গাধার পিঠে ছুটছে ঘোড়া

হোসেন সোহেল: বান্দরবানের নীলাচল, নীলগিরি, সাজেক কিংবা পাহাড় চূড়াতে নানান রিসোর্ট কটেজে, হোটেল মোটেলে লাখো পর্যটকের যাওয়া আসা। অথচ লাখো মানুষের ভীড়ে শতখানেক মানুষও বোধ করি একটি বিষয় জানেনা। পর্যটনে পর্যটকরা উঁচু পাহাড়ে বেড়াতে গিয়ে পাহাড়ের পাদদেশে আদিবাসিদের বিনামূল্যে উপহার দেয় তাদেরই ত্যাগ করা মলমূত্র ও ময়লা আর্বজনা। পর্যটন পর্যটকদের আদিবাসি পরিবেশ প্রকৃতির প্রতি এটা উপকার নাকি অপকার তা ভাবার কেউ আছে বলে মনে হয়না। অবশ্য টাকা খরচ করে পর্যটকরা আর দুহাতে কামিয়ে নিচ্ছে আবাসনের মালিকরা মাঝে রয়েছে মধ্যস্বত্বভোগী। সুতরাং এসব দেখার কেউ নেই।
গেলো বছর দশেক আগেই বান্দরবানের পাহাড় চূড়া নীলাচল থেকে মলমূত্র ময়লা আর্বজনা ফেলার কারণে নিচের হাতিভাঙ্গা পাড়ার একমাত্র পানি পানের উৎসটি পরিত্যক্ত হয়ে যায়। এদিকে শীতের পর বিশেষ করে গরমকালে দেখা দেয় পানির চরম সঙ্কট। একদিকে যখন প্রাকৃতিকভাবে পাহাড়ের গা চুইয়ে বিন্দু বিন্দু জলধারা নামে তখন একইসাথে পাহাড়ের গা চুইয়ে মলমূত্র মিশে একেবারেই নষ্ট হয়ে যায় ঝিরি ঝর্না কিংবা পাহাড়ের গা বেয়ে আসা পানির প্রধান উৎসটি।
পাহাড় চূড়া থেকে নিচের দিকে তাকালে আদিবাসি পাড়াগুলো দেখতে ভালো লাগে। কিন্তু উঁচূ পাহাড়ে পর্যটনের কারণে মানুষের সুপেয় খাবার পানির উৎস নষ্ট হয়ে দেখা দিয়েছে চরম পানিশূণ্যতা। পাহাড় চূড়ার পর্যটক পাহাড়ের পাদদেশে না নামলে এসব নিষ্ঠুর অমানবিক কাহিনী কখনও জানতেও পারবেনা। অথবা কজনই বা জানতে চায়।
শুধু তাই নয় বান্দরবান শহরে এমন কিছু হোটেল মোটেল রয়েছে যারা কিনা বর্ষাতে পয়ঃনিষ্কাশন ট্যাংকি পরিস্কার করতে পাহাড় চূড়া থেকে খুলে দেয়ে মলমূত্র বেরুবার দরজা। আর এসব মিশে একাকার হয়ে যায় বৃষ্টির পানির সাথে মলমূত্রের পানি। গরমকালে যেমন থাকে পানির সঙ্কট তেমনি বর্ষাকালেও থাকে পানির সঙ্কট। কারণ বর্ষাতে পানির সাথে নানান কিছু বা জীবানু ভেসে যায় এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে সেই সাথে যুক্ত হয় পর্যটনের পয়ঃনিষ্কাশন নল।
এদিকে তথ্য বলছে বছর বছর পাহাড়ের নানা প্রান্তে বেড়েছে ডাইরিয়া। বিশেষ করে শিশুদের এই সংক্রমণের হার বেড়েই চলেছে। বিশুদ্ধ পানির অভাবে গত দশ বছরে এই হার নিচে না নেমে উদ্ধমূখী এবং মৃতের সংখ্যা অনেক।
জেনে রাখা ভালো কোনরকম পরিবেশ প্রতিবেশের সমীক্ষা না করে পাহাড় চূড়াতে এসব পর্যটনের অবকাঠামো নির্মাণে পাহাড় পাদদেশে আদিবাসিদের জীবন একেবারে কোনঠাসা হয়ে পড়ছে। পানি সঙ্কটে তাদের জীবনধারণে নেমে এসেছে হাহাকারের আতঙ্ক। অথচ যেখানে পানিকে ঘিরে পাহাড়ের সমাজ সংস্কৃতি বেঁচে আছে দীর্ঘ বছর ধরে। সেখানে পানি শূণ্যতায় বেশ কয়েকটি পাড়া শতশত পরিবার পড়েছে মহাবিপাকে।
পানির সঙ্কটের ভয়াবহ ঝুকি বাড়াতে ঝিরি ঝর্ণার পাথর তুলে পানির উৎসে কফিনের শেষ পেড়েক ঠুকেছে নানা শ্রেণীর ফরিয়া, দালাল, আড়ৎদারসহ সরকারী দপ্তর এবং তা প্রকাশ্যে। সেসব পাথর দিয়ে আবার তৈরী হচ্ছে খোদ হোটেল মোটেলের নানান স্থাপনা, রাস্তাঘাট, কালর্ভাট ইত্যাদি। বলা যায় নিজেদের কবর নিজেরাই খুঁড়ছে প্রতিদিন।
এদিকে শহুরে জীবনের মতো পাহাড়ে থেকে পাহাড়ে নেই কোন পৌরসভা বা সিটি কপোর্রেশনের পানি সরবরাহের ব্যবস্থা। অথবা ফোন দিলেই পাওয়া যায় না পানি সরবরাহের গাড়ি। তাহলে উপত্যকায় বাসরত আদিবাসিরা পানি শূন্যতায় কি করবে …!? এই প্রশ্নের উত্তর নেই প্রশাসন কিংবা কিংবা কারও কাছে।
যে যার মতো পাহাড় থেকে পাহাড়ে গড়ে তুলছে এক থেকে পাঁচ তারকা হোটেল মোটেল। কিন্তু কিসের ভিত্তিতে কার অনুমতিতে এসব অবকাঠামো করছে।?
জেলা পরিষদ, আঞ্চলিক পরিষদ, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড, স্থানীয় প্রশাসন, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়, পর্যটন মন্ত্রনালয় অথবা সামরিক বেসামরিক সংস্থা বা বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড অথবা পরিবেশ ও বন অধিদপ্তর …… কার মাধ্যমে, কার অনুমতিতে, কার সমীক্ষায় এসব অবকাঠামো হয় এই উত্তর কেউ দিতে পারবেনা।
এসব প্রশ্ন করলে একটি ফুটবলের মাঠের খেলোয়ারদের মতো একজনের পায়ের বল আরেকজনের পায়ে ঠেলে দিয়ে নিজের দায়িত্ব সারেন। অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন ছুটছে তাই ঘোড়ার গতিতে গাধার পিঠে চড়ে।

Sharing is caring!

Related Articles

Back to top button