Tuesday, 22/9/2020 | : : UTC+6
Green News BD

করোনা: মহানদের মহান বাণী….

করোনা: মহানদের মহান বাণী….

আবু নাসের অনীক‘ব্যক্তিগতভাবে আমারা যদি সৎ না হই কোনভাবেই দুর্নীতি রোধ করা সম্ভব নয়। দুর্নীতির কথা যদি বলেন, আমি বলবো দুর্নীতির দায় আমাদের সবার। আমরা যদি শুধু সরকারের দিকে আঙ্গুল তুলি সেটা হবে সবচেয়ে বড় বোকামী। আমরা সবাই এই দুর্নীতির অংশ’। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নতুন ডিজি সাহেব যোগদান করেই যে বাণী দিলেন, যারা তাকে নিয়ে অনেক আশাবাদী হয়েছিলেন, তাদের উদ্দেশ্যে বলি, ওনারা আগামীতে দুর্নীতি করবেন আর তার দায় আপনারও বহন করবেন।

ডিজি মহোদয়, দেশের একজন সাধারণ নাগরিক হিসাবে আপনাদের দুর্নীতির দায় আমি বা আমার মতো আমজনতার নেওয়ার কোন প্রশ্নই ওঠেনা। বরং আমরা এমন একটি শক্তিশালী কাঠামোর দাবি জানাতে চায় যে কাঠামোর মধ্যে অবস্থান করলে, আপনি ব্যক্তিগত পর্যায়ে সৎ বা অসৎ যাই হোন না কেন দুর্নীতি করার সুযোগ থাকবে না। কাঠামো যেমন ব্যক্তিকে অসৎ করে তোলে একই রকমভাবে কাঠামোর কারণেই ব্যক্তি সৎ হতে বাধ্য হয়। অর্থাৎ দুর্নীতি করার সুযোগ থাকে না। আমরা জানি কেউ অসৎ হিসাবে জন্মগ্রহণ করেনা। সমাজ-রাষ্ট্র কাঠামো কোনো মানুষ সৎ হবে না অসৎ হবে সেক্ষেত্রে অন্যতম প্রভাবক শক্তি হিসাবে ভূমিকা রাখে। আমরা সেই রাষ্ট্র কাঠামো চায় যে কাঠামোতে মানুষ অসৎ হয়ে বেড়ে ওঠার সুযোগই থাকবে না।

মহাশয়, সাম্প্রতিক সময়ে রিজেন্টের চেয়ারম্যান সাহেদ যে সকল দুর্নীতি করেছে সেটা কখনওই সম্ভব হতো না যদি না কিনা সরকারের পৃষ্টপোষকতা থাকতো। সরকার কোন বায়বীয় কাঠামো নয়। সরকার কী? ‘A group of people that governs a community or unit. It sets and administers public policy and exercises executive, political and sovereign power through customs, institutions, and laws within a state.’ এটাই যদি সরকার হয় তবে সরকারের সাথে যুক্ত ঐ সমস্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান যদি সহযোগিতা প্রদান না করে, একই সাথে সকল স্তরের কাঠামোতে যদি প্রাতিষ্ঠানিক দূর্বলতা না থাকে তবে দুর্নীতি করা সম্ভব হয় না।

একজন প্রতারক-দুর্নীতিবাজ বছরের পর বছর সরকারের বিভিন্ন উইংসকে ব্যবহার করে দুর্নীতি করে গেলো আর তার জন্য সরকারকে দায়ী করলে সেটা হবে সবথেকে বোকামী ?? প্রতারক সাহেদ যখন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসাবে গরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথী হয়ে বঙ্গভবন, গণভবনে অবাধে দেশের রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর কাছে পৌঁছে যায় সেটা কী সরকারের প্রাতিষ্ঠানিক দূর্বলতা নয়?

এ সমস্ত অনুষ্ঠানে যারা আমন্ত্রিত হয় তাদের কয়েক বছরের গোয়েন্দা রিপোর্ট, চৌদ্দ গুষ্টির ঠিকুজি সরকারের বিভিন্ন বাহিনীর কাছে থাকে। সেখানে ১০ বছরের সাজাপ্রাপ্ত একজন অপরাধী এসবকিছুকে টপকে যেতে পারে এর পরেও এর দায় সরকারকে দেওয়া যাবেনা!! সমাজে-রাষ্ট্রে বর্তমানে একটি বিষয় অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে সামনে আনা হচ্ছে দুর্নীতিতে শুধুমাত্র ব্যক্তির দায় কে। আড়ালে চলে যাচ্ছে সরকারের দায়, ব্যবস্থাপনার দায়। প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির ক্ষেত্রে ব্যক্তি ও ব্যবস্থাপনা কাঠামো দুটোকেই চ্যালেঞ্জ জানাতে হবে। দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে যেমন সংগঠিত হতে হবে একই সাথে সংগঠিত হতে হবে কাঠামো পারবর্তনের লক্ষ্যে।

সাহেদ গ্রেপ্তার হয়েছে, কিন্তু তাকে সহায়তাকারী একজনের নামও এ পর্যন্ত সামনে আসেনি এবং আসবেও না। মাননীয়, এই যে সহায়তাকারী কারো নাম সামনে আসছে না তার কারণ সরকার ঐ সকল ব্যক্তিবর্গ কে প্রটেক্ট করছে। আর স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয় না থাকলে কেউ কাউকে প্রটেক্ট করে না। এরপরেও সরকারের দিকে আঙ্গুল তোলা আপনার কাছে বোকামী! ওয়েল, আপনি চালাক হয়ে থাকেন, আমরা না হয় বোকাই থাকি!!

গত ২৩ জানুয়ারী ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (বার্লিন ভিত্তিক) কর্তৃক পরিচালিত ‘দুর্নীতি ধারনা সুচক ২০১৯’ প্রকাশ অনুষ্ঠানে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘দুর্নীতির ব্যাপকতা ও গভীরতার কারণে বাংলাদেশ দুর্নীতিগ্রস্ত বা বাংলাদেশের অধিবাসীরা সবাই দুর্নীতি করে এই ধরনের ভুল ব্যাখ্যা দেওয়া হয়। যদিও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও দারিদ্র দূরীকরণসহ সর্বোপরি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পথে কঠিনতম অন্তরায় দুর্নীতি, তবু দেশের আপামর জনগণ দুর্নীতিগ্রস্ত নয়। তারা দুর্নীতির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ও ভুক্তভোগী মাত্র। ক্ষমতাবানদের দুর্নীতি ও তা প্রতিরোধে ব্যর্থতার কারণে পুরো দেশ বা জনগণকে কোনভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত বলা যাবে না।’

মহাপরিচালক মহোদয়, যে চেয়ারে আসীন হয়েছেন তাতে আপনি ক্ষমতাবানদের কাতারে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। তাদের কাতারে অন্তর্ভুক্ত হয়ে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে পুস্পমাল্য অর্পন করেছেন। মাল্য অর্পন পরবর্তিতে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে যেয়ে, সবাইকে দুর্নীতির অংশ বানিয়ে ফেলেছেন। এবং এই বাণী প্রদান করে আপনি দেশের আপামর মানুষকে রীতিমতো অপমান করেছেন। তার এই বক্তব্যের অর্ন্তনিহীত অর্থ কী হতে পারে সেটা পূর্বের প্যারায় উল্লেখ করেছি। অর্থাৎ ক্ষমতাবানদের দুর্নীতি আড়াল করার ট্রায়াল হিসেবে জনগণ কে যুক্ত করেছেন।

আপনাদের কাছে পরিষ্কার হয়েছে কিনা জানিনা, তবে আমার কাছে পরিষ্কার সরকার কোন গ্রাউন্ডে বর্তমান মহাপরিচালক কে নিয়োগ দিয়েছেন! যাতে আগামীতে কোন দুর্নীতির ঘটনা ঘটলে সরকারকে আড়াল করে শুধুমাত্র ব্যক্তির ঘাড়ে তার দায় চাপিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি মুখ্য একটি ভূমিকা পালন করবেন। পূর্বের মহাপরিচালক কে পদত্যাগ করতে বাধ্য হতে হতো না যদি কিনা উনি রিজেন্টের দুর্নীতির ঘটনা প্রসঙ্গে নিজের সাথে সাথে মন্ত্রণালয়ের দায় আড়াল করতেন। সেটা না করে উল্টো মন্ত্রণালয়ের উপর দায় চাপিয়েছেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক নাসিমা সুলতানা টেস্ট করানোর রোগী খুঁজে পাচ্ছেন না। তার জন্য প্রতিদিন সংবাদ ব্রিফিং-এ টেস্ট করানোর আহ্বান জানিয়ে গলা শুকিয়ে ফেলছেন। কিন্তু যে সমস্ত কারণে টেস্ট কমে গেছে সে বিষয়ে কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করছেন না। অর্থাৎ টেস্টের ফি প্রত্যাহার করা, একসাথে চারটি উপসর্গ থাকার পূর্বশর্ত প্রত্যাহার করা, দ্বিতীয় টেস্ট করতে দেওয়া, নমুনা দিতে ভোগান্তি দুর করা, যথাসময়ে ফলাফল প্রদান করা, পরীক্ষাস্থলের পরিবেশ স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে সেটা নিশ্চিত করা, ফলাফলের মান নিশ্চিত করা। এসব বিষয়ে পদক্ষেপ না নিয়ে জনগণকে টেস্ট করতে আসার আহ্বান জানানো ‘কুমিরের কান্না’র সাথে তুলনা করা চলে।

জাতীয় পরামর্শক কমিটির সদস্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন,‘করোনা নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ কোন কৌশল নেয়নি। পরিকল্পনাহীন ও সমন্বয়হীনভাবে একটা কার্যক্রম চলছে। এভাবে এরকম একটি দুর্ধর্ষ ভাইরাসকে নিয়ন্ত্রণে আনতে পারবো বলে মনে হয় না’। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদন্ড অনুসারে বাংলাদেশের জনসংখ্যা অনুযায়ী প্রতিদিন ২৪-২৫ হাজার পরীক্ষা হওয়া প্রয়োজন। অথচ ৮ মার্চ এর পর থেকে এ পর্যন্ত এক দিনও ২০ এর ঘরে ছুঁতে পারেনি। আবার বলা হচ্ছে সংক্রমণ পরিস্থিতি স্থিতিশীল!!

বিশ্বের বেশিরভাগ দেশের রোগ নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি যদি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, অধিকাংশ দেশ আগে রোগ নিয়ন্ত্রণে এনেছে, তারপর জীবিকার বিষয়টি ভেবেছে। এখানে জীবন ও জীবিকা একসাথে ভাবতে যেয়ে না হচ্ছে রোগ নিয়ন্ত্রণ না হচ্ছে জীবিকা! জীবিকাকে প্রাধান্য দিতে যেয়ে প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম বলে অবশিষ্ট কিছু নেই। লকডাউন করছে একটা একটা ক্ষুদ্র এলাকা ধরে। যা কোন ফলাফল তৈরি করছে না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দ:-পূ: এশিয়ার সাবেক আঞ্চলিক উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. মোজাহেরুল হক বলেন,‘এখনো সরকার খন্ড খন্ড লকডাউন পদ্ধতির মাধ্যমে যেভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে, এটা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের সঠিক পন্থা নয়। দেশব্যাপী একসঙ্গে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এই খন্ড খন্ড লকডাউন কোন কাজে আসবেনা’। সরকারের অবশ্য এখন পর্যন্ত একটাও রেকর্ড নেই যে তারা জনস্বাস্থ্যবিদদের পরামর্শ অনুসারে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে!

বিশ্বে মোট সংক্রমণের তুলনায় বাংলাদেশের অবস্থান এক ধাপ এগিয়ে ১৬ তম, সক্রিয় রোগীর সংখ্যায় ৮ ম অবস্থান, নতুন মৃত্যুর সংখ্যায় উঠে এসেছে ৪ র্থ অবস্থানে আর পার মিলিয়ন টেস্টের সংখ্যায় আরো চার ধাপ নেমে এখন অবস্থান ১৫২ তম (ওয়ার্ল্ডোমিটার)। এই পরিসংখ্যান দেখলেই বোঝা যায় করোনা প্রতিরোধে আমাদের অবস্থান কতোটা এলোমেলো হয়ে আছে। জনগণের জীবন নিয়ে এভাবে জুয়া খেলার মুল্য সরকারকে আজ অথবা কাল চুকাতেই হবে।

‘সামনে মৃত্যুকবলিত দ্বার, থাক অরণ্য, থাক না পাহাড়, ব্যর্থ নোঙর, নদী হব পার, খুঁটি শিথিল। আমরা এসেছি মিছিলে, গর্জে ওঠে মিছিল।।’

লেখক

সাবেক সভাপতি, বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রী

 

 

Sharing is caring!

Advisory Editor
Kazi Sanowar Ahmed Lavlu
Editor
Nurul Afsar Mazumder Swapan
Sub-Editor
Barnadet Adhikary 
Dhaka office
38 / D / 3, 1st Floor, dillu Road, Magbazar.
Chittagong Office
Flat: 4 D , 5th Floor, Tower Karnafuly, kazir deori.
Phone: 01713311758

পুরানো খবর

সেপ্টেম্বর 2020
শনি রবি সোম বুধ বৃহ. শু.
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
2627282930  

ছবি ঘর

    WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com