ট্রায়ালের অনুমোদনের অপেক্ষায় বঙ্গভ্যাক্স

দেশীয় প্রতিষ্ঠান গ্লোব বায়োটেকের প্রস্তাবিত টিকা ‘বঙ্গভ্যাক্স’ খুব দ্রুত সময়ের মধ্যেই মানবদেহে পরীক্ষামূলক ব্যবহারের (ট্রায়াল) জন্য অনুমোদন পেতে পারে।  বাংলাদেশ মেডিক্যাল রিসার্চ কাউন্সিল—বিএমআরসিতে এগিয়ে চলছে ওই টিকার তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনার কাজ। এরই মধ্যে ওই টিকার ট্রায়ালের জন্য নিয়োজিত আন্তর্জাতিক সিআরও প্রতিষ্ঠানের কাছে আরো কিছু তথ্য-উপাত্ত চেয়ে নিয়েছে বিএমআরসির অনুমোদন কমিটি। এ ক্ষেত্রে এই টিকার এখন পর্যন্ত তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণে ইতিবাচক ফলাফলের ইঙ্গিত দিয়েছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএমআরসি অনুমোদন কমিটির একজন জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী। সেই সঙ্গে গ্লোব বায়োটেক ও সিআরও গ্রুপের বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের পরামর্শকরাও টিকাটির তথ্য-উপাত্তকে এ পর্যন্ত অনুমোদন পাওয়া অনেক টিকার চেয়ে ভালো ফলদায়ক হতে পারে বলে মনে করছেন। সেদিকে নজর রেখে যে প্রতিষ্ঠানে ট্রায়াল হবে, সেখানে প্রাথমিক প্রস্তুতিও শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের হেপাটোলজির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মামুন আল মাহতাব স্বপ্নীল বলেন, ‘বিএমআরসি থেকে পরামর্শক হিসেবে আমাদের কাছে নতুন করে কিছু তথ্য-উপাত্ত চাওয়া হয়েছে। সেগুলো আমরা গত বুধবার বিএমআরসিতে জমা দিয়েছি। আমি এবং সিআরও গ্রুপের অন্য পরামর্শক ও বিজ্ঞানীরা এই টিকার তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে এটিকে অনেক টিকার চেয়ে ভালো কিছু দিক দেখতে পাচ্ছি, যা ভালো ফলদায়ক হতে পারে।’

ওই বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘টিকাটি দেশে মানবদেহে ট্রায়ালের জন্য প্রয়োজনীয় সব শর্তই পূরণ করার মতো উপযুক্ত অবস্থায় আছে। সে হিসাবে আমরা আশা করছি, দ্রুত সময়ের মধ্যে বিএমআরসি হয়তো ট্রায়ালের জন্য অনাপত্তি দিয়ে দেবে।’

গ্লোব বায়োটেকের গবেষণা বিভাগের প্রধান ড. আসিফ মাহমুদ বলেন, ‘আমরা এখন বিএমআরসির দিকে চেয়ে আছি। আমাদের বিশ্বাস, যেকোনো সময় বিএমআরসি থেকে ট্রায়ালের জন্য অনাপত্তি দিয়ে দিতে পারে।’

বিএমআরসির একাধিক সূত্র জানায়, অনেক খুঁটিনাটি তথ্য-উপাত্ত সময় নিয়ে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। যাতে করে কোনো ভুলত্রুটির সুযোগ না থাকে। আর এই টিকার ট্রায়ালের অনুমোদন পেলে সেটা শুধু বাংলাদেশের জন্যই নয়, বিশ্বের অন্যান্য দেশের কাছেও আগ্রহ তৈরি করবে। এ ছাড়া এই টিকার যে সিআরও গ্রুপ রয়েছে তা এর আগে আরো কয়েকটি ট্রায়াল পরিচালনা করেছে।

গ্লোব বায়োটেক সূত্র জানায়, গত ২৮ ডিসেম্বর সরকারের ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর থেকে তাদের ট্রায়ালের কাজে ব্যবহারের জন্য নমুনা টিকা তৈরির অনুমতি দিয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরও এই অনুমতি দিয়েছে। এর আগে প্রথম গত বছর ২ জুলাই নিজেদের উদ্যোগে করোনার ভ্যাকসিন তৈরির কথা জানান দেয় গ্লোব বায়োটেক। তাদের দাবি, গত বছর মার্চ মাস থেকেই তারা উদ্ভাবনের কাজ শুরু করেছিল। একপর্যায়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার করোনাভাইরাসের টিকা উদ্ভাবনের আবেদনকারী তালিকায় নাম উঠেছে এই গ্লোব বায়োটেকের তিনটি প্রস্তাবিত টিকার। গত বছর ১৫ অক্টোবর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা গ্লোব বায়োটেকের ডি৬১৪জি ভেরিয়েন্ট এমআরএনএ, ডিএনএ প্লাসমিড এবং এডিনোভাইরাস টাইপ৫ ভেক্টর নামের তিনটি ভ্যাকসিনের নাম প্রার্থী তালিকায় তুলেছে। এ ক্ষেত্রে জানানো হয়, গ্লোব বায়োটেকই বিশ্বের একমাত্র প্রতিষ্ঠান, যা এককভাবে তিনটি টিকার নাম তালিকাভুক্ত করতে পেরেছে। এর মধ্যে প্রথম প্রস্তাবিত টিকা প্রথমে ‘ব্যানকভিড’ নামে পরিচিতি পায়, যা প্রাণীর দেহে প্রয়োগে সাফল্য পাওয়ার তথ্য জানানো হয়। পরে ওই টিকার ট্রায়াল করার জন্য গ্লোব বায়োটেক ও আইসিডিডিআরবির মধ্যে একটি সমঝোতা চুক্তিও হয়েছিল, কিন্তু আইসিডিডিআরবি চুক্তির পরও তেমন কোনো অগ্রগতি দেখাতে না পারায় গ্লোব ওই চুক্তি বাতিল করে।

গ্লোব বায়োটেক সূত্র জানায়, পুরো প্রক্রিয়া একসময় অনিশ্চিত হয়েছিল আইসিডিডিআরবির ধীরগতির কারণে। একপর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব গত ডিসেম্বর মাসে গ্লোব বায়োটেকের ল্যাবরেটরি পরিদর্শন করেন। তখন তিনি এই টিকার নাম ‘ব্যানকভিড’ পরিবর্তে ‘বঙ্গভ্যাক্স’ রাখার পরামর্শ দেন। সে অনুসারে পরে বঙ্গভ্যাক্স নামকরণ হয়।

ড. আসিফ মাহমুদ বলেন, ‘আমরা প্রাণিদেহে পরীক্ষা চালিয়ে এক ডোজেই বেশ ভালো ফল পেয়েছি। কিন্তু মানবদেহে সেটা হেরফের হতে পারে আবার না-ও হতে পারে। যদি মানবদেহেও প্রাণিদেহের মতো কার্যকারিতা পাওয়া যায়, তবে এক ডোজেই কার্যকর হবে তা না হলে হয়তো দুই ডোজ লাগবে, যা নির্ধারিত হবে মানবদেহে ট্রায়ালের ভিত্তিতে।’

তিনি জানান, প্রস্তাবিত বঙ্গভ্যাক্সে এক মাস পর্যন্ত ২-৮ ডিগ্রি তাপমাত্রায় রাখা যাবে এবং মাইনাস ২০ ডিগ্রিতে ছয় মাস পর্যন্ত রাখা যাবে।

Sharing is caring!

Related Articles

Back to top button