Saturday, 15/8/2020 | : : UTC+6
Green News BD

করোনা: শত্রুর সাথে বসবাসের চার মাস

করোনা: শত্রুর সাথে বসবাসের চার মাস

আবু নাসের অনীক: করোনা সংক্রমণের চার মাস পার করেছে বাংলাদেশ।  এই সময়ে এখনও পর্যন্ত আমাদের সামনে কোনআশার আলো সঞ্চারিত হয়নি। বলা চলে আমরা ক্রমান্বয়ে খারাপ থেকে অধিকতর খারাপের দিকে যাচ্ছি।  মোট রোগীর ৫৯শতাংশের বেশি শনাক্ত হয়েছে চতুর্থ মাসে।  জুন থেকে জুলাই পর্যন্ত এই এক মাসে শনাক্ত হয়েছে লাখের বেশি মানুষ।

গত সপ্তাহে গড় টেস্ট হয়েছে ১৪ হাজার ৫৮৩, এক সপ্তাহে গড়ে শনাক্ত হয়েছে হাজার ১৭৪, গড় মৃত্যু ৪৪, এই সপ্তাহে গড়শনাক্তের হার ২২ শতাংশ (ওয়ার্ল্ডোমিটার) জনস্বাস্থ্যবিদ আইডিসিআর এর উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন,‘কয়েকদিনধরে পরীক্ষা কম হচ্ছে বলে রোগীর সংখ্যা কম হচ্ছে। কিন্তু শনাক্তের হার কমেনি।  শিগগির সংক্রমণ কমবে তথ্যউপাত্ত এমনটাবলছে না। বরং বাস্তবতার নিরিখে বলা যায়, এটি আরো বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে

গত কয়েকদিন হাসপাতালে শয্যা খালি থাকা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। বস্তুত হাসপাতালের শয্যা খালি থাকার কথা নয়, তারপরেও খালি আছে। একটু বিশ্লেষণ করলে দেখবো প্রধানত দুটি কারণে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। প্রথমত, প্রথম থেকেইঅদ্যাবধি সময় পর্যন্ত হাসপাতালের চরম অব্যবস্থাপনার কারণে রোগী হাসপাতালে ভর্তি হতে স্বস্তিবোধ করছেন না। রোগীরমানসিক অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, তিনি মনে করছেন হাসপাতালে ভর্তি হলে তার অবস্থা আরো বেশি খারাপ হবে। তিনিহয়তো আর জীবিত অবস্থায় ফিরে আসবেন না।  যারাও বা ভর্তি হতে চাচ্ছেন তারা সেই অব্যবস্থাপনার কারণেই ভর্তি হতে ব্যর্থহচ্ছেন।

দ্বিতীয়তো, প্রথম থেকেই রোগীকে বাসায় থেকে চিকিৎসা নেওয়ার জন্য উৎসাহিত করা হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর অন্য কিছুতেসফল হোক আর না হোক এই বিয়য়টিতে সফলতার মাত্রা ১০০ এর মধ্যে ১১০ মার্ক দেওয়া যায় তাদের। এতোটাই সফল যে, রোগী বাসায় থেকে মারা যাচ্ছে কিন্তু চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে আসছে না!! একদিকে হাসপাতালের সার্বিক অবস্থা সম্পর্কেনেতিবাচক ধারনা অন্যদিকে বাসায় থেকে চিকিৎসা নেওয়ার বিষটি উপস্থাপিত হয়েছে খন্ডিতভাবে। যার কারণে রোগী বা রোগীরঅভিভাবক বুঝতে ব্যর্থ হচ্ছেন কখন রোগীকে হাসপাতালে স্থানান্তর করতে হবে। যাও বা যাচ্ছে, সেটা শেষ পর্যায়ে। দেখা যাচ্ছেহাসপাতালে ভর্তির ১২২৪ ঘন্টার মধ্যে অধিকাংশ রোগী মৃত্যুবরণ করছে (যারা হাসপাতালে মারা যাচ্ছে) তোতা পাখির মতশুধু বলে গেছে,‘ করোনা হলে বাসায় থেকে চিকিৎসা নিন, বাসায় চিকিৎসা নিয়েই রোগী ভালো হয়ে যায়

এই দ্বিবিধ কারণেই কোভিড১৯ ডেডিকেটেড হাসপাতালের মোট শয্যার ৭১.৪৪ শতাংশ ফাঁকা থাকছে। মোট করোনা রোগীর শতাংশ বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসা গ্রহণ করছে ( জুলাই প্রথমআলো)  জনস্বাস্থ্যবিদ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পাবলিক হেলথএডভাইজারি কমিটির সদস্য আবু জামিল ফয়সাল বলেন,‘শুরু থেকেই ট্রায়াজের মাধ্যমে সব হাসপাতালে কোভিড ননকোভিডদুই ধরনের রোগী সেবা দিলে পরিস্থিতি এমন হত না। সেবা গ্রহীতা সেবাদাতা দুই পক্ষের মধ্যেই আতঙ্ক কাজ করেছে।  খুব শিগগির এই সংকট দুর হবেনা।  এই অবস্থা কাটিয়ে উঠতে সরকারকেই উদ্যোগী হতে হবে গত মাসে যে বিষয়গুলোরসমাধানের কথা ছিলো, বরং দিন যতো গেছে ততোই সমস্যা আরো প্রকট হয়েছে।

বাংলাদেশে কোভিড১৯ টেস্টে যে ভুয়া সনদ দেয় সেটি এখন আন্তর্জাতিকভাবে আলোচিত বিষয়।  ইতালী, জাপান, দঃকোরিয়া, চীন ইতিমধ্যে বাংলাদেশের ফ্লাইট স্থগিত ঘোষণা করেছে বিভিন্ন মেয়াদে।  কারণ বিশেষ ফ্লাইটে সমস্ত দেশে যে বাংলাদেশীনাগরিক করোনা টেস্টের নেগেটিভ রিপোর্ট নিয়ে গেছেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নাগরিকের তাদের দেশের এয়ারপোর্টপরীক্ষায় পজেটিভ এসেছে।

সর্বশেষ গতকাল ইতালীতে কাতার এয়ারওয়েজের একটি ফ্লাইটে যাওয়া বাংলদেশী নাগরিকদেরকে রোমের এয়ারপোর্টেই নামতেদেয়নি।  এমনকি বহনকারী প্লেনটিকে ১৬ দিনের জন্য গাউন্ডেড রাখার নির্দেশ দিয়েছে।  এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইতালীসংবাদপত্ররোমা টুডেতাদের খবরে প্রকাশ করে, তারা বিমান বন্দরে একটি ভাইরাল বোমা নিক্রিয় করেছে।  প্লেনে অবস্থানকারীএসব যাত্রীকেভাইরাল বোমাহিসাবে আখ্যা দিয়েছে সংবাদপত্রটি।

আলোচ্য বিষয় হচ্ছে, বাংলাদেশের সকল যাত্রী যাদের রিপোর্ট নেগেটিভ সার্টিফিকেট নিয়ে গেছে সবারটাই কি ভুয়া নাকিপরীক্ষার ক্ষেত্রে কোন ত্রুটির জন্য নেগেটিভ এসেছে এটা খতিয়ে দেখার দাবি রাখে। কারণ, সরকারীভাবে যে সমস্ত প্রতিষ্ঠাননমুনা পরীক্ষা করছে ইতিপূর্বে তাদের ফলাফলে সমস্যা পাওয়া গেছে। সুতরাং সবাই ভুয়া রির্পোট নিয়ে গেছে এটা ধরে নিয়েএগোলে সমস্যার মূলে পৌঁছানো যাবে না। তবে ভুয়া সনদ হোক আর পরীক্ষার রিপোর্টে ভুল হোক দুটার দায়ই সরকারের। এইদায় এড়ানোর কোন সুযোগ নেই।

পাঠক, এর আগে একটি লেখায় উল্লেখ করেছিলাম ভুয়া সার্টিফিকেট দেওয়া বা তৈরি করার মতো এখানে যে দুর্নীতি ঘটছেসরকারের কোভিড১৯ বিষয়ক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনাগত দূর্বলতার কারণেই এটি ঘটার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এক কথায় বলা চলেএসবই ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটির বাই প্রোডাক্ট। করোনা সংক্রমণের মাস পর আজকের বাস্তবতা এই দুর্নীতি প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়েপৌঁছে গেছে। অথচ সেই প্রথম থেকেই স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার দূর্বলতার দিক এবং কিভাবে কাটিয়ে  ওঠা সম্ভব সে বিষয়ে বিশেষজ্ঞ গণএকের পর এক পরামর্শ দিয়েছেন আর সরকার প্রত্যেকটি পরামর্শ ইগনোর করেছে।

সামাজিক যোগাযোগ, গণমাধ্যম সব জায়গাতে এখন একটিই আলোচনা জিকেজি আর রিজেন্ট হাসপাতালের করোনা টেস্টবিষয়ক দুর্নীতি। রিজেন্ট এর চেয়ারম্যান শাহেদ এর সাথে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রী, সরকারীবিরোধী দলের নেতা, প্রশাসনিককর্মকর্তা থেকে শুরু করে গণমাধ্যমের নেতা সবার সাথেই সেলফির ছড়াছড়ি!! ছবিগুলো প্রমাণ করে সরকারের উঁচু স্তরে তারঅবাধ যাতায়াত ছিলো। এবং এই অবাধ যাতায়াতই তাকে এই ধরনের দুর্নীতির সাথে যুক্ত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছে।সবাই দাবি তুলছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী, অধিদপ্তরের ডিজি এদেরকে সরিয়ে দেবার জন্য। দাবি তুলেছেন সরকারের যারা শাহেদকেসহযোগিতা করেছে তাদের বিচারের আওতায় আনার জন্য। যারা এই দাবি করছেন তাদের সাথে একমত পোষন করেই বলছি, অপরাধীর শুধুমাত্র শাস্তি দাবী করলেই বা শাস্তি নিশ্চিত হলেই সমাজ থেকে ধরনের অপরাধের বিলোপ ঘটেনা বা কমেওআসেনা। আমাদেরকে চিহ্নিত করতে হবে কেন অপরাধ বা দুর্নীতি ঘটছে।

সরকার কোন বায়বীয় জিনিষ নয়। এর একটি বস্তুগত রুপ আছে। সেই বস্তুগত বিষয়টি বিশ্লেষণ করলেই আমরা দেখবোসরকারের গঠন, পরিচালনা পদ্ধতি, সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রতিটি স্তরেই প্রাতিষ্ঠানিকভাবে যে ব্যবস্থাপনা রয়েছে তা দুর্নীতিঅপরাধকেপ্রাতিষ্ঠানিকীকরণের জন্য সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। বিদ্যমান ব্যবস্থাপনার আওতায় সরকারে যেই থাকুক না কেন তাদেরপ্রশ্রয়ে দুর্নীতি চলতেই থাকবে। আমাদেরকে আওয়াজ তুলতে হবে বিদ্যমান ব্যবস্থাপনা পরিবর্তনের, সংগঠিত হতে হবেব্যবস্থাপনার আমুল পরিবর্তনের লক্ষ্যে। নইলে জিকেজি বা রিজেন্ট কে যদি আজ আইনের আওতায় এনে বিচার করা সম্ভবওহয় তার দুদিন পরেই আরেকজন অন্য এক শাহেদ, মিঠুরা তৈরি হবে। একই রকমভাবে অন্য একজন স্বাস্থ্যমন্ত্রী বা নতুন কোনডিজি আনলেও দুদিন পর সেও একই কাজ করবে যা তার পূর্বসুরিরা করে গেছে! এটা ইতিমধ্যে বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রমাণিতঘটনা।

যারা প্রতিবাদ করছেন, বিচার দাবি করছেন অধিকাংশের প্রতিবাদের সকল কেন্দ্রবিন্দু ব্যক্তি। শুধুমাত্র ব্যক্তির বিচার দাবি করলেআপনার এই দাবি দুর্নীতি সৃষ্টির সহায়ক এই ব্যবস্থাপনাকে টিকিয়ে রাখতে উল্টো সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। এভাবে শুধুমাত্রব্যক্তির অপরাধ নিয়ে মাতামাতি করা এই ব্যবস্থাপনারই একটি কৌশল, যাতে বিদ্যমান ব্যবস্থাপনার দিকে কেউ আঙুল না তুলে।আর আমরা প্রতিবার সেই ফাঁদেই পা দিয়ে বসে থাকি। শাহেদ এর মত হাজারটা শাহেদ আমাদের চারপাশ দিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, একজন ব্যক্তি শাহেদ এর অপরাধ / দুর্নীতি ক্ষমতাসীনদের পাস্পরিক দ্বন্দের কারণে সামনে চলে এসেছে! যারা তার সাথেসেলফি তুলেছে তারা প্রত্যেকেই এখন তার শুধু বিচারই দাবি করছেনা, রীতিমত তার এহেন কর্মকান্ডের বিষয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেপত্রিকায় কলাম লিখছে!!

সংসদে বাজেটের সমাপনি অধিবেশনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেন,‘সিঙ্গাপুরের একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান থেকে বাংলাদেশসম্পর্কে যে কথাটি বলা হয়েছিল, সেটায় দেখা গেছে যে মে মাসের পর আস্তে আস্তে এটা বাড়বে, জুনজুলাই মাস পর্যন্ত বাড়তেথাকবে। তারপর এক সময় এটা হয়তো কমতে থাকবে মাননীয় আপনার এই বক্তব্য শুনে কিংকর্তব্যবিমুড়! আপনি সিঙ্গাপুরেরযে গবেষণা প্রতিষ্ঠানটির রেফারেন্স ব্যবহার করলেন, তার প্রেডিকসন পুরোটাই ভুল ছিলো। যেটা ইতিমধ্যে প্রমাণিত। সরকারেরগঠিত প্রত্যেক কমিটি, তার বাইরের বিভিন্ন অভিজ্ঞ জনস্বাস্থ্যবিদ প্রত্যেকেই অভিমত ব্যক্ত করেছেন, সরকার আত্মঘাতীসিদ্ধান্তগুলো গ্রহণ না করলে সংক্রমণের বিস্তার এতোটা হওয়ার সুযোগ ছিলো না। এটাকে জুনের মধ্যেই নিয়ন্ত্রণ করা যেতো।করোনা সংক্রমণ এমনি এমনি কমার কোন সুযোগ নেই। যদি কোন কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হয় তবে সামনে এর সীমাহীনমূল্য দিতে হবে আমাদের।

করোনা সংক্রমণের এভাবেই আমরা চার মাস পার করলাম! এই মুহুর্তে জনগণের ঐক্যবদ্ধতার বিকল্প কিছু নেই। আপনার বেঁচেথাকার অধিকার আপনাকে আদায় করে নিতে হবে। আর সেই আদায়ের লড়াইয়ে ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের বিকল্প আর কিছু হতে পারেনা।

তোমাদের চোখরাঙানিকে আজ বলো কে ডরায়? বহু তো অগ্নি বর্ষণ করো সদলবলে, আমরা জ্বালছি আগুন নেভাওঅশ্রুজলে। স্পর্ধা, তাইতো ভেঙে দিলে শেষরক্তের বাঁধ, রোখো বন্যাকে, চরমপত্রে ঘোষণা: জেহাদ।।

লেখক

সাবেক সভাপতি, বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রী

Sharing is caring!

Advisory Editor
Kazi Sanowar Ahmed Lavlu
Editor
Nurul Afsar Mazumder Swapan
Sub-Editor
Barnadet Adhikary 
Dhaka office
38 / D / 3, 1st Floor, dillu Road, Magbazar.
Chittagong Office
Flat: 4 D , 5th Floor, Tower Karnafuly, kazir deori.
Phone: 01713311758

পুরানো খবর

আগস্ট 2020
শনি রবি সোম বুধ বৃহ. শু.
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
293031  

ছবি ঘর

    WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com