Tuesday, 22/9/2020 | : : UTC+6
Green News BD

মানুষ মানুষের জন্য নয়

মানুষ মানুষের জন্য নয়

চারু হকঃ সার্স, মার্স, অ্যানথ্রাক্স, হুপিংকাশ, যক্ষা, জলাতঙ্ক, কুষ্ঠ, এইডস, প্লেগ ইত্যাদির মতো মানুষ এখন যাকে কোভিড-১৯ নামে মোকাবেলা করছে, এবং হান্টা নামে আসন্ন আরেকটা বালাই যে নাকি এর চাইতেও বেশি মানুষের মৃত্যুর কারণ হতে পারে- এগুলোর সবই এসেছে বন্য ও গৃহপালিত প্রাণীদের কাছ থেকে। সৃষ্টির সেরা জীব ওরফে আশরাফুল মাখলুকাতের অহমিকায় মানুষ অন্যসব প্রাণীর স্বাভাবিক জীবনাচরণে অযাচিত হস্তক্ষেপ করার কারণে, জিভের লালসায় খাদ্য-তালিকায় বৈচিত্র বাড়াতে গিয়ে, প্রাণীদের আবাস বনজঙ্গল উজাড় করে উন্নয়নের সূচক বৃদ্ধির ক্রমবর্ধমান বাসনার ফলে পৃথিবী আজ গণবিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে, সব সুদ্ধ নিঃশেষ হয়ে যাবার অতি নিকটে। প্রতিদিন গড়ে ১৫০টি প্রজাতিকে হত্যা করার মাধ্যমে মাত্র ৪৫ বছরেই মানুষ প্রকৃতির ৬০% বন্যপ্রাণী বিলুপ্ত করে ফেলেছে। প্রতি সপ্তাহে ২ বিলিয়ন স্থলজ প্রাণী হত্যার শিকার হচ্ছে মানুষের হাতে। প্রতি ৮ ঘণ্টায় ১ বিলিয়ন সামুদ্রিক প্রাণী মারা পড়ছে মানুষের সোকল্ড শ্রেষ্ঠত্বের কারণে। এবং এটা উল্লেখ্য যে, একই হারে মানুষকে অন্যকেউ হত্যা করলে ১ মাসও লাগত না সমুদয় মানব প্রজাতিকে বিলীন করে দিতে।

অন্যদিকে, মানুষের মাংসখেকো প্রবণতার ক্রমবর্ধমান কারণে গরুছাগলের মতো নিরামিষভোজী প্রাণীগুলো আজ সমস্ত সাগর মহাসাগরের আসন্ন মৃত্যুতে প্রধান হুমকিতে পরিণত হয়েছে। বৈশ্বিক লাইভস্টক ইন্ড্রাস্ট্রির বর্জ্য সমুদ্রকে অস্বাভাবিক হারে এসিডিক করে ফেলছে, হাইপোক্সিক ডেড জোনে পরিণত করছে। এবং মানুষের জিহবা ও উন্নয়নের লালসা একই ধারায় অব্যাহত থাকলে আগামী ২০৪৮ সাল নাগাদ সমুদের সমুদয় জলরাশি তার অধিবাসীদের বসবাসের অযোগ্য হয়ে যাবে। পৃথিবীর চার-তৃতীয়াংশ জুড়ে থাকা জলরাশি রূপ ফুসফুস ও ধমনীরা অকেজো হয়ে যাবে।

একদিকে বিশ্বমোড়ল ট্রাম্পের বন্ধু বলসোনারো আমাজন বন পুড়িয়ে দিচ্ছে, মোদির মতো লোক তার সিন্ডিকেট স্বার্থে প্রকৃতির স্বতঃস্ফূর্ততায় বাধ সাধন করছে, অন্যদিকে সব পাপ পরিশোধন করা নদীনালা ও তাদের মা সাগর মহাসাগরগুলা মৃত্যুঝুঁকিতে পড়ে গেছে। অতএব, সম্ভাব্য সেই বাতাস ও পানিবিহীন পৃথিবীতে মানবপ্রজাতি কীভাবে কতদিন অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারবে তা সহজেই অনুমান করা যাচ্ছে। না, সনাতনদের বলিপ্রথা কিংবা মুসলমানের কোরবানিকে মাথায় রেখে এসমস্ত তথ্য তুলে ধরা হচ্ছে না। মানুষের ভোগের লক্ষে গড়ে ওঠা বৈশ্বিক মাংসশিল্প কেবল অবলা প্রাণীদেরই মারছে না, আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের স্বার্থ, আমাদের আরাধ্য উন্নয়নের আকাঙ্ক্ষা, এমনকি আমাদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনাকেও সম্ভব-না করে তুলছে।

বৈশ্বিক উষ্ণায়নে দায়ী গ্রিনহাউজ গ্যাস তৈরিতে সমস্ত পরিবহন যানের চাইতে ৫০% বেশি ভূমিকা রাখছে এই মাংসশিল্পের বর্জ্যপদার্থ। বনজঙ্গল উজার এবং সমুদ্রের সর্বনাশের পাশাপাশি এই শিল্প আমাদের মাটির শত সহস্র বছরের শ্রমে সঞ্চিত ভূগর্ভস্থ পানিকেও ধংস করছে। মাত্র ১ কেজি গরুর মাংসের জন্য ৫০ হাজার লিটার ভূগর্ভস্থ পানি দরকার হচ্ছে। লিটার মূল্যে এ পানি কিনতে হলে প্রতি কেজি মাংসের দাম কত দাঁড়াত বুঝাই যাচ্ছে।

এদিকে, সাড়ে ৭০০ কোটি মানুষের পৃথিবী ১১০০ কোটির খাদ্য উৎপন্ন করা সত্ত্বেও ১০০ কোটি মানুষকে অর্ধাহারে অনাহারে থাকতে হচ্ছে, ২ কোটি মানুষ অপুষ্টিতে মারা পড়ছে। দরিদ্র দেশগুলোকে অর্থের অভাবে খাদ্যশস্য তুলে দিতে হচ্ছে মাংসখেকো দেশগুলোর হাতে, যারা সেগুলো তাদের গবাদি প্রাণীকে খাওয়াচ্ছে। অথচ বৈশ্বিক মাংস শিল্পকে ১০% সংকুচিত করলেই পৃথিবীর সমস্ত মানুষ পুষ্টিকর খাদ্য পেতে পারে। মাংসের প্রতি মানুষ তার মানসিক নির্ভরতা বর্জন করলে পৃথিবী থেকে চিরতরে ক্ষুধা ও অপুষ্টি দূর হয়ে যেতে পারে। অভাবিত হারে ঘরে ঘরে পৌঁছে যাওয়া ক্যান্সার, ডায়াবেটিস ও হার্ট ডিজিজের মতো মরনঘাতি বালাই থেকে বাঁচা যেতে পারে। পৃথিবীর বিনাশে সবচেয়ে বড় দায় যাকে মনে করা হচ্ছে, সেই জলবায়ুর ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটতে পারে- বন উজার, উষ্ণায়ন, নদীনালা, সাগর মহাসাগর ও ভূগর্ভস্থ পানি সুরক্ষার মাধ্যমে। এমনকি দেশে দেশে অবিশ্যম্ভাবী হতে চলা অর্থনৈতিক দেউলিয়াত্বও ঘুচে যেতে পারে মানুষ তার এই মাংসখেকো প্রবনতাকে সংবরণ করলে।

এক্ষেত্রে উল্লেখ আবশ্যক যে, চিকিৎসাজীবী ও পুষ্টিবিজ্ঞানী অনেকে মানুষের দেহ গঠন ও শক্তি বৃদ্ধিতে মাংস খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকে। এটা বিতর্কিত তথ্য। এমন জাতি গোষ্ঠী অনেক আছে যারা শত সহস্র বছর ধরে মাংস না খেয়েও জ্ঞানবিজ্ঞানে অসামান্য অবদান রাখছে, এমনকি বডি বিল্ডিং এর মতো দেহ প্রদর্শনীতেও নিরামিষভোজীদের পাওয়া যাবে। আধুনিক গবেষণা, যার মধ্যে কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয় ও হার্ভাড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার কথাও বলা যেতে পারে যেখানে মানুষের ডায়েটে মাংসের কোনরকম প্রয়োজনীয়তার কথা অস্বীকার করা হয়েছে। বিপরীতে,

সামর্থ্য মোতাবেক সবচেয়ে বড় গরুছাগল বলি বা কোরবানী দেয়ার মতো আপাত অনুন্নত দেশগুলোও যদি তাদের সামর্থ্য বাড়িয়ে পশ্চিমাদের মতো নিয়মিত মাংস খাওয়া শুরু করে তাহলে বর্ধিত সেই চাহিদা মেটাতে অন্তত আরও একটি পৃথিবীর দরকার হবে। এই এক পৃথিবী, আমাদের বর্তমান পৃথিবীর পানি, মাটি ও খাদ্যশস্য সকল মানুষের প্রত্যাশামত মাংস খাওয়ার চাহিদা মেটানোর সক্ষমতা রাখে না। অথচ অন্যদিকে, মাংসের প্রতি জিভের লালসা মাত্র ১০% হ্রাস করলেই পৃথিবীতে কেউ ক্ষুধার্ত ও পুষ্টিহীন থাকবে না। এবং মানবতারহিত শতভাগ হিংসাত্মক যে পদ্ধতিতে এই মাংসশিল্প পরিচালিত হচ্ছে, মানুষের বিবেকবোধের বদৌলতে এটাকে কোনভাবে বন্ধ করা গেলে মানুষের অস্তিত্ব বিনাশে অনিবার্য হয়ে ওঠা সমস্যাগুলোর অধিকাংশই থাকবে না। সবচেয়ে বড়কথা, মানুষ যেভাবে যা খায়- সে আসলে তাই। সুতরাং প্রতিদিনের খাবার টেবিলে অবলা প্রাণীর প্রতি স্বার্থপর অমানবিকতা বজায় রেখে শান্তি ও সুস্থতার কথা বলা মানে জ্ঞানকে ভালোবেসেও বইপত্র গ্রন্থাগার পুড়িয়ে দেয়া।

Sharing is caring!

Advisory Editor
Kazi Sanowar Ahmed Lavlu
Editor
Nurul Afsar Mazumder Swapan
Sub-Editor
Barnadet Adhikary 
Dhaka office
38 / D / 3, 1st Floor, dillu Road, Magbazar.
Chittagong Office
Flat: 4 D , 5th Floor, Tower Karnafuly, kazir deori.
Phone: 01713311758

পুরানো খবর

সেপ্টেম্বর 2020
শনি রবি সোম বুধ বৃহ. শু.
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
2627282930  

ছবি ঘর

    WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com