Sunday, 5/7/2020 | : : UTC+6
Green News BD

করোনা: সরকারের মধ্যে সরকার….

করোনা: সরকারের মধ্যে সরকার….

মহামারি পরিস্থিতি মূল্যায়ন, প্রজেকশন তার আলোকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, পরিকল্পনা করা ও বাস্তবায়ন এই সবকিছুর জন্যই প্রয়োজন নির্ভুল তথ্য। কিন্তু আমাদের তথ্য নিয়ে চলছে একটা বড় ধরনের গ্যাপ। যেভাবে তথ্য উপস্থাপন করা হচ্ছে কোনটির সাথে কোনটির মিল খুঁজে পাওয়া দুস্কর। কেন্দ্রের সাথে জেলার তথ্য মিলছেনা আবার বিভাগের সাথে জেলার তথ্য মিলে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে করোনা বিপর্যয় থেকে মুক্তি পাওয়া অসম্ভব একটি ব্যাপার।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবুল কালাম আজাদ বলেন,‘করোনার জন্য আমরা কেউই প্রস্তুত ছিলাম না। শুরুতে অনেক ভুলত্রুটি ছিলো। করোনা মোকাবেলায় নতুনভাবে বেশকিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তথ্যের সমস্যা দুর করা তার একটি’। তিনি বক্তব্য দেওয়ার পরেও ব্যবহারিকভাবে দেখা যাচ্ছে প্রতিনিয়তো অসামঞ্জস্যপূর্ণ তথ্য প্রচার করা হচ্ছে। একই সাথে তথ্য তাদের পরিস্থিতি অনুকূলে রাখার জন্য মেকানিজম করা হচ্ছে।

প্রতিদিন সুস্থতার যে তালিকা দেওয়া হচ্ছে সেটা খুবই ধোঁয়াশাচ্ছন্ন। এখন যে প্রটোকল মেনটেইন করে রোগীকে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়, সেখানে ছাড়পত্র দেওয়ার আগে তার টেস্ট করা হয়না। ছাড়পত্র দেওয়ার সময় বলে দেওয়া হয় ১৪ দিন বাসায় আইসোলেশনে থাকার পর ২৪ ঘন্টায় দুটি টেস্ট করাতে হবে। সেই টেস্টের দুটিতেই পর পর নেগেটিভ আসলে তখন তাকে চুড়ান্তভাবে সুস্থ বলা হবে।

রোগী ছাড়পত্র নিয়ে বাসায় ফিরছেন। তারপর কত সংখ্যক রোগী ১৪ দিন পর ২৪ ঘন্টার মধ্যে ২ টি টেস্ট করছেন, তাদের মধ্যে কত সংখ্যক রোগীর টেস্টে পজিটিভ এসেছে, কত সংখ্যক নেগেটিভ এসেছে এ ধরনের কোন তথ্যই নেই। অথচ এই তথ্য গুলো ছাড়া প্রকৃত অর্থে কোনভাবেই নির্ধারণ করা সম্ভব নয় কত সংখ্যক রোগী চুড়ান্তভাবে সুস্থ হচ্ছেন। ইতিমধ্যে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হচ্ছে অনেক রোগী সুস্থ তালিকায় থেকেও কয়েকদিন পর পুনরায় পজিটিভ হয়ে মৃত্যুবরণ করছেন।

গত ১৫ জুনের সংবাদ ব্রিফিং এ হঠাৎ করেই বলা হল ঐ দিন সুস্থ হয়েছেন ১৫ হাজার ২৯৬ জন। এই সংখ্যা সংগ্রহের সূত্র হিসাবে জানানো হল এতোদিন বাড়িতে থেকে যে রোগী সুস্থ হয়েছেন এটা তাদের সংখ্যা। এমনভাবে তথ্য উপস্থাপন সম্পর্কে পরিসংখ্যান বিজ্ঞান বলে, একটা বড় সংখ্যার অংক পূর্বের চলমান সংখ্যার সাথে যোগ করতে হলে অবশ্যই প্রাপ্ত তথ্যের পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ উপস্থিত থাকতে হবে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে সেদিন কোন ব্যাখ্যা উপস্থাপন না করেই পুরো জাতীকে সেটা গিলতে বাধ্য করা হয়েছে। এটা প্রকৃত অর্থে একটি পরিকল্পার অংশ যা আমি লেখার পরের অংশে উল্লেখ করবো।

প্রতিদিন ব্রিফিং- এ মৃত্যুর যে সংখ্যা প্রকাশ করা হচ্ছে, তার চাইতে উপসর্গ নিয়ে যারা মারা যাচ্ছেন তাদের সংখ্যা হয় বেশি বা একইরকম। যা প্রতিদিন ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়াতে প্রচার হচ্ছে। কোন কোন প্রতিষ্ঠান বেসরকারি পর্যায়ে এ সকল মৃত্যুর পরিসংখ্যান তৈরি করলেও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বোবা-কালা-কানার মতো মুখ বুজে রয়েছে। দেখা যাচ্ছে মৃত ব্যক্তির দাফন হয়ে যাবার পর তার করোনা পজেটিভ যখন আসছে তখন ঐ সমস্ত মৃত ব্যক্তির নাম করোনায় আক্রান্ত মৃত ব্যক্তিদের তালিকায় যুক্ত হচ্ছে না। অর্থাৎ এই ধরনের মৃত্যুগুলোও মোট পরিসংখ্যান থেকে বাদ পড়ছে। এসব তথ্য সন্নিবেশিত করে যদি পরিসংখ্যান তৈরি করা হয় তবে নিশ্চিতভাবেই এই সংখ্যা বর্তমান সংখ্যার দ্বিগুন হবে।

অথচ এই তথ্য গুলো এড়িয়ে যাবার কোন সুযোগ না থাকলেও প্রতিনিয়তো এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে,‘মহামারি পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করার জন্য করোনা উপসর্গ নিয়ে কত মানুষের মৃত্যু হচ্ছে , সেই তথ্য সংগ্রহ করা দরকার’। কিন্তু এই বিষয়টিকে কোনভাবেই গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছেনা অথবা বলা চলে সচেতনভাবে এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে। চমেকের মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক অনিরুদ্ধ ঘোষ বলেন,‘সরকারি চিকিৎসা গাইডলাইনে কোভিডজনিত মৃত্যুর যে সঙ্গা দেওয়া হয়েছে, তাতে সন্দেহজনক করোনা রোগী হিসাবে চিকিৎসা পাওয়া ব্যক্তির মৃত্যুকে কোভিড রোগে মৃত্যু বলে ধরে নিতে হবে’। মৃত্যুর সংখ্যা, সংক্রমণের সংখ্যা কম দেখানো আর যেনতেন প্রকারে সুস্থতার সংখ্যা বেশি দেখিয়ে জাতীর সামনে মহামারির একটি স্বাভাবিক চিত্র তুলে ধরার অপচেষ্টা সাময়িকভাবে সফল হলেও এর চুড়ান্ত পরিনতি অপেক্ষা করছে ভয়াবহ।

পূর্বেই বলেছি, মহামারিকালিন সময়ে একে মোকাবেলা করার জন্য যে সকল অস্ত্র ব্যবহার করতে হয় তার মধ্যে অন্যতম অস্ত্র নির্ভুল ও নির্মোহভাবে সেই তথ্যের বিশ্লেষণ। তথ্যের সঠিক বিশ্লেষণ ব্যতীত এই ‘বায়োলজিক্যাল ওয়ার’-এ বিজয় অর্জন করার জন্য যে রণকৌশল গ্রহণ করা হবে সেটি ভুল হতে বাধ্য। এর কোন বিকল্প নেই। সঠিকভাবে তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ শুধুমাত্র বর্তমান পরিস্থিতিকে মোকাবেলা করার জন্য নয়, আগামীতে এ ধরনের যেকোন মহামারি মোকাবেলায় এটা প্রাথামিক তথ্য হিসাবে মৌলিক ভূমিকা রাখবে।

গত ১০ দিনে গড়ে নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে ১৫ হাজার ৭০০। গড়ে শনাক্ত হয়েছে ৩ হাজার ৪৮০ জন (গভ.করোনা ইনফো)। খেয়াল করে দেখুন সংখ্যা দিয়ে কিভাবে প্রকৃত পরিস্থিতিকে আড়াল করা যায়! ১০ দিনের গড় হিসাবে দেখা যাচ্ছে ১৫ হাজারের কিছু বেশি সংখ্যায় টেস্ট করলে শনাক্ত দেখানো যাচ্ছে গড়ে ৩ হাজার ৪০০ থেকে ৫০০। এই ১০ দিনের মধ্যে ১৭ জুন টেস্ট করা হয়েছে সর্বোচ্চ ১৭ হাজার ৫২৭ টি নমুনা। ঠিক সেদিন শনাক্ত হয়েছে ৪ হাজার ৮ জন। অর্থাৎ ৪ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। তারা ঐ একদিনের উদাহরণ দিয়ে বুঝেছে টেস্ট ১৫ হাজারের বেশি করলেই শনাক্ত ৪ হাজারের ঘরে অথবা তার চাইতে আরো অনেক বেশি দেখাবে। সেকারণে তারা গড়ে শনাক্ত ৩ হাজারের কিছু বেশি দেখানোর জন্য টেস্ট করছে ১৫ হাজারের কিছু বেশি। তারা একদিন যেহেতু ১৭ হাজারের বেশি নমুনা পরীক্ষা করার সক্ষমতা দেখিয়েছে তার অর্থ তাদের সেই সক্ষমতা তৈরি হয়েছে।

প্রতিদিনই তাদের সংগৃহীত নমুনা থেকে যাচ্ছে। প্রায় ২০ দিন পূর্বে জাতীয় টেকনিক্যাল কমিটি বলেছিলো, বর্তমান অবস্থায় প্রতিদিন ৩০ হাজার টেষ্ট করার সার্মথ্য আছে। তারা মূলত শনাক্তের সংখ্যা সাড়ে ৩ হাজারের ঘরে আটকে রাখার জন্য সাড়ে ১৫ হাজারের বেশি নমুনা পরীক্ষা করছে না। এবার বুঝুন পরিসংখ্যান দিয়ে কিভাবে সমগ্র পরিস্থিতিকে আড়াল করে ফেলা যায়। এবং এ ধরনের একটি অবস্থাকে সামনে রেখে যদি কোন রণকৌশল ঠিক করা হয় তবে সেই যুদ্ধে বিজয় অর্জন করার কি কোন সম্ভাবনা বিদ্যমান থাকে!! এক কথায় বলা যায় থাকে না।

দেশে করোনা সংক্রমণের প্রথম দিন থেকে বলে আসা হচ্ছে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগে, তার নেতৃত্বে সবকিছু পরিচালিত হচ্ছে। এমনকি মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদেরও তিনি সরাসরি নির্দেশনা দিয়ে কাজ পরিচালনা করছেন। কিন্তু ঠিক যখনই পরিস্থিতি নাজুক বিষয়ে কোন আলোচনা করা হচ্ছে তখনই সমস্ত দোষ ঘাঁড়ে যাচ্ছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের। ভুল সিদ্ধান্তের আলোচনা আসলেও একই আলোচনা সামনে আসছে। নিশ্চয় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় হিসাবে তার দায়টিই সবার প্রথম। পাঠকরা, ভাবুন বাংলাদেশের বর্তমান এক কেন্দ্রীক সরকার ব্যবস্থায় যদি প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি তত্বাবধানে পরিচালিত টিম ঠিকমতো কাজ না করে, ভুল সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে তো বলতে হয় ‘সরকারের মধ্যে অন্য একটি সরকার কাজ করছে’।এটা যদি না বলি, তাহলে তো বলতে হয় যেখান থেকে সিদ্ধান্ত চুড়ান্তভাবে আসছে সেখান থেকেই যাবতীয় ভুল হচ্ছে।

গত ১৮ জুন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বলেছিলেন,‘পরিস্থিতি ২-৩ মাসে শেষ হচ্ছে না। এটি দুই থেকে তিন বছর বা তার চেয়েও বেশি সময় স্থায়ি হবে’। তার এই কথায় বিভিন্ন মহল থেকে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া আসে। সরকারি দলের সাঃ সম্পাদক পর্যন্ত নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। তিনি বক্তব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশ করতে বাধ্য হন।

একটু গভীরে বিশ্লেষণ করলেই বোঝা যাবে, তিনি নিছক কথার কথা এটা বলেননি। তিনি মূলত সরকারের চিন্তা-ধারনাকে মুখ ফসকে জন সম্মুখে বলে ফেলেছিলেন। স্মরণ করুন, গত ৪ দিন আগে বাংলাদেশের করোনা পরিস্থিতি সম্পর্কে চীনা বিশেষজ্ঞ দলের প্রধান কি মন্তব্য করেছেন! তিনি বলেছেন, করোনাভাইরাসের উপর সরকারের নুন্যতম নিয়ন্ত্রণ নেই। এখানে সমস্যা হলো- করোনাভাইরাস কোথায় আছে সেটাই জানা দুস্কর। এখানে কাজ হচ্ছে অনেকটা অন্ধকারে ঢিল ছোড়ার মতো। এভাবে ভাইরাস মোকাবেলা করা সত্যিই দুস্কর। এটা যদি পরিস্থিতি হয় তবে মহাপরিচালক সাহেব তারো ৩ দিন আগে যা বলেছেন সেটা এই বক্তব্যেরই প্রতিধ্বনি করে। অর্থাৎ আপনি যদি না জানেন শত্রু কোথায় তবে যুদ্ধটা হবে দীর্ঘস্থায়ী। আর সরকারও এটা জানে, কারণ এই পরিস্থিতি তারাই তৈরি করেছে, প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধি আর উন্নয়নের আশায়!!

জনস্বাস্থ্য কে উপেক্ষা করে বর্তমান বাস্তবতায় এই স্বপ্ন দেখা অলীক স্বপ্নের সামিল। যে যাই বলুক না কেন এর জন্য চরম খেসারত দিতে হচ্ছে দেশের জনগণকে। তারা প্রতিনিয়তো একটি চরম অনিশ্চয়তায় দিন পার করছে। যে সময় আমরা পার করছি তারও একটি ভাবনা আছে-

‘সত্যি কথা লুকিয়ে রাখতে আমরা ঘৃণা বোধ করি, তাই স্পষ্ট কথায় জানিয়ে দিচ্ছি, যারা লাথি মারে ইতিহাস তাদের মুছে ফেলে, যারা লাথি খায় তারাই হাত মুঠো ক’রে উঠে দাঁড়ায়’।

Sharing is caring!

Advisory Editor
Kazi Sanowar Ahmed Lavlu
Editor
Nurul Afsar Mazumder Swapan
Sub-Editor
Barnadet Adhikary 
Dhaka office
38 / D / 3, 1st Floor, dillu Road, Magbazar.
Chittagong Office
Flat: 4 D , 5th Floor, Tower Karnafuly, kazir deori.
Phone: 01713311758

পুরানো খবর

জুলাই 2020
শনি রবি সোম বুধ বৃহ. শু.
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031

ছবি ঘর

    WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com