Saturday, 15/8/2020 | : : UTC+6
Green News BD

করোনা: সত্যের অপলাপ….

করোনা: সত্যের অপলাপ….

আবু নাসের অনীক: ২/১ দিন ধরে আলোচনা চলছে বাংলাদেশ প্রথম দফার পিক অতিক্রম করেছে। গত কয়েকদিনের লেখায় যে বিষয়টির প্রতি ইঙ্গিত করেছিলাম ব্যাপারটি হুবহু ঠিক তাই হচ্ছে। গত লেখাগুলোতে বলেছিলাম, টেস্টের পরিমান কমিয়ে সংক্রমণের সংখ্যা কম দেখানো হবে, এবং একটা মেজার করে দেখানো হবে প্রতিদিন গড় শনাক্ত একটি কাছাকাছি নির্দিস্ট সংখ্যায় দেখানো যাতে একটি সমান্তরাল রেখা তৈরি হয়। পরের ধাপে টেস্ট আরো কমিয়ে এনে দেখানো হবে শনাক্তের সংখ্যা আরো কম হচ্ছে।

বাংলাদেশে পিক অতিক্রম করেছে এর যুক্তি হিসাবে বলা হচ্ছে, গত ২ জুলাই ৪ হাজার ১৯ জন শনাক্তের পর এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ শনাক্ত ৩ হাজার ৪৮৯ জন। এবং সেই সময় থেকে শনাক্তের গড় সংখ্যা কমতে কমতে এসে ৩ হাজার বা তার নিচে এসে দাঁড়িয়েছে। একটি পরিকল্পনা প্রণয়ন ও তার বাস্তবায়ন ভালোই দেখানো হয়েছে। এবং যাথারীতি এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশের উদাহরণ টানা হয়েছে।

পাঠক খেয়াল করুন, ২ জুলাই টেস্টের সংখ্যা ছিলো ১৮ হাজার ৩৬২, অর্থাৎ এই সংখ্যক টেস্টের বিপরিতে শনাক্ত হয়েছে ৪ হাজার ১৯, ঠিক তার পরের দিন টেস্ট করা হয় ১৪ হাজার ৬৫০ নমুনা, শনাক্ত হয় ৩ হাজার ১১৪। ৩ জুলাই থেকে ২৪ জুলাই পর্যন্ত এই ২২ দিনে গড় টেস্টের সংখ্যা ১৩ হাজার ১১৩। ২ জুলাই এর পর সর্বোচ্চ সংখ্যক টেস্ট হয়েছে ১৫ হাজারের ঘরে দুই দিন। পিক অতিক্রম করেছে কিনা সেটা বোঝার জন্য ২ জুলাই এর পর পরবর্তী নুন্যতম এক সপ্তাহ একই সংখ্যক অথবা বেশি, কোনভাবেই কম নয়, টেস্ট করার যদি ধারাবাহিকতা থাকতো, সেই ধারাবাহিকতা অনুসারে যদি শনাক্তের সংখ্যা নিম্নমুখী হত এবং একইসাথে যদি সংখ্যা সমন্তরালে অবস্থান করতো তবেই বোঝা যেত পিক অতিক্রম করেছে।

বাংলাদেশে টেস্ট মেকানিজমের মাধ্যমে পিক অতিক্রমের চিত্র তৈরি করছে, সেটা নিজের সাথে নিজের প্রতারণা করার নামান্তর মাত্র। বর্তমানে সংক্রমণের যে হার (২২-২৫ শতাংশ) গাণিতিকভাবে এটাই ইঙ্গিত করে যে, এখন যদি টেস্ট ২০ হাজার বা তার বেশি করা হয় তবে নিশ্চিতভাবেই শনাক্ত ২ জুলাই এর সংখ্যাকে অতিক্রম করবে। পিক অতিক্রম করছে কিনা সেটা যাচাইয়ের অন্যতম একটি অপরিহার্য শর্ত সর্বোচ্চ সংখ্যক টেস্ট।

দেশের বর্তমান করোনা পরিস্থিতির একটি অন্যতম আলোচনার বিষয় মৃত্যুর হার ও সংখ্যা কম। এটাকে করোনা প্রতিরোধের সাফল্য হিসাবে উল্লেখ করা হচ্ছে। এই ধারনা তৈরিতে সহায়ক ভূমিকা রাখছে সরকার কর্তৃক সরবরাহকৃত তথ্য। আসুন, দেখে নেওয়া যাক বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা Definition of death due to COVID-19 এ কী বলছে ! তারা বলছে,‘ A death due to COVID-19 is defined for surveillance purposes as a death resulting from a clinically compatible illness, in a probable or confirmed COVID-19 case, unless there is a clear alternative cause of death that cannot be related to COVID-19 diseases. There should be no period of complete recovery from COVID-19 between illness and death.’(Medical certification ICD mortality coding, and reporting mortality associated with COVID-19-Technical note-7 June 2020)

কিন্তু আমাদের এখানে মৃত্যুর সংখ্যা হিসাব করা হচ্ছে শুধুমাত্র টেস্টেড কেস কে। ২২ মার্চ থেকে ১৮ জুলাই পর্যন্ত উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ১ হাজার ৮৭৪। টেস্টেড কেসের মৃত্যু সংখ্যা ২ হাজার ৮৩৬। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ি তাহলে মোট মৃত্যুর সংখ্যা হয় ৪ হাজার ৭১০। এই সংখ্যা অনুসারে মৃত্যুর হার হয় ২.১৫ শতাংশ। অর্থাৎ মৃত্যুর হারেও বাংলাদেশের অবস্থান ক্রমেই সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। কোভিড-১৯ জনিত কোন মৃত্যু রেকর্ড হবে সে বিষয়ে দি ইউনিভার্সিটি অফ অক্সফোর্ড বলছে,‘A positive COVID-19 test result is not required for a death to be registered as COVID-19, In some circumstances, depending on national guidelines, medical practitioners can record COVID-19 death if they think the signs and symptoms point towards this as the understanding cause.’ কিন্তু বাংলাদেশে করোনা জনিত মৃত্যু রেকর্ডের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক এই সমস্ত গাইডলাইন অনুসরন করা হচ্ছে না। কারণ তাহলে সাফল্য প্রকাশে বিঘ্ন ঘটবে!!

সঠিকভাবে যদি তথ্য বিশ্লেষণ না করা হয় তবে কার্যত এই সংক্রমণকে প্রতিরোধ সম্ভব নয়। আর যদি সবকিছূ নিয়তির হাতে ছেড়ে দেওয়া হয় তবে নির্ভুল তথ্য বিশ্লেষণের কোন প্রয়োজনীয়তা নেই। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে সরকার সবকিছুই নিয়তির কাছে সমর্পণ করেছে। কারণ বর্তমানে করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধে সরকারের কোন পদক্ষেপই দৃশ্যমান নয়।

নৌ প্রতিমন্ত্রী জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন,‘যাত্রী সাধারণের কাছে বিনীত অনুরোধ অতি প্রয়োজন ছাড়া আমরা যেন এই যাত্রাটাকে পরিহার করি। কারণ বেঁচে থাকলে অনেক ঈদ উদযাপনের সুযোগ পাবো। কাজেই তাড়াহুড়া করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই যাত্রায় না যাওয়াটই আমাদের জন্য মঙ্গলজনক।’ কি হাস্যকর আহ্বান!!

আচ্ছা বলুন, ঢাকা থেকে গ্রামে যেয়ে ঈদ করা কি অতি প্রয়োজনের মধ্যে পড়ে? নিশ্চয় না। যারা ঈদ করতে বাড়ি যাচ্ছেন তারা কোন প্রয়োজনে নয়, আনন্দ করবেন এটা ভেবেই যাচ্ছেন। গত মাসের শেষ সপ্তাহ থেকেই দেশের জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, ঈদের আগে ও পরের কয়েকদিন সকল ধরনের গনপরিবহন বন্ধ রাখার জন্য। এমনকি সরকারের গঠিত জাতীয় কারিগরী পরমর্শক কমিটি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়কে অনুরোধ জানিয়েছে যাতে ঈদ করার জন্য নাগরিকেরা ঢাকা থেকে বের হতে না পারে সেই বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে। পরামর্শক কমিটির নির্দেশনা উপেক্ষা করে সকল গণপরিবহন চালু রাখা হয়েছে। গণপরিবহন চালু রাখবেন, আর ইনিয়ে-বিনিয়ে নাগরিক কে বলবেন, অতি প্রয়োজন ছাড়া যাবেন না। এর চেয়ে কান্ডজ্ঞানহীন কথা আর কী হতে পারে!!

সরকারের এই কান্ডজ্ঞানহীন আচারনের কারণে ইতিমধ্যে সংক্রমণ ও মৃত্যু বেড়ে এই জায়গায় পৌঁছেছে, টেস্টের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে, রোগী বাসায় মারা যাচ্ছে তারপরেও হাসপাতালে আসছে না, নকল টেস্ট রির্পোটের ছড়াছড়ি, আন্তর্জাতিকভাবে ভাবমুর্তির সংকট, লাগামহীন দুর্নীতি আর সর্বপরি জনগনেরও সবকিছু নিয়তির হাতে ছেড়ে দেওয়ার প্রবনতা। মহাশয় গণ, উল্লেখিত প্রতিটি ঘটনা তৈরি হয়েছে আপনাদের দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরন ও কর্মকান্ডের কারণে। এর দায় এড়ানোর কোন সুযোগ আপনাদের সামনে নাই। আজ না হোক কাল জনগন এর জবাব নিবেই।

কোভিড-১৯ কেন্দ্রিক দুর্নীতির কারণে ইতিমধ্যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব, একজন অতিরিক্ত সচিব কে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তরের মহাপরিচালক পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। নতুন মহাপরিচালক নিয়োগ করা হয়েছে। বলা হচ্ছে উনি অনেক সৎ মানুষ। অনেকেই আশাবাদ ব্যক্ত করছেন, এবার হয়তো কিছু পরিবর্তন ঘটবে!

আমি অত্যন্ত দ্বিধাহীনভাবে বলছি, একজন অসৎ লোকের স্থলে একজন সৎ মানুষ স্থলাভিষিক্ত হলেও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অব্যবস্থাপনার উল্লেখযোগ্য তেমন কোন পরিবর্তন ঘটবেনা। একইরকমভাবে সাহেদ, সাবরিনা, আরিফ বা মিঠুদের বিচার সম্ভব হলেও দুর্নীতির ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য কোন পরিবর্তন আসবে না। কারণ এ সবকিছু সংঘটিত হচ্ছে ব্যবস্থাপনার কাঠামোগত ত্রুটির কারণে। যতক্ষন পর্যন্ত এই ব্যবস্থাপনার কাঠামোতে পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে না ততক্ষন পর্যন্ত চলমান ঘটনা গুলো চলতেই থাকবে। একইসাথে এটা ভাবতে হবে, পঁচন হঠাৎ করে মধ্য স্তরে ঘটেনা। পঁচনটা শুরু হয় মাথায়। ধীরে ধীরে সেই পঁচন প্রসারিত হয়ে সারা দেহে ছড়িয়ে পড়ে। পঁচন থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য হাতের একটা অংশ কেটে বাদ দিলেও কিছুদিন পর তারপরের অংশে আবারও সংক্রমণ তৈরি হয়। এজন্য মাথায় পঁচন রোধ করতে হবে। একইসাথে হাতের পঁচন রোধ করারও ব্যবস্থা নিতে হবে।

কিন্তু আমাদের অধিকাংশই প্রতিবাদ করছে শুধুমাত্র ব্যক্তির দুর্নীতির বিরুদ্ধে। ব্যক্তির দুর্নীতিকে কেন্দ্র করে যতো মানুষ সোচ্চার তার এক শতাংশ মানুষও ব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলেনা। শুধুমাত্র ব্যক্তির বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলা মানে বর্তমানের এই মানবিকতা বিবর্জিত, লুটপাটবান্ধব ব্যবস্থাপনার কাঠামোকে টিকিয়ে রাখতে সহায়তা করে। কারণ সামনে চলে আসা দুই-একজন প্রতারক-দুর্নীতিবাজের যদি চাপে পড়ে বিচার করতেই হয় আর কাঠামো যদি অক্ষত থাকে তবে তাতে সরকারের কিছু যায় আসে না। কারণ যতোক্ষন এই কাঠামো টিকে থাকবে ততোক্ষন পর্যন্ত সমাজে-রাষ্ট্রে সাহেদদের যোগান বন্ধ হবে না।

লেখক

সাবেক সভাপতি, বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রী

Sharing is caring!

Advisory Editor
Kazi Sanowar Ahmed Lavlu
Editor
Nurul Afsar Mazumder Swapan
Sub-Editor
Barnadet Adhikary 
Dhaka office
38 / D / 3, 1st Floor, dillu Road, Magbazar.
Chittagong Office
Flat: 4 D , 5th Floor, Tower Karnafuly, kazir deori.
Phone: 01713311758

পুরানো খবর

আগস্ট 2020
শনি রবি সোম বুধ বৃহ. শু.
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
293031  

ছবি ঘর

    WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com