Sunday, 5/7/2020 | : : UTC+6
Green News BD

করোনা: ক্রান্তিকালের কথকতা……

করোনা: ক্রান্তিকালের কথকতা……

সারাবিশ্বে করোনা সংক্রমিত এমন একটি দেশ খুঁজে পাওয়া যাবে না যেখানে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সংক্রমণ প্রতিরোধ বিষয়ে সিদ্ধান্তমূলক বক্তব্য প্রদান করছে। কিন্তু আমাদের দেশে দিচ্ছে। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী বিভিন্ন সিদ্ধান্তমূলক বক্তব্য দিচ্ছেন। সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন,‘ইকোনমি চালু রাখতে হবে, এটা আমাদের ষ্ট্রাটেজি। এর পাশাপাশি ছোট ছোট করে অঞ্চল সামর্থ অনুযায়ি অবরুদ্ধ করা হবে, যাতে নরমাল লাইফ বাধাগ্রস্থ না হয়’। অতিব চমৎকার ! সবকিছু স্বাভাবিক রাখতে চান এবং পরিস্থিতিও নিয়ন্ত্রণ করতে চান!!

তার বক্তব্যে তিনি পরিস্কার করেছেন সরকারের প্রধান লক্ষ অর্থনৈতিক কর্মকান্ড চালু রাখা। সেটি চালু রেখে যতোটা সম্ভব সে অনুযায়ি করোনাভাইরাস বিস্তার রোধে ভূমিকা নেওয়া। এটাই গ্রেট ট্রাজেডি, জনস্বাস্থ্য ইতিমধ্যে যে বিপর্যয়কর পরিস্থিতির মধ্যে প্রবেশ করেছে তাতে এখন অর্থনৈতিক কর্মকান্ড যতোটুকু পরিচালিত হচ্ছে আগামীতে সেটুকু হবারও পরিস্থিতি থাকবেনা। সরকার এই লেসনটা কোনভাবেই নিচ্ছেনা। ধারাবাহিকভাবে গোয়ার্তুমি ভাব দেখিয়েই যাচ্ছে। এবং তার কারণে আজ দেশে ১ লাখের বেশি মানুষ সংক্রমিত হয়েছে, দেড় হাজারের বেশি মানুষ মৃত্যুবরণ করেছে।

করোনা চিকিৎসায় অক্সিজেন একটি অন্যতম প্রধান উপাদান। এই রোগে যে সমস্ত রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয় তারা প্রধানত শ্বাসকষ্টের সমস্যা দেখা দিলেই হাসপাতালে ভর্তি হতে বাধ্য হন। রোগীর সেই অবস্থায় যদি নিরবিচ্ছিন্ন অক্সিজেন সরবরাহ না করা যায় তবে নিশ্চিতভাবেই রোগী মুত্যুবরণ করেন। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের অধ্যাপক খান আবুল কালাম আজাদ বলেন,‘করোনাভাইরাসের সংক্রমণের কারণে ফুসফুস ক্ষতিগ্রস্থ হয়, ক্ষমতা হারায়। তখন বাতাস থেকে পরিমাণমতো অক্সিজেন নিয়ে রক্তে দিতে পারেনা। রক্তে অক্সিজেন কমে গেলে শরীরের গুরুত্বপূর্ণ কিছু অঙ্গ-প্রতঙ্গ দ্রুত অকেজো হয়ে পড়ে। হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ৯৫ শতাংশ রোগীর অক্সিজেন দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে’।

অক্সিজেনের সরবরাহে যে ঘাটতি হবে সেটি জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ থেকে শুরু করে আমাদের মতো আমজনতার পক্ষ থেকে গত ৩ মাস আগে থেকেই বলা হচ্ছে। অক্সিজেন সমস্যার সমাধানের জন্য কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতালসহ অন্যান্য হাসপাতালে সেন্ট্রাল অক্সিজেনের ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরামর্শ প্রদান করেন জনস্বাস্থ্যবিদ গণ। সেই সময় এটির উদ্যোগ গ্রহণ করলে আজকের এই সংকট তৈরি হতো না। অন্যান্য সকল বিষয়ের মতো সরকার এটিকেও অবহেলা করেছে। অক্সিজেনের অভাবে যে সমস্ত রোগী মৃত্যুবরণ করছেন তাদের এই মৃত্যুকে ‘কাঠামোগত হত্যাকান্ড’ বলা যায়। শুধুমাত্র অক্সিজেনের কারণে নয়, সামগ্রিকভাবে স্বাস্থ্য অব্যবস্থাপনার কারণে যে মৃত্য ঘটছে এ সবই ‘কাঠামোগত হত্যাকান্ড’-এর অর্ন্তগত।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন,‘এখন তো দৈনিক নমুনা পরীক্ষায় ২২-২৩ শতাংশ মানুষের করোনা পজিটিভ পাওয়া যাচ্ছে। এর অর্থ হল পরীক্ষা না হওয়া অনেক সংক্রমিত মানুষ সমাজে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এভাবে চল্লে ৮০ ভাগ মানুষ আক্রান্ত হয়ে যাবে’। বর্তমানে আক্রান্তের যে সংখ্যা তার মধ্যে যারা হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য আসছে তাদেরই চিকিৎসা নিশ্চিত করা যাচ্ছেনা। আইসিইউ-অক্সিজেনের অভাবে রোগীর মৃত্যু ঘটছে। মোট জনসংখ্যার ৮০ শতাংশ যদি করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হয় তখন আমাদের অবস্থা কি হবে এটা ভাবলেই তো চারপাশ অন্ধকার দেখছি। অবশ্য আমাদের মাননীয় গণ জিডিপি প্রবৃদ্ধির প্রত্যাশায় নির্বিকারভাবে দিন পার করছেন।

সামনে কোরবানি ঈদ। ইতিমধ্যে ঈদকে কেন্দ্র করে সরকার তথাকথিত স্বাস্থ্যবিধি রক্ষাকরে পশুর হাট বসানোর পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে। রোজার ঈদে জনগনকে বাড়ি যাওয়ার সুযোগ দিয়ে একদফা সংক্রমণের বিস্তার ঘটিয়েছে, আবারো কোরবানি ঈদকে কেন্দ্র করে পশুর হাট বসিয়ে সংক্রমণ আরেক দফা বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে। সংক্রমণ ঠেকানোর নুন্যতম কোন পরিকল্পনা নেই পক্ষান্তরে এমন সব সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছে যাতে সংক্রমণের আরো বিস্তার ঘটে।

জনস্বাস্থ্যবিদ আইইডিসিআরের উপদেষ্টা ডাঃ মুশতাক হোসেন বলেন,‘গরুর হাট বসলে সংক্রমণের বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। মাংস বিতরনের সময়ও সংক্রমণ ছড়াবে। এ নিয়ে এখনই ধর্ম মন্ত্রণালয় ও ইসলামিক ফাউন্ডেশনকে আলেম-ওলামাদের নিয়ে বসে সিদ্ধান্ত নিতে হবে’। একই রকম মন্তব্য প্রকাশ করেছেন জনস্বাস্থ্যবিদ ডাঃ লেনিন চৌধুরী। তিনি বলেন,‘এই ঈদকে কেন্দ্র করে এখানে-সেখানে পশুর হাট বসলে সর্বনাশ হয়ে যাবে’। পরিতাপের বিষয় সরকার এসব মতামতকে উপেক্ষা করে তথাকথিত স্বাস্থ্যবিধি রক্ষা করে হাট বসিয়েই ছাড়বে!!

কোরবানি ঈদের হাটের বিষয়টি অনলাইনের মাধ্যমে হতে পারে। সেটি নিয়ে কাজ না করে সরকার স্বাস্থ্যবিধি রক্ষা করে পশুর হাট করা যায় কিনা সেটা নিয়ে কাজ করছে। ইতিমধ্যে রাজধানীতে রেড জোন হিসাবে চিহ্নিত শাহজানপুরে হাটের জন্য ঢাকা দক্ষিন সিটি কর্পোরেশন এর পক্ষ থেকে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। অথচ এটা প্রমানিত যে, স্বাস্থ্যবিধি রক্ষাকরে কোন কিছুই প্রতিপালন করা সম্ভব হয়নি।

একেবারে প্রথম থেকেই এখানে করোনাভাইরাস প্রতিরোধে ব্যাপকভাবে সমন্বয়হীনতার চিত্র দেখা গেছে। কোন একটি বিষয়ের সাথে অন্য একটি বিষয়ের নুন্যতম সমন্বয় বলতে যা বোঝায় সেটি ছিলোনা, এখনও নেই। স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তর পুরো বিষয়টিকে লেজে-গোবরে অবস্থা করে ফেলেছে। এ ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের দায় সর্বাধিক। তারা একর পর এক ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে ও একইসাথে সিদ্ধান্ত ত্বরিত গতিতে বাস্তবায়ন না করে পরিস্থিতিকে এতোটা ভয়াবহ জায়গায় নিয়ে গেছে, সবাই এভাবেই দেখে বিষয়টিকে।

এমন একটি পরিস্থিতিতে কিছু প্রশ্ন আমি পাঠকের সামনে তুলে ধরতে চায়। করোনা মোকাবেলায় প্রথম এবং অন্যতম একটি পদক্ষেপ ছিলো সাধারণ ছুটি ঘোষণা, যে ছুটি কয়েক দফায় বৃদ্ধি করা হয়। প্রথম দফা ছুটির পরেই এ বিষয়ে বিভিন্ন মাধ্যম থেকে বলা হয় এভাবে ছুটি না দিয়ে এটাকে কার্যকর লকডাউন করা হোক। সরকারের জনস্বাস্থ্যবিদদের নিয়ে যে কয়টি কমিটি করা হয়েছে তারা প্রত্যেকেই এই পরামর্শ দিয়েছিলেন, কিন্তু সেই পরামর্শ ইগনোর করা হয়। এখানে প্রশ্ন হচ্ছে এটা ছুটি হবে না লকডাউন হবে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে কে? সরকারের নীতি নির্ধারক গণ না স্বাস্থ্য অধিদপ্তর??

গার্মেন্ট কারখানা খুলে দেওয়া হলো, শ্রমিকদের ঢাকায় ডেকে আনা হলো আবার ফেরত পাঠানো হলো এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলো কে? সরকারের নীতিনির্ধারক গণ না স্বাস্থ্য অধিদপ্তর??

সীমিত আকারের কথা বলে সমস্ত গার্মেন্টসহ অন্য সকল কলকারখানা, দোকানপাট, মার্কেট খুলে দেওয়া হলো এই সিদ্ধান্তগুলো গ্রহণ করেছিলো কে? সরকারের নীতিনির্ধারক গণ না স্বাস্থ্য অধিদপ্তর??

সংক্রমণের প্রচন্ড উর্দ্ধগতির মধ্যে ঈদের সময় বাড়িতে যেতে দেওয়া, সাধারণ ছুিট প্রত্যহার করে নেওয়া, গণপরিবহন চালু করা, সরকারি-বেসরকারি অফিস খুলে দেওয়া এই সিদ্ধান্ত গুলো গ্রহণ করেছে কে? সরকারের নীতিনির্ধারক গণ না স্বাস্থ্য অধিদপ্তর??

যে প্রশ্ন গুলো আমি উল্লেখ করলাম এর প্রত্যেকটি উত্তর আমরা জানি। প্রতিটি বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে সরকার। এই সকল সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বা অধিদপ্তরের কোন ভূমিকা নেই, অথচ তাদের ভূমিকাই প্রধান হওয়া উচিত ছিলো। প্রতিটি সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্বে সরকারের গঠিত প্রত্যেকটি টেকনিক্যাল কমিটি প্রবলভাবে বিরোধিতা করেছিলো সিদ্ধান্ত গুলোর। সরকার তাদের মতামত উপেক্ষা করেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এবং তাদের প্রতিটা সিদ্ধান্তের ফলশ্রুতিতে সংক্রমণের বিস্তার এই জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে।

উল্লেখিত প্রত্যেকটি বিষয় মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নিজস্ব তত্ত্বাবধানে ঘটেছে। সরকারের একাধিক মন্ত্রী এখনও পর্যন্ত প্রতিদিন তাদের বক্তৃতায় বলছেন, প্রধানমন্ত্রীর একক নেতৃত্বে করোনাভাইরাস প্রতিরোধ করা হচ্ছে। সেই হিসাবে ব্যর্থতা বলি আর সফলতা বলি তার দায় তো বর্তায় প্রধানমন্ত্রীর উপরেই। কিন্তু এখন ব্যর্থতার সব দায় পড়ছে এককভাবে অধিদপ্তরের ডিজির উপর। যারা সব দায় ডিজির উপরে দিচ্ছেন, তাদের বলি, কিছু দায় প্রধানমন্ত্রীর উপরেও দেন!!

গত ১৪ মে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী গনভবন থেকে একটি ভিডিও কনফারেন্সে বক্তব্যে বলেন,‘সরকারি নিষেধাজ্ঞা শিথিলতার জন্য হয়তো সংক্রমণ একটু বেড়ে গেছে। তবে আশাকরি এটাও আমরা নিয়ন্ত্রণে আনতে পারবো। উন্নত দেশের সঙ্গে তুলনা করলে আমাদের স্বাস্থ্য সেবা-বিভাগ যথেষ্ঠ দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে। আমরা এটা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করে ফেলেছি’(১৪ মে ২০২০ বাংলা ট্রিবিউন)। প্রধানমন্ত্রী যেদিন এই বক্তব্য দিয়েছিলেন, সেদিন (১৪ মে) পর্যন্ত মোট সংক্রমণের সংখ্যা ছিলো ১৮ হাজার ৮২৩ জন আর মৃত্যুর সংখ্যা ছিলো ২৮৩ জন। আজকে (৪৩ দিন পর) পর্যন্ত মোট শনাক্তের সংখ্যা ১ লাখ ৩৩ হাজার ৯৭৮ জন আর মৃত্যু ১ হাজার ৬৯৫ জন (ইনফো.করোনা)। মাননীয়, পরিসংখ্যান কি বলে ? আমরা কি আদৌও নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছি!! না পারিনি। বরং সংক্রমণের বিস্তার নিয়ন্ত্রণহীনভাবে এমন জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে যে এর হ্রাস টেনে ধরা আমাদের জন্য কঠিন এক চ্যলেঞ্জ।

আমরা কি আদৌও এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে চায়!! সরকারের এপিয়ারেন্স দেখে মনে হচ্ছে না করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণ করতে চাচ্ছে! একে নিয়ন্ত্রণের একমাত্র উপায় ভাইরাস স্থানান্তরের চেইন ব্রেকআপ করা। এই চেইন ব্রেকআপের একমাত্র পদ্ধতি লকডাউন। এবং এখন সংক্রমণের বিস্তার যে পর্যায়ে ঘটেছে তাতে জনস্বাস্থ্যবিদদের মতামত অনুসারে পূর্ণাঙ্গ লকডাউন ব্যতীত সমাধান সম্ভব নয়। কিন্তু সরকার ছোট এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ করতে চাইছে। সবকিছু স্বাভাবিক রেখে যুদ্ধে জয় করা যায়না।

‘মিথ্যা অশিক্ষার বিদ্যায়তনে, শোষন ও ত্রাসের রাষ্ট্রযন্ত্রের মধ্যে, সামরিক-অসামরিক কর্তৃপক্ষের বুকে কবিতার প্রতিবাদ প্রতিধ্বনিত হোক।’

Sharing is caring!

Advisory Editor
Kazi Sanowar Ahmed Lavlu
Editor
Nurul Afsar Mazumder Swapan
Sub-Editor
Barnadet Adhikary 
Dhaka office
38 / D / 3, 1st Floor, dillu Road, Magbazar.
Chittagong Office
Flat: 4 D , 5th Floor, Tower Karnafuly, kazir deori.
Phone: 01713311758

পুরানো খবর

জুলাই 2020
শনি রবি সোম বুধ বৃহ. শু.
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031

ছবি ঘর

    WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com