Tuesday, 22/9/2020 | : : UTC+6
Green News BD

করোনা: শত্রুর সাথে বসবাসের পাঁচ মাস

করোনা: শত্রুর সাথে বসবাসের পাঁচ মাস

আবু  নাসের  অনীক: আমাদের এই মুহুর্তের চরম শত্রু করোনার সাথে বসবাসের পাঁচ মাস পার করেছি। পা রেখেছি ৬ ষ্ঠ মাসে। ইতিমধ্যে এই মাসের ৬ দিন পার হয়েছে। বিগত ও চলতি মাসে ক্রমান্বয়ে আমাদের এখানে সংক্রমণ বেড়েই চলেছে। অদ্যাবধি সংক্রমণের হার উর্দ্ধমুখী। যা তথ্য বিশ্লেষণ করলেই বোঝা যায়। যদিওবা সরকারের পক্ষ থেকে গলার জোরে বলা হচ্ছে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে।

ভাইরোলজিষ্ট অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন.‘মে মাসের শেষ দিক থেকে এখন পর্যন্ত সংক্রমণ একই গতিতে চলছে। রোগী শনাক্তের হার ২০-২৪ শতাংশ। এখনো সংক্রমণ কমার কোন লক্ষণ নেই। কারণ, তা কমানোর জন্য কার্যকর কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। এ ধরনের ভাইরাসের সংক্রমণ আপনা-আপনি কমে আসেনা।’

যেকোন মহামারি পরিস্থিতিকে মোকাবেলা করার অন্যতম প্রধান অস্ত্র তথ্য এবং এই তথ্যকে বিশ্লেষণের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ। যদি জুন ও জুলাইয়ের মধ্যে তুলনামূলক তথ্য বিশ্লেষণ করি তবে দেখব জুনের তুলনায় জুলাইয়ে ১ লাখ ৩০ হাজার পরীক্ষা কম হয়েছে। সংক্রমণের প্রথম মাসে শনাক্তের হার ছিলো ৪.২২%, দ্বিতীয় মাসে ১১.৭৮%, তৃতীয় মাসে ১৮.৪৯%, চতুর্থ মাসে ২১.৫১% আর পঞ্চম মাসে ২৩.০৪%(ওয়ার্ল্ডোমিটার)। অর্থাৎ শনাক্তের হার ক্রমেই বেড়েছে। এবং জুন থেকে জুলাইয়ে সনাক্তের সংখ্যা কমেছে পরীক্ষা কমিয়ে দেওয়ার কারণে।

পাঠক, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ হয়েছে কিনা এটা বোঝার জন্য আন্তর্জাতিক মানদন্ড হচ্ছে সংক্রমণের সর্বশেষ চুড়ান্ত পর্যায় থেকে টানা তিন সপ্তাহে যদি রোগী শনাক্ত ৫০ শতাংশ কমে আসে; নুন্যতম দুই সপ্তাহ যদি পরীক্ষা করা নমুনার ৫ শতাংশের কম পজিটিভ হিসাবে শনাক্ত হয়, তিন সপ্তাহ ধরে যদি মৃত্যু কমে আসে তাহলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুসারে বোঝা যাবে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে এসেছে। অথচ বাংলাদেশে এইসব নির্দেশকের একটিরও ধারে কাছে না থাকার পরেও সরকারের পক্ষ থেকে অনবরত বলা হচ্ছে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। এতে জনগণের মধ্যে নেতিবাচক প্রভাবের কারণে তারাও নুন্যতম স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলছে না।

বাংলাদেশে সংক্রমণ শনাক্তের পর জুন মাসে সর্বোচ্চ সংখ্যক পরীক্ষা হয় এবং সর্বোচ্চ সংখ্যক রোগীও শনাক্ত হয় জুন মাসেই। কিন্তু সংক্রমণের হার এখনও পর্যন্ত বেশি জুলাই মাসে। পূর্বেই উল্লেখ করেছি জুলাই মাসে পরীক্ষা কমেছে শনাক্তও কমেছে। জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের প্রতিবেদনে বলেছে,‘বাংলাদেশে নতুন রোগী শনাক্ত কমেছে। পরীক্ষাও কমেছে। কিন্তু শনাক্তের হার এখনো ২ শতাংশের ওপরে। এটা নির্দেশ করে পরীক্ষা কমায় নতুন রোগী কমেছে, সংক্রমণ কমেনি’।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেছেন,‘পরীক্ষা কমেনি, সময়মতো সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা কমে আসছে। আমাদের মৃত্যু হারও অনেক কম। তাছাড়া পরীক্ষা করাতে লোকের আগ্রহ কমে গেছে’। তার এই বক্তব্য যে পুরোটাই গলার জোরে বলা উপরের সকল উল্লেখিত তথ্য সেটিই নির্দেশ করে। এ ধরনের বাস্তব বিবর্জিত বক্তব্য প্রদান করে নিজেরা যেমন সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে পরিপূর্ণভাবে ব্যর্থ হচ্ছে একইসাথে জনগণকেও চরমভাবে বিভ্রান্ত করছে।

কথায় কথায় করোনায় মৃত্যুর সংখ্যা ও তার হার কম বলে আত্মতুষ্টিতে ভুগছে। অথচ তথ্য বলছে এই প্রসঙ্গেও সরকারের বক্তব্য বাস্তবতা বিবর্জিত। বর্তমানে মৃত্যুর সরকারি ঘোষিত সংখ্যা ৩ হাজার ৫৯১। ২২ মার্চ থেকে ১ আগস্ট পর্যন্ত উপসর্গ নিয়ে ১ হাজার ৯৮৪ জনের মৃত্যু হয়েছে (বিপিও)। ঘোষিত সংখ্যার সাথে এই সংখ্যা যোগ করলে হয় ৫ হাজার ৫৭৫। অংকটি মোটেও কম নয়!

বর্তমান অবস্থায় কোভিড-১৯ নিয়ন্ত্রণে অবাধ তথ্য প্রবাহ অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখতে পারে। কিন্তু মন্ত্রণালয় বুলেটিন বন্ধ করে তথ্য প্রবাহ বন্ধ করে দিল। এখন থেকে তারা প্রেস রিলিজ পাঠিয়ে তথ্য পরিবেশন করছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেছেন, এখন যেহেতু সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে এবং কমে এসেছে এ জন্য এই বুলেটিনের প্রয়োজন নেই। কিন্তু আমার কাছে মনে হয়েছে এই বুলেটিন প্রচার হতো সরাসরি। মাসের পর মাস তথ্য আড়াল করে প্রচার করতে করতে ক্লান্ত হয়ে তারা এটা বন্ধ করে দিয়েছে।

কোভিড-১৯ বিষয়ক কারিগরি পরামর্শক কমিটির সদস্য অধ্যাপক ডা.ইকবাল আর্সালান বলেন,‘এটা কোন ব্রিফিং হচ্ছিল না, বুলেটিন হচ্ছিল! সেখানে সাংবাদিকদের প্রশ্ন করার সুযোগ ছিলোনা। এখন এটাও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বন্ধ করে দিলো, তারা প্রেস রিলিজ পাঠাবে। কিন্তু এ ধরনের মহামারির পরিস্থিতিতে সারা পৃথিবীতেই সাংবাদিকদের মুখোমুখি হচ্ছে কর্তৃপক্ষ, তাদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দিচ্ছে। আর সেখানে বাংলাদেশ হলো উল্টো পরিস্থিতি। আমি মনে করিনা, এখানে ‘হাইড এ্যান্ড সিকের’ কিছু আছে অথবা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কিংবা অধিদপ্তরের বিব্রত হওয়ার কোন অবকাশ ছিলো। এগুলো কতটুকু বোধবুদ্ধি সম্পন্ন কাজ হচ্ছে সেটা নিয়ে আমার প্রশ্ন রয়েছে’। তথ্য সরবরাহের ঘাটতি থাকা মানে নিশ্চিতভাবেই গুজব সৃষ্টির হার বৃদ্ধি পাওয়া এটার অপরিহার্য বিষয়। অথচ সরকার গুজব ছড়ানোর নামে আইসিটি এ্যাক্টের মাধ্যমে অন্যায়ভাবে গ্রেপ্তার করছে অন্যদিকে গুজব সৃষ্টির সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি করে দিচ্ছে। এতো স্ববিরোধীতা নিয়ে মহামারি প্রতিরোধ করা কোনভাবেই সম্ভব নয়।

আইসিডিডিআর’বি এর সঙ্গে সমন্বিভাবে সরকারের আইইডিসিআর এর পরিচালনায় করা একটি গবেষণায় ঢাকার বাসিন্দাদের ৯ শতাংশ অর্থাৎ ১৮ লাখ করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত বলে উঠে এসেছে। গবেষণায় দেখা গেছে ঢাকার বস্তি এলাাকায় ৬ শতাংশ। অর্থাৎ বস্তি এলাকাতেও একটা বড় অংশ করোনায় আক্রান্ত হয়েছে। গবেষণাটি ১৮ এপ্রিল-৫ জুলাই এই সময়ের মধ্যে পরিচালনা করা হয় (বাংলাদেশ বিজনেস টাইমস)। সারা দেশের পরিসংখ্যাণ তো এর বাইরে থাকলো! এ ধরনের একটি ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে দাঁড়িয়ে সরকারের জিরো মেজার পলিসি দেশে চুড়ান্ত বিপর্যয়কর পরিস্থিতি ডেকে আনতে বাধ্য।

সরকারের ক্রমাগত আত্মতুষ্টি প্রকাশ করার কারণে জনগণের মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এখন নুন্যতম স্বাস্থ্যবিধি মানছে না। আমার পরিচিত, যিনি করোনা যুদ্ধে জয়লাভ করেছেন তার অভিজ্ঞতায় মানুষের মধ্যে ভয়কে কেন্দ্র করে বলেছেন,‘করোনা ভীতি নয় সচেতন হতে হবে’। কিন্তু আমার কাছে বাস্তব অবস্থা বিশ্লেষণে মনে হয়েছে বর্তমান স্তরে জনগণের মধ্যে করোনা সম্পর্কিত বিষয়ে নুন্যতম ভীতি নেই, আতংকিতও নয়, সে কারণে সে সচেতন হবারও প্রয়োজনবোধ করছে না। কারণ সে ভীত হলে বা আতংকিত হলে নুন্যতম স্বাস্থ্যবিধি পরিপালন করতো। কিন্তু সেটি পরিপালনের শতকরা হার খুবই নুন্যতম পর্যায়ে। ওনার অভিজ্ঞতার জায়গা থেকে মনে হয়েছে করোনা রোগীকে তার আত্মীয়-স্বজন এড়িয়ে চলে ভীতির কারণে। কিন্তু আমার পর্যবেক্ষণ বলে এটা ভীতি থেকে যতোটা না করে তার চেয়ে বেশি করে তার আত্মকেন্দ্রিকতা-আত্মসর্বস্বতার কারণে।

সত্যিকার অর্থেই করোনা সম্পর্কে মানুষ যদি আতঙ্কিত হতো তাহলে সে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলত। কোভিড-১৯ এ যিনি একবার সংক্রমিত হচ্ছেন আপাতভাবে সুস্থ হয়ে উঠলেও শরীরে দীর্ঘকালীন সময়ের জন্য প্রভাব তৈরি করে। যা এক বছর বা তারও কম সময় পার হবার পর প্রকাশিত হওয়ার সম্ভবনা থাকে। যাদের শরীরে অন্য কোন রোগ বিদ্যমান তাদের জন্য এটি এই সময়ের মধ্যে স্বাস্থ্য হুমকি তৈরি করতে পারে। এমনকি করোনাভাইরাস থেকে মুক্ত হবার পরেও তার প্রভাবে এক মাসের মধ্যে মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। সুতরাং করোনা হলে কয়েকদিন চিকিৎসা নিলেই ভালো হয়ে যাবো মনোবল শক্ত থাকলে, এই ভাবনা থেকে বেরিয়ে এসে বরং চেষ্টা করতে হবে কিভাবে সংক্রমণ থেকে নিজেকে দুরে রাখা যায়। আর তার জন্য স্বাস্থ্যবিধি মানা অপরিহার্য বিষয়।

জাতীয় পরামর্শক কমিটির সদস্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন,‘মানুষকে আমরা বিভ্রান্ত করেছি। একেক সময় একেক কথা বলায় মানুষ এখন কিছু বুঝতে পারছেনা। মানুষ যখন হাসপাতালে গেছে তখন তাকে ভর্তি করেনি। বলা হয়েছে টেস্ট করে আনতে। হাসপাতালে ভর্তির জন্য মানুষ এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে গেছে। ভর্তি হতে পারেনি। পরে আবার মানুষকে ডাকছি। বলা হচ্ছে, হাসপাতাল বেড ফাঁকা, ভর্তি হোন। টেস্ট করা নিয়ে মানুষকে কম দুর্ভোগ পোহাতে হয়নি। টেস্ট করাতে ফি নির্ধারণ করা হলো, দ্বিতীয় পরীক্ষা বন্ধ করা হলো। উপসর্গ ছাড়া পরীক্ষা করা হচ্ছেনা। এসব বিধিনিষেধের কারণে মানুষ এখন বিরক্ত হয়ে আর নমুনাই দিচ্ছে না। মাস্ক পরছে না। স্বাস্থ্যবিধি মানছেনা’।

বর্তমানে বিশ্বে করোনাভাইরাস সংক্রমণের তালিকায় ২১৫ টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৬তম, সক্রিয় সংক্রমণে অবস্থান ৮ম, নতুন সংক্রমণে অবস্থান ৫ম, নতুন মৃত্যুতে অবস্থান ৫ম, পার মিলিয়নে টেস্টে অবস্থান ১৫৪তম, জনসংখ্যা তুলনায় প্রতি মিলিয়নে বর্তমানে মৃত্যুর হার ২০.৮৮ শতাংশ (ওয়ার্ল্ডোমিটার)। গত ৬ দিনে সংক্রমণের হার ২১.১৪ শতাংশ, মৃত্যু (ঘোষিত) হার ১.৩৪ শতাংশ (করোনা.গভ.ইনফো)। এই পরিসংখ্যানের একটি নির্দেশকও এটা বলে না যে দেশে সংক্রমণ নুন্যতম নিয়ন্ত্রণে এসেছে। নিয়ন্ত্রণে আসার কোন ইঙ্গিতও প্রদান করছে না।

প্রত্যেকটি পরিসংখ্যান সরকার অস্বীকার করে বলছে, বিশেষজ্ঞদের ভবিষ্যৎবাণী ভুল প্রমাণ করে কৌশলে সফল প্রধাণমন্ত্রী। উপরের তথ্য-উপাত্ত্ব কী সেই ইঙ্গিত প্রমাণ করে নাকি বিশেষজ্ঞরা যা ভবিষ্যৎবাণী করেছেন সেটিই সঠিক সেটা আপনারা বিবেচনা করুন!!

‘প্রতিদিন চুরি যায় মূল্যবোধের সোনা, আমাদের স্বপ্ন, আমাদের চেতনা’

লেখক

সাবেক সভাপতি, বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রী

Sharing is caring!

Advisory Editor
Kazi Sanowar Ahmed Lavlu
Editor
Nurul Afsar Mazumder Swapan
Sub-Editor
Barnadet Adhikary 
Dhaka office
38 / D / 3, 1st Floor, dillu Road, Magbazar.
Chittagong Office
Flat: 4 D , 5th Floor, Tower Karnafuly, kazir deori.
Phone: 01713311758

পুরানো খবর

সেপ্টেম্বর 2020
শনি রবি সোম বুধ বৃহ. শু.
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
2627282930  

ছবি ঘর

    WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com