ভারতে ব্ল্যাক ফাংগাসে অজস্র রোগীর মৃত্যু, আমাদের প্রস্তুতি কি?: ফিরোজ আহমেদ

ভারতে অজস্র ব্লাক ফাঙ্গাস রোগীর মৃত্যু বা চোখ হারাবার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে চিকিৎসা ব্যয় অস্বাভাবাবিক বেশি। এর আগে ভারতের পত্রিকায় দেখেছিলাম বেশ কয়েকজন চিকিৎসক দাবি করেছিলেন কেন্দ্র যেন এই চিকিৎসার ব্যয় নেয়, অসুধ যেন বিনামূল্যে দেয়।

আজকে প্রথম আলোতে দেখলাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্যবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. মনিরুল ইসলামের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা। ব্লাক ফাঙ্গাস রোগে আক্রান্ত তার ভগ্নিপতিকে চিকিৎসা করতে গিয়ে ইতিমধ্যে যা খরচ করেছেন, এবং যা করতে হবে, তার পরিমানটা অবিশ্বাস্য বিপুল। ২৭ থেকে ৫৪ লাখ টাকার শুধু ইনজেকশন লাগবে। এর বাইরে হয়তো ফুসফুসে অপারেশনও দরকার হবে।

আমাদের বন্ধু নিত্রার কথা মনে আছে! সামিনা লুৎফা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, জটিল একটি অসুখে আক্রান্ত হয়েছেন। অত্যন্ত বিরল এই রোগটি কখনো কখনো দেখা যায় কোন টিকার প্রতিক্রিয়ায়, যদিও হারের দিক থেকে সংখ্যাটা অত্যন্ত কম। কত খরচ হলো তাদের, জিজ্ঞাসা করতে ভয় লাগে। ২০? ৩০? আরও কত?

এই তো পরিস্থিতি। একদিকে দুই টাকার মালামাল আক্ষরিক অর্থেই দুই লাখ টাকায় কেনা, আরেকদিকে দরিদ্র জনগোষ্ঠী ও বাদ, মধ্যবিত্তেরই জন্য বিভিষীকার নাম হয়েছে বাংলাদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা।

আমরা মতাদর্শিকভাবে অবিলম্বে সকলের জন্য বিনামূল্যে মানসম্পন্ন চিকিৎসার পক্ষে। এর কোন বিকল্প নাই আমাদের সমাজে। তাতে স্বাস্থ্যখাতে অপচয়, মানহীন যত্রতত্র ক্লিনিক এই সব বন্ধ হতো, সেবার মান নিশ্চিত হতো, এবং যোগ্য সকল চিকিৎসকের পেশার নিশ্চয়তা, বিশ্রামের সুযোগ ও রোগীর পেছনে গড় সেবা দানের পরিস্থিতির উন্নতি ঘটতো। এখন যা পরিস্থিতি, তাতে টাকা খরচা করেও যে যথাযথ চিকিৎসা পাচ্ছি, সেই নিশ্চয়তা কখনো দিতে পারি না। বাংলাদেশে এই নিশ্চয়তা এমনকি সব চাইতে ব্যয়বহুলতম হাসপাতালগুলোতেও দেয়া যায় না। সেখানেও মুনাফা সর্বোচ্চ করবার জন্য মাথাপিছু চিকিৎসক আর সেবকের সংখ্যা কম কম রাখা হয়।

কেউ চাইলে তার জন্য আলাদা ক্লিনিকে সেবা নিক। কিন্তু জনগণের জন্য এমন সার্বজনীন চিকিৎসার আন্দোলন করা দরকার যেখানে প্রত্যেকে নিশ্চিন্ত মনে চিকিৎসা নিতে পারবেন। সরকারী ব্যক্তিবর্গ এবং জনপ্রতিনিধিরা সরকারী হাসপাতালে চিকিৎসা না নিলে চিকিৎসা ভাতা পাবেন না, এমন কঠোর আইনও দরকার। এটা ছাড়া দেশের চিকিৎসার মান উন্নত করায় মনোযোগ দেয়াই যাবে না।

এবং অন্তত পক্ষে অনতিবিলম্বে ক্যানসার, হৃৎরোগ, কিডনি এই সব ব্যয়বহুল চিকিৎসার ব্যবস্থা রাষ্ট্রীয় ভাবে করার কর্মসূচি গ্রহণ করাটা জরুরি।

স্বাস্থ্যের সাথে সমাজের অন্যান্য সব বিষয়গুলোও কিভাবে জড়িত থাকে, দেখুন। ব্লাক ফাঙ্গাসে আক্রান্ত হচ্ছেন প্রধানত ডায়াবেটিস রোগীরা! মানে এই যে খেলাধূলাহীন নাগরিক জীবন, যা এই ভারতে বহুমুত্র রোগের মহামারীর জন্য দায়ী, তা বাংলাদেশের জন্যও সত্যি। ফলে চিকিৎসার আগেই যে দরকার ছিল প্রতিরোধ– পাড়ায় উদ্যান, মাঠ, এই সব কিছু তো গুণ্ডাতন্ত্রের গ্রাসে চলে গেছে, যাচ্ছে। এখানে গুণ্ডাতন্ত্র ফাঁকা সব কিছু দখল করে নিচ্ছে, ওখানে গুণ্ডাতন্ত্র দুর্নীতি করে সব বরাদ্দ খেয়ে নিচ্ছে– বাংলাদেশের মানুষ এখনও সৌভাগ্যবান যে ভারতের মত পরিস্থিতি এদেশে তৈরি হয়নি।

প্রায়ই যখন দেখি মোসাহেবরা এই দুর্যোগের মুখেও বলছেন ব্লাক ফাঙ্গাস নিয়ে ভয়ের কিছু নাই, হাসি লাগে। সবগুলো সুনিশ্চিত সঙ্কটের মুখেই প্রতিবারই তারা এই কথা বলে, ভয়ের কিছু নাই, আমরা প্রস্তুত, আমরা সামলে ফেলেছি, কিন্তু মানুষ তাদের ঘনিষ্ঠজনদের হারাচ্ছেন, মানুষ নিঃস্ব হচ্ছেন, মানুষ আরও খারাপ ভবিষ্যতের আশঙ্কায় অস্থির হয়ে পড়ছেন। ক্ষমতাসীনদের হিসেবের খাতায় মানুষ জুয়ার আসরের গুটি মাত্র, মানুষের জীবনকে নিয়ে যা-তা খুশি তারা করে যাচ্ছে।

লেখক: ফিরোজ আহমেদ, প্রাবন্ধিক ও কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক পরিষদ সদস্য, গণসংহতি আন্দোলন

Sharing is caring!

Related Articles

Back to top button