রোজ গার্ডেনে একদিন

নিজের জেলায় বা দেশেরই কত জায়গা আছে যা দেখা হয়নি সঠিক পরিচিতির অভাবে। কিছুদিন আগে এই রোজ গার্ডেনের উপর একজনের পোস্ট দেখে এই বাড়ি দেখার আগ্রহ হলো ।
কিন্তু জানতে পারলাম এই বাড়ি দেখতে হলে পারমিশান লাগে। গেট বন্ধ থাকে, সিকিউরিটি গার্ড বসা থাকে। কাছাকাছি এক বন্ধু রেবা থাকে, তাকে বললাম। সে বললো আমি ব্যবস্থা করতে পারবো। যাক পালে জোয়ার লাগলো কিন্তু সে সময় ভরা বৃষ্টি, সেখানে পানি জমে আছে। ভালভাবে হাঁটা যাবে না, অগত্যা বাতিল করলাম সে ভ্রমন। গতকাল ছিল রোজগার্ডেন ভ্রমনের সেইদিন। আগের দিন প্রোগ্রাম সিডিউল করলাম। গ্রুপের বন্ধুদের বললাম কে কে যেতে পারবে চলো। আমরা ৯ জন হয়ে গেলাম। যদিও প্রচণ্ড গরম, এরই মধ্যে এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটা দেখে এলাম গ্রুপে। বাড়িটি টিকাটুলির কে এম দাস লেনে ।
এক নজরে জেনে নিতে পারি রোজ গার্ডেনের ইতিকথাঃ
নির্মাণশৈলীর অভিনবত্বে ‘রোজ গার্ডেন” পুরান ঢাকার দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্যকলার মধ্যে এক অনুপম ঐতিহাসিক নিদর্শন। বাড়িটির পরিচিতি কিন্তু যে এই ভবনের প্রতিষ্ঠাতা বা যে পরবর্তীতে ক্রয়সূত্রে এর মালিক তার নামানুসারে হয়নি। টিকাটুলীর হুমা সাহেবের বাড়ি বললেই ঢাকার যে-কোনো স্থান থেকেই চালক যথাস্থানে আপনাকে পৌঁছে দেবে – যেখানে বাড়ির ফটকে রোজ গার্ডেন নামটি শোভা পাচ্ছে, যদিও রোজ গার্ডেন বললে তেমন চেনে না।। সুবৃহৎ ভবনটির নান্দনিক শোভা ও কারুকাজ ঢাকার বৃটিশ শাসনামলে নির্মিত যে-কোনো অট্টালিকার চাইতে সৌন্দর্যমন্ডিত।
ব্রিটিশ আদলে গড়া প্রাসাদোপম এই ভবনটির প্রত্নতাত্বিক মূল্য অনেক।এছাড়া এই বাড়ির রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক পটভূমির দিক থেকেও রয়েছে অসাধারণ ইতিহাস,পুরাকীর্তি হিসাবে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক বর্তমানে সংরক্ষিত।
রোজ গার্ডেন নির্মাণের পিছনে বঞ্চনা আর অপমানের ইতিহাসও প্রচলিত আছে। জানা যায় হৃষিকেশ দাস নামে এক ধনাঢ্য হিন্দু জমিদার ছিলেন এই প্রাসাদটির মূল মালিক। উনিশ শতকের শেষের দিকে জমিদার নরেন্দ্রনারায়ন রায়ের বাগানবাড়ি বর্তমানে যা ‘বলধা গার্ডেন’ নামে পরিচিত – সেখানে এক জলসায় অংশগ্রহনের জন্য উপস্থিত হন হৃষিকেশ দাস। কিন্তু জমিদার নরেন্দ্রনারায়ন রায় হৃষিকেশ দাস নিম্নবর্ণের সনাতন হিন্দুধর্ম অনুসারী হওয়ায় তাকে অপমান করে তার সাথে সাক্ষাৎ করতেও অস্বীকার করেন। অপ্রত্যাশিত সেই অপমানের প্রতিশোধ নিতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হৃষিকেশ দাস আরও দৃষ্টিনন্দন একটি বাগানবাড়ি নির্মাণের পরিকল্পনা করেন। এর ফলশ্রুতিতে তিনি ক্রয় করেন ২২ বিঘার (সাত একর) জমি যা বলধা গার্ডেনের খ্যাতি আর ঐশ্বর্যকে ম্লান করে দিতে পারে। এতে ছিল নানা ধরণের ও রঙের গোলাপ; কিছু বিরল প্রজাতির গোলাপ ফুলও ছিল। বেশির ভাগই দেশের বাইরে থেকে সংগ্রহ করা। অপরূপ এই গোলাপ গাছের সংগ্রহের কারনেই বাড়িটির নাম দেয়া হয় রোজ গার্ডেন। চাহিদা ও মনমতোভাবে ভবন তৈরি করার জন্যে রোজ গার্ডেনের মূল নকশাটি কমপক্ষে তিনবার পরিবর্তন করা হয়। পুরো বাড়িজুড়ে করা হয় অসাধারণ সুক্ষ কারুকাজ আর নকশা। বাড়িটির সম্মুখে রয়েছে চারটি সুউচ্চ কলাম, প্রতিটি জানালার উপরে অর্ধবৃত্তাকার খিলান, পেঁচানো সিঁড়ি, বারান্দা সবকিছুই নিঁপুণ হাতের ছোঁয়ায় নির্মিত। বিশাল সাদা অট্টালিকাটির মূল আকর্ষণ হচ্ছে ডান্স হলরুম যেটিতে আছে ১৬টি দরজা, যার দশটি ব্রাজিলিয়ান সবুজ রঙের কাঁচ আর বাকি দরজাগুলো সাদা কাচে নির্মিত। ঘরের সিলিংগুলো হাতে আঁকা আর কাচের মাধ্যমে শোভিত করা। এছাড়াও এর অভ্যন্তর জুড়ে রয়েছে নানা দৃষ্টিনন্দন ডিজাইন, যা ভবনের আভিজাত্য আর সৌন্দর্যকে বাড়িয়ে দিয়েছে। যদিও আমরা আমজনতা সেই বাড়িতে ঢোকার অনুমতি পাইনি তাই দেখা বা ছবি তোলা হলো না । বাড়িটির সৌন্দর্য আরো বৃদ্ধি করতে এতে দুটি পুকুর খনন করা হয়, যার একটি বাড়িটির সামনে আর অপরটি পিছন যদিও এখন আর পেছনের সেই পুকুর নেই।
দুর্ভাগ্যক্রমে হৃষিকেশ দাস খুব বেশিদিন এই বাড়িতে বসবাস করতে পারেননি। তার বেহিসেবি আর অসংযত জীবনযাপন তাকে ক্রমাগত দরিদ্র থেকে দরিদ্রতর পর্যায়ে নিয়ে যায়।যথেচ্ছাচার বেসামাল জীবন যাপণের জন্য ঋষিকেশ দাসের অর্থনৈতিক ভারসাম্য ধবংসে পড়ে, তখন তিনি তার নির্মিত এই স্বপ্নবাড়ি বিক্রয় করতে বাধ্য হন। রোজ গার্ডেন নির্মাণকালীন সময়ে হৃষিকেশ দাস কাজী রশিদ-এর কাছ থেকে ঋণ গ্রহন করেন। আর তাই অনেকে ক্রেতার ভেতর এটি ক্রয়ের অগ্রাধিকার কাজী রশিদকেই দেয়া হয়। ১৯৩৬ সালে প্রাসাদতুল্য রোজ গার্ডেন ক্রয় করেন জনাব খান বাহাদূর কাজী আবদুর রশিদ, বি.এ.এম.এল.সি. (মেম্বার অফ বেঙ্গল লেজিসলেটিভ কাউন্সিল)। তিনি খান বাহাদূর উপাধিতেও ভূষিত হন ১৯৩৭ সালে।খান বাহাদূর কাজী আবদুর রশিদ ১৯৪৪ সালে ইন্তেকাল করেন। তার মৃত্যুর পর রোজ গার্ডেনের মালিকানা পান তার বড় ছেলে কাজী মোহাম্মদ বশীর (হুমায়ুন সাহেব)। তিনি ছিলেন রাজনীতিবিদ, সমাজসেবক ও পূর্ব পাকিস্তান সময়কালীন মিউনিসিপ্যালের দুই বার নির্বাচিত চেয়ারম্যান। ১৯৭১-এ বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার অব্যবহিত পূর্বে ১৯৭০-এবেঙ্গল স্টুডিও ও মোশন পিকচার্স লিমিটেড রোজ গার্ডেন প্যালেসের ইজারা নেয়। হারানো দিন নামের জনপ্রিয় চলচ্চিত্রের শুটিং এই বাড়িতে হয়েছিল। এ কারণে সে সময় ভবনটি “হুমায়ুন সাহেবের বাড়ি” হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠে।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ১৯৮৯ সালে রোজ গার্ডেনকে সংরক্ষিত ভবন হিসেবে ঘোষণা করে। কিন্তু আদালতে মামলা করে ১৯৯৩ সালে মালিকানা উত্তরাধিকারসূত্রে মরহুম খান বাহাদূর কাজী আবদুর রশিদের দ্বিতীয় পুত্র ব্যারিস্টার কাজী আবদুর রাকিব রোজ গার্ডেনের মালিকানা পান। হুমায়ূন সাহেব কি অকৃতদার ছিলেন?
আব্দুর রাকিব আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় ও পরবর্তীসময়ে —- থেকে বার-এট-ল শেষ করেন। তিনি নানা সংগঠন ও অর্গানাইজেশনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। ব্যারিস্টার কাজী আবদুর রাকিব ১৯৯৫ সালে ইন্তেকাল করেন। মরহুম ব্যারিস্টার কাজী আবদুর রাকিব একজন মানবদরদি ও বিশিষ্ট সমাজকর্মী ছিলেন, যিনি তার জমিদারির একটা অংশ দান করে গিয়েছেন মানবকল্যাণে। এরপর থেকে অদ্যাবধি তাঁর স্ত্রী লায়লা রকীবের মালিকানায় রয়েছে এই ভবনটি, আমরা তার অমায়িক ব্যবহারে মুগ্ধ হয়েছি।তিনি নানান গাছ কালেক্ট করে এই গার্ডেনে লাগান ও নিজেই তত্ত্বাবধান করেন।
রোজ গার্ডেনের বর্তমান মালিক রশীদের বংশধরগণ। বর্তমানে তার স্ত্রী মিসেস লায়লা রাকিব, একমাত্র কন্যা রুমানা তাবাসসুম ও দুই পুত্র ইঞ্জিনিয়ার কাজী আহমেদ রাশেদ ও ইঞ্জিনিয়ার কাজী আহমেদ সাজেদকে ওয়ারিশ রেখে যান। শুনেছি আহমেদ সাজেদ ঐতিহ্যবাহী রোজ গার্ডেনের নানান তথ্য সম্বলিত একটি বই বের করেছেন।
শুনলাম এই ২০১৮ তে বাংলাদেশ সরকার এ ভবনটি ৩৩১ কোটি ৭০ লাখ দুই হাজার ৯০০ টাকা মূল্যে ক্রয়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। পুরান ঢাকার বুকে কালের সাক্ষী রোজ গার্ডেন যেন ঐতিহ্যবাহী বর্ণাঢ্য ঢাকার প্রতিচ্ছবি।
তথ্যসূত্রঃ রোজগার্ডেনের ব্রোসিয়র, নেট

Sharing is caring!

Related Articles

Back to top button