Tuesday, 24/11/2020 | : : UTC+6
Green News BD

করোনা: প্রতিরোধ যুদ্ধে সরকারের ভ্রান্তিবিলাস…

করোনা: প্রতিরোধ যুদ্ধে সরকারের ভ্রান্তিবিলাস…

আবু নাসের অনীক: ‘দ্বারে মৃত্যু, বনে বনে লেগেছে জোয়ার, পিছনে কি পথ নেই আর? আমাদের এই পলায়ন জেনেছে মরণ, অনুগামী ধূর্ত পিছে পিছে, প্রস্থানের চেষ্টা হল মিছে।’ সরকার করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধ যুদ্ধে জনগণকে সম্মুখে ঠেলে দিয়ে নিজে প্রস্থান করার চেষ্টা করেছে। কিন্ত তার এই প্রস্থান চেষ্টার পরেও করোনা তার পিছু ছাড়ছে না। ছাড়ছেনা বলেই একদিকে যেমন সংক্রমণ বাড়ছে অন্যদিকে মৃত্যু! লড়াই থেকে একবার পিছু হটলেই শত্রু তাকে প্রবলভাবে ঘিরে ধরে। আমারা তেমনি একটি পরিস্থিতির মধ্যে সময় পার করছি! আলোকপাত করছি কিভাবে সরকার পিছু হটেছে দিনের পর দিন-

১৯ এপ্রিল ২০২০, ১৭ জন বিশেষজ্ঞের সমন্বয়ে কোভিড-১৯ মোকাবেলার লক্ষ্যে ‘জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটি’ গঠন করে সরকার। এই কমিটি এখন পর্যন্ত কোভিড-১৯ নিয়ন্ত্রণে ১৭ টি সভা করেছে। এইসব সভার মাধ্যমে পাঁচ দফায় মোট ২৯ টি প্রস্তাব দিয়েছে। এর মধ্যে সরকার ৩ টি প্রস্তাব গ্রহণ করেছে। আর বাকি ২৬ টি প্রস্তাব ইগনোর অথবা ডিনাই করেছে। সর্বশেষ তারা করোনা বুলেটিন বন্ধ না করার সুপারিশ করেন এবং একই সাথে সপ্তাহে অন্তত একদিন গণমাধ্যম কর্মীদের মুখোমুখী হবার প্রস্তাব করেন। সরকার সেটা খারিজ করেছে।

এই কমিটির অন্যতম সদস্য অধ্যাপক ডা: ইকবাল আর্সালান বলেন,‘শুধু কমিটির সুপারিশ অবজ্ঞাই করা হয়নি; উল্টো স্বাস্থ্য বিভাগ ও প্রশাসন কমিটিকে অবহিত না করেই করোনা নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন সময়ে আরোপিত নানা বিধিনিষেধ অবৈজ্ঞানিকভাবে শিথিল করেছে ও নতুন নতুন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর ফলে স্থানীয় সংক্রমণ কমিউনিটিতে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে’। সাধারণ ছুটি ঘোষণা, পোষাক কারখানা খোলা-বন্ধ করা আবার খোলা, ঈদে কেনা-কাটা উপলক্ষে শপিং মল খুলে দেওয়া, ঈদ যাত্রায় নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও শিথিল, সাধারণ ছুটি না বাড়িয়ে সবকিছু খুলে দেওয়া এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ একটি সিদ্ধান্তের বিষয়েও সরকার পরামর্শক কমিটির সাথে নুন্যতম আলোচনা করেনি, এখনও করছেনা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিধিনিষেধ শিথিলে যেভাবে মানুষের মধ্যে উদাসীনতা তৈরি হয়েছে, তা ঠেকাতে হলে লকডাউন করে নমুনা পরীক্ষার সংখ্যা বাড়িয়ে আক্রান্তদের চিহ্নিত করতে হবে। আইইডিসিআর এর ১৪ আগস্টের তথ্য বলছে, টোলারবাগে আক্রান্ত আছে ৩১, ওয়ারীতে ২৬৯ এবং পূর্বরাজাবাজার এলাকায় ১৪৪ জন। এই এলাকা তিনটিকে রেডজোন থেকে গ্রীনজোন করার উদ্দেশ্য নিয়ে লকডাউন করলেও বর্তমান আক্রান্তের পরিসংখ্যান বলছে ফলাফল শুন্য। সে সময়ও বলা হয়েছিলো, এভাবে খন্ড খন্ড লকডাউন করে ইতিবাচক ফলাফল আসবে না। সরকার যথারীতি নিয়মে ইগনোর করেছে।

জনস্বাস্থ্যবিদ অধ্যাপক ডা: রশীদ-ই-মাহবুব বলেন,‘যেভাবে লকডাউন করা হয়েছে, তাতে আসলে লকডাউন করা হয়নি। এখন যেটা করতে হবে তা হল সংক্রমণ বিবেচনায় এলাকাগুলোকে আগে হটস্পট হিসাবে চিহ্নিত করতে হবে। তারপর ওই সব এলাকায় লক্ষণ-উপসর্গ থাকা রোগীদের যেমন টেস্ট করতে হবে, যাদের লক্ষণ-উপসর্গ নেই, তাদেরও দ্রুত টেস্ট করাতে হবে’। জাতীয় কমিটির অন্যতম সদস্য অধ্যাপক ডা: নজরুল ইসলাম বলেন,‘ কিন্তু তারা (স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়) তো আমাদের পাত্তাই দেয় না’। এটাই দেশের করোনা প্রতিরোধ যুদ্ধের অন্যতম ট্রাজেডি!

দেশে বর্তমানে নমুনা পরীক্ষা সর্বোচ্চ নমুনা পরীক্ষার তুলনায় ৭০ শতাংশ কমে গেছে। পূর্বে নমুনা পরীক্ষার জন্য ল্যাবরেটরিগুলোকে হিমসিম খেতে হতো, ভোর থেকে নমুনা দেওয়ার জন্য রোগীরা অপেক্ষা করতো। সেখানে অবস্থা এমন দাড়িয়েছে যে, নমুনা সংগ্রহের জন্য পর্যাপ্ত রোগী পাওয়া যাচ্ছে না। বর্তমানে ল্যাবরেটরির সংখ্যা ৯১ টি হলেও এখন এর সবগুলোর স্বক্ষমতা যাচায় করা সম্ভব হচ্ছেনা নমুনার অভাবে। সরকার শনাক্ত রোগীর সংখ্যা কম দেখানোর জন্য টেস্ট যাতে কম হয় তার জন্য মেকানিজম করে। ফলশ্রুতিতে রোগীদের টেস্টের প্রতি আগ্রহ একেবারেই নষ্ট হয়ে যায়।

এখন বলা হচ্ছে, সংক্রমণ কম হওয়ার কারণে পরীক্ষা কমে গেছে। অথচ সেই সময়ে সরকার ব্যতীত সর্বমহল থেকে বলা হয়েছিলো, সরকার টেস্ট বিষয়ে যে সকল সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে যাচ্ছে তার ফলশ্রুতিতে ব্যাপকভাবে টেস্টের সংখ্যা কমে যাবে। সরকারি সিদ্ধান্ত কার্যকরের একদিন পরেই টেস্টের সংখ্যা কমে যায় অদ্যাবধি পর্যন্ত সেই ধারা বিদ্যমান, স্বাভাবিকভাবে শনাক্তের সংখ্যাও কমে যায়। এবং সরকার প্রচার করতে থাকে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে। কী অসাধারণ সমীকরণ!! বিশ্বে ২১৩ টি দেশের মধ্যে জনসংখ্যার তুলনায় পার মিলিয়ন টেস্টে বাংলাদেশের অবস্থান ১৫৭তম, মোট সংক্রমণে অবস্থান ১৫তম, সক্রিয় সংক্রমণে ৯ম, নতুন সংক্রমণে ৫ম, নতুন মৃত্যুতে ৭ম, মোট মৃত্যুতে ২৯তম (ওয়ার্ল্ডোমিটার-২৫.০৮.২০২০)। সংক্রমণ কমে গেছে, কী বলেন!!! ব্যাপারটি এমন, সরকার যদি লবন দিয়ে সরবত বানিয়ে বলে চিনির সরবত, তাহলে সেটা চিনিরই সরবত, তাইতো!!

স্বাস্থ্যমন্ত্রী আবারো বাণী দিয়েছেন,‘ভারত যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বহু দেশেই করোনা সংক্রমণ অনেক বেশি। সে তুলনায় বাংলাদেশে জনসংখ্যা অনুপাতে করোনা সংক্রমণ বিশ্বের যেকোন দেশের চাইতে অনেক কম’। তথ্য কী বলে দেখুন….জনসংখ্যা অনুপাতে আমেরিকায় আক্রান্তের হার ১.৭৮৫%, ব্রাজিল ১.৭০৪%, রাশিয়া ০.৬৬২%, ইন্ডিয়া ০.২২৯%, বাংলাদেশ ০.১৮১%, পাকিস্তান ০.১৩২%, নেপাল ০.১১১%, শ্রীলংকা ০.০১৩%, চীন ০.০০৫%, জাপান ০.০৪৯%, দঃ কোরিয়া ০.০৩৪%(ওয়ার্ল্ডোমিটার-২৫.০৮.২০২০)। এরপরেও যদি কেউ বলে জনসংখ্যা অনুপাতে সংক্রমণ বিশ্বের যেকোন দেশের চাইতে কম, তাকে প্রথম শ্রেণীর মিথ্যাবাদী অথবা গুজব রটনাকারী হিসাবে অভিহিত করা কী ভুল হবে??

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার করোনাভাইরাস পরিস্থিতির রোগতাত্বিক সপ্তাহ হিসাবে বাংলাদেশ বর্তমানে ৩৪তম সপ্তাহ অতিক্রম করছে। সংস্থার গত ১৭ আগস্ট তারিখে প্রকাশিত ৩৩তম প্রতিবেদনে বলছে, আগের সপ্তাহের তুলনায় শনাক্ত বেড়েছে ১২.৫%, মৃত্যু বেড়েছে ৫.৩%, সুস্থতা কমেছে ৮.২৫%, সক্রিয় আক্রান্তের হার বেড়েছে ৭.৪%, পার মিলিয়নে আক্রান্ত বৃদ্ধি পেয়েছে ০.৯%(17 August 2020, Morbidity & Mortality Weekly Update-WHO)। পরিসংখ্যান প্রতিনিয়তো বলছে সংক্রমণ উর্দ্ধমুখী। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে অনবরত তথ্যকে পাশ কাটিয়ে পরিস্থিতির ভুল ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে।

সরকারী দলের সাধারণ সম্পাদক বিস্ময় প্রকাশ করে বলেছেন,‘ঘরের বাইরে গেলে মনে হয় দেশে করোনা কোনও ইস্যুই নয়’। জ্বী জনাব, কথা অতি সত্য! কিন্তু ইস্যুহীন পরিস্থিতি তো আপনারাই তৈরি করেছেন এটা কেন বিস্মৃত হচ্ছেন মাননীয়?? আপনাকে মনে করিয়ে দি, গত ০৩ আগস্ট আপনিই বলেছিলেন,‘বিশেষজ্ঞদের পূর্বাভাস ভুল প্রমাণ করে করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে’। আপনার এ ধরনের বক্তব্য দেবার পরেও দেশের জনগণের কাছে করোনা ইস্যু হওয়ার কারণ থাকেনা। সুতরাং এ বিষয়ে আপনার বিস্ময় প্রকাশ চুড়ান্ত স্ববিরোধীতা! অবশ্য এটা তো আপনাদের কাছে নতুন কিছু নয়। আমাদের মতো কিছু জনগণ যারা বৈজ্ঞানিকভাবে তথ্য বিশ্লেষণকে ভিত্তি ধরে পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করছি তাদের কাছে, যারা সংক্রমিত হচ্ছেন এবং করোনায় পরিবারের প্রিয় সদস্যটিকে হারিয়ে ফেলছেন এটা আজ শুধু তাদের কাছেই ইস্যু!!

আপনাদের সকল সফলতার গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে মৃত্যু কম! আর সুস্থতার হার বেশি! তথ্য সঠিকভাবে সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণ করছেন না বলেই কম আর বেশি। সেই আড়াল করা তথ্য তুলে ধরে জনগণকে বিভ্রান্ত করে যাচ্ছেন! আপনাদের হিসাবে এ পর্যন্ত মৃত্যু ৪ হাজার ২৮। দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণের উপসর্গ নিয়ে এ পর্যন্ত মৃত্যু ২ হাজার ১১০ (বিপিও)। সংখ্যা দুটি যোগ করলে হয় ৬ হাজার ১৩৮। গত লেখায় উদাহরণসহ উল্লেখ করেছিলাম এমন অনেক মৃত্যু ঘটছে যা করোনার প্রভাবে ঘটলেও করোনাজনিত মৃত্যু হিসাবে রেকর্ড হচ্ছে না। কারণ মৃত্যুর আগে করোনা নেগেটিভ রিপোর্ট এসেছে। গতকাল ২৪ আগস্ট যশোরের দুইজন বিশিষ্ট ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করেছেন যাদের একজনের একদিন আগে অন্যজনের এক সপ্তাহ আগে দ্বিতীয় টেস্টে করোনা নেগেটিভ রেজাল্ট এসেছিলো। কিন্তু করোনায় আক্রান্ত হবার কারণে তাদের উভয়েরই ফুসফুস ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে মৃত্যু হয়! তারা বিশিষ্ট ব্যক্তি বলে গণমাধ্যমে তাদের মৃত্যুর খবর আসছে, কিন্তু যারা তা নয় তাদের খবর আমজনতা জানছে না।

লন্ডনের ইমপেরিয়াল কলেজের গবেষকরা একটি গবেষণায় উল্লেখ করেছেন, করোনাভাইরাস দেহে নির্মূল হওয়ার পরেও ফুসফুসে প্রদাহ কিংবা রক্তজালে ফাটল তৈরি করছে। শুধু ফুসফুস নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কিডনিও। সুতরাং আক্রান্ত হয়ে নেগেটিভ হয়ে গেলেই আপনি ঝুঁকিমুক্ত এটা ভাবার কোন অবকাশ নেই। এজন্য করোনা প্রতিরোধ করাটাই মুখ্য। তারজন্য স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা অপরিহার্য।

শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা: নজরুল ইসলাম বলেন,‘এখন যদি কমাতে পারা যায়….কিন্তু সেটা কঠিন হবে। কারণ গণপরিবহনে যতো সিট তত যাত্রী নিয়ে চলছে, দোকান খোলা, অফিস চলছে আগের মতো, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বুলেটিন বন্ধ হয়েছে, করোনা এমনিতেই চলে যাবে মন্তব্য এসেছে নীতিনির্ধারকদের কাছ থেকে। এসব কারণে মানুষ আর এখন করোনাকে ভয় পায় না। এছাড়া মানুষ স্বাস্থ্যবিধি মানছে না, মাস্ক পরছে না। তাতে করে করোনা কমবে না, এমনই থাকবে’। এই গোটা পরিস্থিতিটা তৈরি করেছে সরকার।

একটি দেশ- রাষ্ট্র, সেখানে বসবাসবাসকারী জনগণের দেখভাল করার ব্যবস্থাপনার নিমিত্তেই সরকার, সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য রাজনীতি। সবকিছুর মূলে জনগণ, আমার স্বদেশ ভুমিতে তারাই আজ উপেক্ষিত, মহামারিকালীন ঝুঁকিতে নিমজ্জিত! চারদিকে হতাশার বিচ্ছুরণ, তারপরেও বলি..

‘অগ্নিশিখা, এসো এসো, আনো আনো আলো। দুঃখে সুখে ঘরে ঘরে গৃহদীপ জ্বালো।। আনো শক্তি, আনো দীপ্তি, আনো শান্তি, আনো তৃপ্তি, আনো স্নিগ্ধ ভালোবাসা, আনো নিত্য ভালো।।

লেখক
সাবেক সভাপতি, বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রী

Sharing is caring!

Advisory Editor
Kazi Sanowar Ahmed Lavlu
Editor
Nurul Afsar Mazumder Swapan
Sub-Editor
Barnadet Adhikary 
Dhaka office
38 / D / 3, 1st Floor, dillu Road, Magbazar.
Chittagong Office
Flat: 4 D , 5th Floor, Tower Karnafuly, kazir deori.
Phone: 01713311758

পুরানো খবর

নভেম্বর 2020
শনি রবি সোম বুধ বৃহ. শু.
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
282930  

ছবি ঘর

    WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com