বানিয়াশান্তা ও আমাদের সমাজ: মিহির কান্তি মন্ডল

এখানে সকাল হয় একটু দেরিতে। সারা রাতের ছেড়া ছেড়া বিশ্রী ঘামঘুম শেষে। জ্বালা পোড়া ধরা চোখ; জাল দেয় চায়ের ছোট হাড়ি। ভাতার’দের আবার ভাতের আগে চা’ খাওয়া চাই। কেউ কেউ ওষুধ-বড়ি খেয়ে সারা রাত এনজয় করে। কেউ আবার পছন্দ করা মাগির সাথে কাটিয়ে দেয় সপ্তা। আবার কেউ এই পল্লীতেই মুখে মুখে কোন নটির স্বামী হয়ে থাকে। এখানেই ঘর ভাড়া নিয়ে থাকে, দোকানদারি করে। সন্তানাদি পয়দা করে। আবার ইচ্ছে হলে দেশে ফিরে যায়। তবে খুশি আপার বরের মত অনেকেই একদম নিরুদ্দেশও হয়ে যায়, অথবা এই পল্লীতেই নতুন কোন নটি ধরে, চোখের সামনেই পর হয়ে থাকে। কোলের বাচ্চা অন্য কারোর কোলে থুয়ে, সকাল, দুপুর, অথবা বিকেলের বিস্তৃরণ পশুরের জলে তাই খুশি আপাদের মত মহিলারা চোখ ভাসিয়ে বসে থাকে। কখন ঘাটে নৌকা ভেড়ে, অথবা, ভেড়ির উপর দিয়ে কোন ভাতার হেটে যায় কি না? এখানে পৌষ-মাঘ-ফাল্গুন এই তিন মাস ছাড়া বাকি বছর; বিছানাগুলো বলতে গেলে পশুরের মরা গোনের মত একদম মরা পড়ে থাকে। আবার আইলা,সিডর, আম্পান, ইয়াসে’র মত দূযোর্গ প্রতি বছর কেউ না কেউ হানা দেবে। ঘর-বাড়ি, দোকানপাট, আয়না, চুড়ি লিপস্টিকের সাথে রান্নার

চুলাটাও প্রতিবার ভেসে যায় বানের জলে। তবুও এই বেশ্যাদের চরে কখনো স্থায়ী কোন বাধ হয়না। এই মরে থাকার মাঝে তবুও তারা বাচতে চায়। ভাঙা বাধের গায়ে আবারও মাটি তোলে। ঘর দুয়ার বিছানা আবারও বিনোদন যোগ্য করে।
এখানে নারীদের পেটের হাড়িতে ভাত না থাকলেও ঠোঁটে ও বিছানায় টকটকে রং থাকে। ক্ষয়ে যাওয়া বাসি শরীরগুলো এখানে; বোবা মেঘেদের মতন। রঙের -ঝিলিক অথবা গর্জন নেই , গতরে কোন ফুরফুরে ঘ্রাণও নেই। আছে শুরু আধ-পেটে অথবা খালি পেটে নিস্তেজ বেচে থাকা। যুবতী মাগীদের, থালা-ঘোটি-বাটি, ঘর লেপা ও ধোওয়া,মোছা করা। জল আর জারজ সন্তান গুলোকে পেলে-পুলে টেনে-টুনে বাসি মড়ার মত পশুরের চরে পড়ে থাকা। কবে এই জলে; পচা এই শরিরটা ভেসে যাবে, নাকি সমাজের অন্য নারী, মা, খালাদের মত ভালো কোন যায়গায় একটু মাটি পাবে? এই চিন্তায় বাকিটুকু জীবন বসে থাকা।

করোনা শুরু হওয়ার পর থেকে এই চরের নোনা জলের লাশগুলোর সন্ধানে, শেয়াল-কুকুররা তেমন আর আসে না। আমাদের সমাজ এখন ফাইব স্টার হোটেলে, ফ্লাট বাড়ি, ফেরি-বাসে, কোরেন্টাইন সেলেও সহজে নারীদের কামড়ে খায়। এখানে ডাক নামে অপেক্ষাকৃত এগিয়ে থাকা মা, বোনদের শরীর, সুনাম ও জৌলুসকে পুজি করে সাবান, সোডা সহ বাহারী স্বপ্নের বিজ্ঞাপন তৈরি হয়। করপোরেট বেচা কেনার বাজারে বুক পিঠ বাচিয়ে মেয়েদের বেচে থাকা এখন ভিষন দায়। তবুও আমরা এখনো পোশাকেই পাপ খুজি,পশুদের বৈধতা দেই। নারী শরীরকে নানান ভাবে পোস্টমর্টেম করে ওখানেই পাপ খুজি।

তবে খেয়াল করার বিষয় হলো; আমাদের এই সমাজে শুধু নারীরাই কেবল নিপিড়ীত হয়না, অর্থ-বিত্ত, প্রশাসনিক ও পলিটিক্যাল পাওয়ার থাকলে নারীরাও অনেক ক্ষেত্রে নিপিড়কের ভুমিকায় অবতীর্ণ হয়। তাই শুধু পোশাক-আশাকেই স্বাধীনতা খোজা, অথবা সো-কল্ড পস জীবনের প্রতি আকাংক্ষা বা আটকে থাকাটাই নারী মুক্তির শেষ কথা নয়।

সমাজের কোন মেয়েই শখ করে পতিতা হয়না। পরিবার ও ব্যাক্তি জীবনে অভাব অনটন, প্রবঞ্চনা ও প্রতারনার শিকার হয়ে সমাজের এই সব নিপিড়ীত নারীরা নিরুপায় অথবা বাধ্য হয়ে এই ধরনের পেশায় সাথে যুক্ত হয়। আমাদের দেশের বিভিন্ন শিল্প কলকারখানায়, কৃষিকাজে এবং ইনফরমাল সেক্ট্রর গুলোতে নারীরা প্রতিনিয়ত মজুরি বৈষম্য সহ নানান হয়রানির শিকার হয়। এই করোনা কালে রাষ্ট্রীয় পাটকল, চিনিকল সহ বেসরকারি পোশাক কারখানাগুলোতে হাজার হাজার শ্রমিককে বেকার করা হয়েছে। এই প্রতিযোগিতা মূলক কর্মসংস্থানের বাজারে অক্ষর জ্ঞানহীন আথবা আধাশিক্ষিত কাজ হারা নারী শ্রমিকদের অবস্থা খুবই শোচনীয়। পরিবার ও নিজের পেট চালাতেই এই সব অসহায় নারীদের মধ্যে অনেকেই দিনে দিনে হয়ে পড়ছে দিশেহারা, পথ হারা, সবশেষে পতিতা।
পশুরের চরে বানিয়াশান্তা অথবা নগরের নয় নাম্বার হোটেলের নারীদের নাভির নিচের গোভিরতা না খুজে একটু উনাদের নাড়ির খবর নিয়ে দেখুন। বাসা-বাড়ির কাজের কথা বলে যৌনপল্লীতে বেচে দেওয়া বাপ হারা আসহায় ১২ বছরের বিউটির মুখের স্থানে নিজের মেয়ের মুখটা একবার কল্পনা করে দেখুন। উত্তর মিলবে। পতিতা অথবা পতিতার সন্তানরা পাতাল থেকে জন্মায় না? আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রের দারা নিপিড়ীত ও নিষ্পেষিত হয়েই আজ তারা পতিতা।

লেখক: মিহির কান্তি মন্ডল, লেখক ও চলচ্চিত্র কর্মী

Sharing is caring!

Related Articles

Back to top button