Saturday, 15/8/2020 | : : UTC+6
Green News BD

করোনা: রাত পোহাবার কত দেরি পাঞ্জেরি

করোনা: রাত পোহাবার কত দেরি পাঞ্জেরি

আবু নাসের অনীক: ‘রাত পোহাবার কত দেরি পাঞ্জেরি? এখনো তোমার আসমান ভরা মেঘে? সেতারা, হেলাল এখনো ওঠেনি জেগে? তুমি মাস্তলে, আমি দাঁড় টানি ভুলে; অসীম কুয়াশা জাগে শূন্যতা ঘেরি। রাত পোহাবার কত দেরি পাঞ্জেরি?’ আমরা পাল হারা নৌকার মতো ভেসে চলেছি। আদৌও তীরে পৌঁছাবো নাকি মাঝ পথেই ডুবে যাবো সবটুকুই তমিস্রায় ঢাকা। আমাদের জীবন আজ সংশয়াপূর্ণ।

গত ৯ জুন থেকে তিন সপ্তাহ লকডাউন থাকার পর ১ জুলাই পূর্ব রাজাবাজারে লকডাউন শেষ হয়েছে। আমাদের অর্জন কি? পূর্ব রাজাবাজারকে রেড জোন ঘোষণা করে ঐ অঞ্চলকে নুন্যতম ইয়েলো জোনে রুপান্তরের লক্ষ্যে লকডাউন করলেও ৩ সপ্তাহ পর যে রেডজোন ছিলো সেই রেড জোনই থেকে গেছে। রেড জোন ঘোষণা করে লকডাউন করার পরীক্ষামুলক প্রথম পরিকল্পনা সফল হয়েছে বলে মনে করা যাচ্ছেনা।

এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে লকডাউন করে সফলতা অর্জন করা যাবে না সেটা আগেই বলা হয়েছিলো। পূর্ব রাজাবাজারে লকডাউনের শেষ দিনের নমুনা পরীক্ষায় ১৮ জনের মধ্যে ১১ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। শনাক্তের হার ৬১ শতাংশ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সাবেক পরামর্শক মুজাহেরুল হক বলেন,‘পূর্ব রাজাবাজার এলাকার সর্বশেষ পরীক্ষার তথ্যে দেখা যায় সংক্রমণ কমেনি। শনাক্তের হার অস্বাভাবিক বেশি। পরিসংখ্যান থেকে বলা যায় এলাকায় লকডাউন সফল হয়নি’। অবশ্য সরকারে তাতে কিছু যায় আসে না, কারণ তাদের কাছে সকল পরিসংখ্যান মূল্যহীন।

আইইডিসিআর এর পক্ষ থেকে এখানে ২৮ দিনের লকডাউনের পরিকল্পনা থাকলেও তাদের সাথে কোন ধরনের পূর্ব আলোচনা ছাড়াই ২১ দিনের মাথায় সিটি কর্পোরেশন লকডাউন তুলে নেয়। অথচ সংক্রামক রোগ (প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল) আইন ২০১৮- এর ১১(১) ও (২) ধারা অনুসারে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণের এখতিয়ার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হলেও এ বিষয়ে প্রধান দায়িত্ব পালন করছে সংস্থাপন ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। আইনানুসারে স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত নির্দেশনাক্রমে অন্যান্য সহযোগী মন্ত্রণালয় ও বিভাগ চাহিদা অনুসারে সহযোগিতা প্রদান করবে। এখানে ঘটছে ঠিক তার বিপরিত।

সরকার বলেছিলো, পূর্ব রাজাবাজার থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে তারা পরবর্তী সিদ্ধান্ত নিবে। কিন্তু সেখান থেকে শিক্ষা গ্রহণ না করেই একই পদ্ধতিতে ওয়ারী এলাকার কিছু অংশে লকডাউন শুরু করেছে। বোঝা যাচ্ছে এখানকার ফলাফলও ইতিবাচক কিছু বয়ে আনবে না। প্রকৃতঅর্থে ইতিবাচক ফলাফলের নিমিত্তে বিজ্ঞানভিত্তিক কোন কারণ নেই। সরকার গঠিত জাতীয় বিশেষজ্ঞ কমিটির সদস্য সচিব ড. ফ্লোরা বলেন,‘আমার পর্যবেক্ষণ অনুসারে, মানুষের জীবন-জীবিকা টিকিয়ে রেখে লকডাউন কার্যকর করা বাস্তব সম্মত হচ্ছেনা। আবার এলাকাভিত্তিক লকডাউন খুব একটা কাজে আসেনা’। অথচ সরকারের সিদ্ধান্ত, প্রথম অগ্রাধিকার অর্থনৈতিক কর্মকান্ড, সেটিকে টিকিয়ে রেখে অন্যকিছু যদি করা সম্ভব হয়!!

জনগণকে রক্ষা করার জন্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ গ্রহণ করা সরকারের জন্য আশু কর্তব্য মনে করি। বিএমএ- এর সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডাঃ রশিদ-ই মাহবুব বলেন,‘এখন এই খন্ড খন্ড লকডাউন দিয়ে আত্মতুষ্টি খোঁজার চেষ্টা চলছে। যে এলাকায় লকডাউন হচ্ছে সেখানকার চারপাশ তো খোলা থাকছে। ২৮ দিন নিরাপদ থেকে কোন লোক যদি পরের দিন বাইরে যায়, সেখান থেকে তো তার সংক্রমণের ঝুঁকি থেকেই গেল। তাহলে ঐ ২৮ দিনের স্থায়ী কোন ফল পাওয়া গেলোনা’। ভ্রান্ত পথ থেকে সরকারকে সরিয়ে আনার ক্ষেত্রে চাপ প্রয়োগের বিকল্প কিছু দেখছিনা।

দেশে বর্তমানে করোনা সংক্রমণের যে উর্দ্ধগতি বিরাজ করছে তা শুধুমাত্র সরকারের সীমাহীন নির্লিপ্ততার কারণেই ঘটছে। সারাদেশে নুন্যতম কোন মেজার ছাড়াই অপ্রতিরোধ্য গতিতে সংক্রমণের বিস্তার ঘটছে। গত ২৭ মে কারিগরি বিশেষজ্ঞ কমিটি টেস্টের সেই সময়ে টার্গেট নির্ধারণ করে ২৫-৩০ হাজার। এবং তারা সেই সময়ে তথ্য বিশ্লেষন করে বলেছে, এখনই তাদের দেওয়া টার্গেট পূরণ করা সম্ভব। ঐ টার্গেট নির্ধারণের ১ মাস পর দেশে গত ১০ দিনে গড়ে টেস্ট হয়েছে ১৬ হাজার ৭৬০। এই ১০ দিনে গড়ে শনাক্ত হয়েছে ৩ হাজার ৫৮১। ১০ দিনে গড়ে সংক্রমণের হার ২২ শতাংশ। ৮ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছে ১ লাখ ৬৫ হাজার ৬১৮। মৃত্যুর সংখ্যা ২ হাজার ৯৬ জন (ওয়ার্ল্ডোমিটার)। মৃত্যুর এই সংখ্যা নিয়ে সরকার প্রায়শই বলছে অন্য দেশের তুলনায় এই সংখ্যা অনেক কম। আসলে কেউ যদি জেগে চোখ বন্ধ করে থাকে তবে তাকে জাগানো প্রায় অসম্ভব।

করোনাকালে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন করোনায় আক্রান্ত ও উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া মোট ৩ হাজার ১৩৯ জনের মৃতদেহের দাফন ও সৎকার করেছে ( কোয়ান্টাম ৯৫২ + মারকাজুল ৯০৬ + আল রসীদ ২৫৬ + রহমতে আলম ২১৩ + মানাহিল ২৭৫ + ই:আ: ৪৪৬ + কাউন্সিলর খোরসেদ ৯১= ৩১৩৯ – প্রথমআলো ৪ জুলাই ২০২০)। অর্থাৎ উপসর্গ নিয়ে মৃতের সংখ্যা এ হিসাবে ১০৮৭ জন।

যেখানে টেস্টের ব্যাপক অপ্রতুলতা রয়েছে সেই প্রেক্ষিতে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি বলছে,‘Confirmed death may not be an accurate count of the true number of death from COVID-19’. সেটা বিবেচনা করলে করোনায় এ পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা দাঁড়ায় ৩ হাজারের বেশি, যা তথ্য ইতিমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে! সেই অনুসারে মৃত্যুর হার হয় প্রায় ২ শতাংশ।

মৃত্যুর হার বোঝার জন্য অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি আরো বলছে,‘It can be insight full to know not just how many have died compared to how many people actually live in that country.’ উদাহরন স্বরুপ বলা যায় যদি আইসল্যান্ডে ৩ লাখ ৪০ হাজার জনসংখ্যায় ১ হাজার লোক মারা যায়, তবে যুক্তরাষ্ট্রের ৩৩১ মিলিয়ন জনসংখ্যার তুলনায় মারা যাওয়ার একই সংখ্যার চেয়ে অনেক বেশি প্রভাব ফেলবে। পার মিলিয়নে বাংলাদেশে বর্তমানে মৃত্যুর হার ১২.৪৬, ভারত ১৪.২৭, পাকিস্তান ২১.৫৬, নেপাল ১.১৭, মিয়ানমার ০.১১, থাইল্যান্ড ০.৮৩. চায়না ৩.৩২, ভিয়েতনাম ০.০, ভুটান ০.০(অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি)।

উল্লেখিত তথ্য থেকে এটা স্পষ্টই বোঝা যায় বাংলাদেশে মৃত্যুর হার ও সংখ্যা নিয়ে যে স্বস্তি প্রকাশ করা হয় প্রকৃতঅর্থে এই স্বস্তি প্রকাশের কোন কারণ নেই। মোট মৃত্যুর সংখ্যার দিক থেকে বিশ্বের ১৮৮ দেশের মধ্যে বর্তমানে বাংলাদেশের অবস্থান ২৭ তম। একদিন আগে ছিলো ২৮ তম (জনহপকিন্স ইউনিভার্সিটি)। ক্রমান্বয়ে সামনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। জনস্বাস্থ্যবিদ মুসতাক হোসেন বলেন,‘আরো কিছুদিন পর্যবেক্ষণ করে বোঝা যাবে মুত্যু জাম্প করবে কিনা। তবে চলাচল সীমিত না করলে পবিত্র ঈদুল আজহার পর সংক্রমণ ও মৃত্যুতে বড় ধরনের জাম্প দেখা যাওয়ার আশঙ্কা আছে’।

করোনা নিয়ে দেশে এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, এতে সংক্রমণের ও মৃত্যুর বাস্তব অবস্থা বোঝা যাচ্ছে না। সরকার তথ্য প্রদানে প্রথম থেকেই রক্ষনশীল অবস্থান গ্রহণ করে আছে। দেশে বর্তমানে করোনা ইনফেকটিভ রিপ্রোডাকটিভ রেট ১.০১ (সরকারি তথ্যমতে) যেটা প্রেকটিক্যালি আরো বেশি। ঢাবি-র স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইন্সটিটিউটের সহযোগি অধ্যাপক শাফিউন শিমুল বলেন,‘সংক্রমণের হার ১ বা ১ এর বেশি থাকা বিপজ্জনক। নিয়ন্ত্রণের কার্যকর উদ্যোগ না নিলে এই ধারা চলতেই থাকবে। ঈদের পর সংক্রমণ হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। ঈদের সময় কঠোর ব্যবস্থা না নিলে আক্রান্ত পাঁচ লাখ ছাড়িয়ে যেতে পারে’।

এতো পূর্বে থেকে জনস্বাস্থ্যবিদ ও বিশেষজ্ঞ গণ এ বিষয়ে সতর্কতামূলক পরামর্শ প্রদান করলেও সরকার তার পথেই হাঁটছে। পূর্ববর্তী তার সকল সিদ্ধান্ত ইতিমধ্যে প্রমাণিত হয়েছে সংক্রমণ প্রতিরোধের পরিবর্তে বিস্তার ঘটিয়েছে। সরকারের গঠিত পাবলিক হেলথ এডভাইজারি কমিটি বলছে,‘মানুষের চলাচল সীমিত করতে হবে। শহর থেকে গ্রামের বাড়িতে যাওয়া বন্ধ করার জন্য ঈদের আগের ও পরের ৩ দিন চলাচল কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে’। মানুষকে সংক্রমণ আর মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করতে হলে এই নির্দেশনা না মানার বিকল্প কিছু নেই।

দেশের এমন পরিস্থিতিতে যেখানে দরিদ্র সংখ্যা নতুনভাবে ২০ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে মোট ৪৩ শতাংশ, সেই মুহুর্তে সরকার রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন পাট কল বন্ধ করে ২৫ হাজার মানুষকে বেকার করে কয়েক লক্ষ মানুষের ভবিষ্যৎ কে অনিশ্চিত করে তুলেছে। অন্যদিকে মানুষের জীবিকা রক্ষার কথা বলে করোনা পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রহীন করে ফেলেছে। সরকারের আজ্ঞাবহ নির্বাচন কমিশন সংবিধান রক্ষার জিগির তুলে দুটি সংসদীয় আসনে উপনির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেছে। অথচ এ বিষয়ে তারা সংবিধানের অভিভাবক উচ্চতর আদালতের শরণাপন্ন হতে পারতো তাদের করণীয় নির্ধারণ প্রসঙ্গে। কারণ এমন পরিস্থিতি দেশে আগে সৃষ্টি হয়নি। এ বিষয়ে তাদের পরামর্শ নেওয়াই ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু তারা সে পথে হাঁটছেনা। সরকারের মতোই তাদের কাছে সাধারণ জনগণ সবচেয়ে গুরুত্বহীন বিষয়।

‘এদেশ বিপন্ন আজ; জানি আজ নিরন্ন জীবন-মৃত্যুরা প্রত্যহ সঙ্গী, নিয়ত শত্রুর আক্রমণ রক্তের আল্পনা আঁকে, কানে বাজে আর্তনাদ সুর; তবুও সুদৃড় আমি, আমি এক ক্ষুধিত মজুর। আমার সম্মুখে আজ এক শত্রু: এক লাল পথ, শত্রুর আঘাত আর বুভুক্ষায় উদ্দীপ্ত শপথ’।

 

 

লেখক

সাবেক সভাপতিবিপ্লবী ছাত্র মৈত্রী

Sharing is caring!

Advisory Editor
Kazi Sanowar Ahmed Lavlu
Editor
Nurul Afsar Mazumder Swapan
Sub-Editor
Barnadet Adhikary 
Dhaka office
38 / D / 3, 1st Floor, dillu Road, Magbazar.
Chittagong Office
Flat: 4 D , 5th Floor, Tower Karnafuly, kazir deori.
Phone: 01713311758

পুরানো খবর

আগস্ট 2020
শনি রবি সোম বুধ বৃহ. শু.
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
293031  

ছবি ঘর

    WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com