দ্বিগুণেরও বেশি শহর আসলে বায়ু দূষণের প্রভাবে প্রভাবিত। সেই রিপোর্টের তথ্য থেকে আরও দেখা যাচ্ছে যে অধিকাংশ শহরেই একটি বা দু’টি বায়ু দূষণ পরিমাপক যন্ত্র রয়েছে। এইখানে একটা জিনিস বোঝা দরকার যে যে শহরগুলিতে একটি বা দুটি মাত্র বায়ুদূষক পরিমাপক যন্ত্র রয়েছে সেই শহরগুলিতে এই যন্ত্রগুলি এরকমভাবে বসানো হয় যাতে বিভিন্ন রাস্তার মোড়ে বা কল কারখানার সামনে কতটা বায়ু দূষণ হচ্ছে সেটা বোঝা যায়। অপরপক্ষে বেশি যন্ত্র থাকা শহরগুলিতে বিভিন্ন পলিউশন হটস্পট ছাড়াও রেসিডেন্সিয়াল বা বাসস্থান অঞ্চল, বিভিন্ন পার্ক বা গাছপালা যুক্ত অঞ্চল এবং শহরের বাইরে খোলামেলা অঞ্চলে বসানো হয়। এই ক্ষেত্রে শহরের বিভিন্ন অঞ্চলের বায়ু দূষণের মাত্রা নির্ধারণ করে শহরের গড় বায়ুদূষণ বোঝা সম্ভব হয়। কিন্তু যেখানে একটি বা দুটি যন্ত্র গোটা শহরের জন্য বরাদ্দ সেখানে কিন্তু শুধুমাত্র অত্যাধিক দূষণকারী জায়গাগুলোতেই এই যন্ত্র বসানো হয়। সে ক্ষেত্রে এই দুই শহরের তুলনা টানা একেবারেই উচিত নয়।

বায়ু দূষণ মাপার উদ্দেশ্য মূলত দুই রকমের, কোন কোন জায়গাতে সবথেকে বেশি পরিমাণে বায়ুদূষণ আছে সেটি নির্ধারণ করা এবং জনবহুল অঞ্চলে বায়ু দূষণের পরিমাণ কত তা নির্ধারন করা। অনেক সময়ই এই দুই উদ্দেশ্য সাধনের জন্য যতগুলি যন্ত্রের দরকার ততো গুলি পাওয়া যায় না। কাজেই একটি বা দুটি যন্ত্রের উপর ভিত্তি করে কোন শহরের দূষণ সাংঘাতিক বেশি তা দাগিয়ে দেয়া মোটেই যুক্তিযুক্ত হবে না।

বায়ু দূষণকারী যন্ত্রগুলি শহরের প্রাণকেন্দ্র গুলিতে মূলত বসানো হয়। যদি আমরা কলকাতার ক্ষেত্রে দেখি তাহলে দেখব যাদবপুর, বেলেঘাটা, পাক স্টিট এর মত অঞ্চলে বায়ু দূষণকারী যন্ত্রগুলো বসানো। পাশাপাশি ময়দান বা রবীন্দ্র ভারতী ইউনিভার্সিটির মত জায়গা যেখানে পথচারী মানুষের সংখ্যা অনেক বেশি সেখানেও এই যন্ত্রগুলি বসানো হয়েছে। সেন্সাস বা জনগণনার তথ্য থেকে দেখা যায় ভারতবর্ষের শহর গুলির একটি বড় অংশ বস্তিতে থাকে। ভারতবর্ষের বায়ু দূষণকারী বিভিন্ন স্টেশন গুলির অবস্থান লক্ষ্য করলে সহজেই বোঝা যায় যে এই বস্তিগুলির আশেপাশে বায়ু দূষণ মাপার কোন যন্ত্র বসানো থাকে না। অর্থাৎ কিনা শহরের বসবাসকারী মানুষের অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল অংশ তাদের আশেপাশের এলাকার বায়ু দূষণের পরিমান জানতে পারা থেকে বিরত থাকে। এটি একটি বৃহত্তর প্রশ্নের সম্মুখীন করে আমাদের – তাহলে কি একমাত্র অর্থনৈতিকভাবে স্বাচ্ছন্দ অংশের রয়েছে? এই প্রসঙ্গে আরো বলে রাখা ভালো, হাতেগোনা কয়েকটি স্টেশন ছাড়া ভারতবর্ষের প্রত্যেকটি বায়ু দূষণ মাপক যন্ত্র শহরাঞ্চলে অবস্থিত। অর্থাৎ বায়ুদূষনের মাত্রা বলতে আমরা যা বুঝি সেটা সর্বতোভাবে শহরকেন্দ্রিক। বায়ু দূষণকারী বিভিন্ন অংশের অবদান কতটা সে সংক্রান্ত গবেষণার যথেষ্ট পরিমাণে ঘাটতি রয়েছে। শহরের বিভিন্ন প্রান্তে বায়ু দূষণ মাপার যন্ত্র বসিয়ে সেখান থেকে তথ্য নিয়ে স্ট্যাটিস্টিকাল মডেলিং এর সাহায্যে ট্রান্সপোর্ট, ইন্ডাস্ট্রি, বায়োমাস বার্নিং এর মত বিভিন্ন সেক্টরের অবদান কত তা বের করার আশু প্রয়োজন রয়েছে। বিভিন্ন সেক্টরের অবদান কত তা আরেক ভাবেও বের করা সম্ভব, সেইজন্যে আমাদের প্রচুর পরিমাণে সার্ভের মাধ্যমে শহরে কতগুলি গাড়ি চলে বা কারখানা থেকে কতটা ধোঁয়া বেরোয়, প্রতিদিন কত কিলোগ্রাম কয়লা রান্না করতে ব্যবহার করা হয় – এই ধরনের তথ্যাবলী শহরের বিভিন্ন জায়গা থেকে তুলে এনে শহরের বায়ু দূষণের উৎস সম্পর্কে একটা গড় হিসেব পাওয়া সম্ভব। এই পদ্ধতিকে এমিশন ইনভেন্টরি বলে। ভারতবর্ষের বিভিন্ন শহরগুলিতে হাই রেসোলিউশন এমিশন ইনভেন্টরির যথেষ্ট প্রয়োজন রয়েছে। অতীতে যে সমস্ত দেশে শক্ত পলিসি নেওয়ার মাধ্যমে বায়ু দূষণের পরিমাণ অনেকটাই কমানো গেছে, সেই সমস্ত দেশে বায়ু দূষণের উৎস সম্পর্কে এবং বায়ু দূষণের পরিমাণ সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের ধারণা অনেকটাই বেশি ছিল। ভারতবর্ষে অদূর ভবিষ্যতে এই দুই ধরণের বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের অত্যন্ত প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।

এই আলোচনার মধ্য দিয়ে আমি বায়ু দূষণ সংক্রান্ত যে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারটিতে আলোকপাত করার চেষ্টা করলাম সেটি হলো আমাদের কাছে বায়ু দূষণ সংক্রান্ত তথ্য এতটাই কম যা আমাদের বায়ু দূষণ নিয়ন্ত্রণ কারি বিভিন্ন পলিসি আনতে বাধা দিচ্ছে। স্টেশনের সংখ্যা কম থাকার কারণে, সমস্ত জায়গায় স্টেশন না থাকার কারণে, বায়ু দূষণকারী পদার্থ গুলির উৎস সম্পর্কে ওয়াকিবহাল না থাকার কারণে আমরা সঠিকভাবে বায়ুদূষণ কে পর্যালোচনা করতে পারছিনা। যার ফলে বায়ু দূষণ নিয়ন্ত্রণ করবার পলিসি অবতারণা করা অত্যন্ত কঠিন কাজ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তাই বায়ু দূষণ নিয়ন্ত্রণের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি হোক আরো বেশি বেশি করে বায়ুদূষনের উৎসের সন্ধান এবং বায়ু দূষণ কে সঠিকভাবে মেজারমেন্ট করা।

সৌজন্যে: সবুজ পৃথিবী

Sharing is caring!

Related Articles

Back to top button