Sunday, 5/7/2020 | : : UTC+6
Green News BD

করোনা: কোথায় চলেছি আমরা…..

করোনা: কোথায় চলেছি আমরা…..

‘আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু, বিরহদহন লাগে। তবুও শান্তি, তবু আনন্দ, তবু আনন্দ জাগে। তবু প্রাণ নিত্য ধারা, হাসে সূর্য চন্দ্র তারা, বসন্ত নিকুঞ্জে আসে বিচিত্র রাগে’। এটাই আমাদের প্রাণের স্পন্দন। জীবনে নতুন আলোর সঞ্চার ঘটবে সেটাই আমাদের প্রত্যাশা। যা আমাদের প্রত্যাশা তাতো শুধু ব্যক্তিগতভাবে চাইলেই সেটি পূরণ হবার নয়। বর্তমানে করোনাকে প্রতিরোধে সরকারের ভূমিকা আমাদের হতাশ করেছে। এই সংকট মোকাবেলায় তার ভূমিকাই প্রধান, সাথে নাগরিকের দায়িত্ব পালন। আর নাগরিক যদি দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট না হয় তবে কারণ বের করে তাকে সেই দায়িত্ব পালনে বাধ্য করা সেটাও সরকারের দায়িত্ব।

দেশে করোনাভাইরাস শনাক্ত হওয়ার ১০৫ তম দিন পর শনাক্ত রোগীর সংখ্যা দাড়িয়েছে ১ লাখ ৮ হাজার ৭৭৫ জন। প্রথম রোগী শনাক্তের ২৮ দিন পর ৬ এপ্রিল শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ১০০ ছাড়ায়, ৪ মে তে এসে ছাড়ায় ১০ হাজার, ২০ হাজার ১৫ মে, ৫০ হাজার ছাড়ায় ২ জুন, এর পরের ৫০ হাজার ছাড়ায় ১৬ দিনে (ওয়ার্ল্ডোমিটার)। তারিখ এবং দিনের গ্যাপ গুলো পর্যবেক্ষণ করলেই পাঠক সহজেই বুঝতে পারবেন সরকার একের পর এক ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে, ঠিক সে অনুযায়ী সংক্রমণের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। করোনা সংক্রমণ শুরুর পর মোট আক্রান্ত ও মৃত্যুর অর্ধেকের ঘটনা ঘটেছে সাধারণ ছুটি প্রত্যাহার করার পর শেষ ১৯ দিনে। বৈজ্ঞানিকভাবে এই পরিসংখ্যাণ নির্দেশ করে সরকারের সিদ্ধান্তের দূর্বলতার দিক। করোনা সংক্রমণ ও মৃত্যুর দিক দিয়ে এশিয়াতে বাংলদেশের অবস্থান এখন তৃতীয়, আর পুরো বিশ্বে ১৭ তম। যা তিন দিন আগে ছিলো ১৮ তম। যতোই দিন যাচ্ছে আমারা সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।

অথচ সরকারের এ বিষয়ে কোন আত্মসমালোচনা নেই। তারা মনে করে যা করেছে ঠিক করেছে। আমরা জানি, আত্মসমালোচনা না থাকলে বিগত দিনের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে আগামিতে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যায়না। সুতারাং এটা বলাই যায় আগামী দিনের পরিকল্পনা সঠিক হবার কোন কারণ নেই। আমরা আমাদের পিছনের ভুল থেকে কোন শিক্ষায় গ্রহণ করছিনা। ইতিমধ্যে সেটার আলামত আমরা পেতে শুরু করেছি।

বাংলাদেশে বর্তমানে সফররত চীনের করোনা বিষয়ক বিশেষজ্ঞ দলের প্রধান ডাঃ লি ওয়েন বলেন,‘বাংলাদেশের পরিস্থিতি আলাদা। এখানে সমস্যা হল করোনাভাইরাস কোথায় আছে সেটাই জানা দুস্কর। বলা যায় জানা যাচ্ছে না। এখানে কাজ হচ্ছে অনেকটা অন্ধকারে ঢিল ছোড়ার মত। এভাবে ভাইরাস মোকাবেলা করা সত্যি দুস্কর। আমরা মনেকরি, যদি কার্যকর লকডাউন, দ্রুত পরীক্ষা, কন্ট্রাক্ট ট্রেসিং ও চিকিৎসার পরিধি বাড়ানো যায় তবে উত্তরন সম্ভব’।

ঠিক এই মুহুর্তে দেশে করোনা সংক্রমণ বিস্তার প্রতিরোধে কোন ব্যবস্থায় সক্রিয় নেই। পৃথিবীর অন্য সকল দেশে সংক্রমণের পিকের প্রজেকশন অনুযায়ী মোটামুটি মিললেও আমাদের দেশে যে প্রজেকশন করা হয়েছিলো, আমরা তার ধারে কাছেও নেই। কারণ সরকার প্রতিনিয়তো সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেছে, এবং প্রতিটা সিদ্ধান্ত যে সংক্রমণ বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা রেখেছে তা উল্লেখিত পরিসংখ্যানই বলে দেয়।

জনস্বাস্থ্যবিদদের নিয়ে গঠিত সরকারের করোনা বিষয়ক কমিটির প্রধান অধ্যাপক শাহ মুনির হোসেন বলেন,‘জুন মাসের প্রথম দিকে সংক্রমণ কমতে থাকে বলে মনে হলেও আজকের অবস্থা হয়েছে ঈদের ছুটির কারণে।আর এখন যদি কঠোর লকডাউন না করা হয়, স্বাস্থ্যবিধি না মানা হয় তাহলে সংক্রমণ আবার বাড়বে। এই মুহুর্তে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে কোন কার্যকর ব্যবস্থা আসলে নেই’।

ঢাকার টোলারবাগ বা মাদারীপুরের শিবচরে ছোট এলাকা লকডাউন করে একটা ভালো সফলতা পাওয়া গিয়েছিলো। সেই দৃষ্টান্তকে সামনে নিয়ে বর্তমানে ছোট এলাকা ধরে লকডাউন করার পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে সরকার। কিন্তু সেই সময়ের করোনা সংক্রমণের পরিস্থিতি ও বর্তমান অবস্থা একেবারেই এক নয়। তখনকার সামগ্রীকভাবে সংক্রমণের বিস্তারের হারের তুলনায় বর্তমানের হার অনেকগুণ বেশি। সেই সময়ে কমিউনিটি ট্রান্সমিশন ছিলো একেবারেই প্রাথমিক স্তরে। সংক্রমণের মোট সংখ্যা ছিলো অনেক কম। তখন সারা দেশ ছিলো সাধারণ ছুটির আওতায়। সুতরাং এই সমস্ত অবস্থাগুলো বিবেচনায় রেখে জনস্বাস্থ্যবিদরা মনে করছেন, কমিটির সিদ্ধান্ত পাশ কাটিয়ে সরকার যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে যাচ্ছে সেটা সংক্রমণ বিস্তার ঠেকাতে ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হবে।

সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডাঃ আ ফ ম রুহুল হক, এমপি বলেন,‘এখন বাংলাদেশে সীমিত সময়ের জন্য হলেও পূর্ণাঙ্গ লকডাউন বা কারফিউ দরকার। তা না হলে মানুষ বাঁচানো কঠিন হবে। আমলাদের ভুল সিদ্ধান্তে করোনা পরিস্থিতি ভয়াবহ হচ্ছে’। অনেক আগে থেকেই বলা হচ্ছে করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলায় আমলাদের উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা আত্মঘাতী সিদ্ধান্তগুলো গ্রহণে প্রভাবক হিসাবে ভূমিকা রাখছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডাঃ নাসিমা সুলতানা বলেন,‘বর্তমানে এমন দাঁড়িয়েছে, তাতে যে কেউ যেকোন সময় নভেল করোনা ভাইরাসে সংক্রমিত হতে পারেন। ইদানিং অনেক বেশি মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে ও মৃত্যুবরণ করছে। এ তালিকায় যে কেউ ঢুকে যেতে পারে’। এমন একটি অস্বাভাবিক, বিপর্যয়কর পরিস্থিতিতে যখন সবকিছু স্বাভাবিক রেখে করোনা মোকাবেলা করার পরিকল্পনা করা হয় তখন এই প্রচেষ্টা যে শুধুমাত্র সময় ক্ষেপন ছাড়া কিছু না সেটাই প্রতিভাত হয়।

সরকার দলীয় সাঃ সম্পাদক বলেন,‘সরকার নতুন করে সংক্রমিত এলাকা ম্যাপিং এর মাধ্যমে রেড, ইয়েলো ও গ্রিন জোন করতে যাচ্ছে’। ইতিমধ্যে গত দেড় সপ্তাহ আগে সরকারের গঠিত ৮ সদস্যের টেকনিক্যাল কমিটি তাদের প্রস্তাবিত এলাকার তালিকা প্রদান করেছে। বরাবরের মতো এবারও সরকার বিশেষজ্ঞদের তালিকা, পরামর্শ গ্রহণ না করে আমলাদের উপর নির্ভর করে নতুনভাবে এলাকার তালিকা তৈরি করছে। মাননীয় সেতুমন্ত্রী আরো বলেন,‘ আমাদের আর অবহেলা করার সময় নেই। শৈথিল্য-অবহেলা সর্বগ্রাসী করোনাভাইরাসের কাছে নিজেকে এবং আশপাশের সবাইকে নিয়ে আত্মহত্যার সামিল’। কিন্তু স্বাস্থ্য বিভাগের অব্যবস্থাপনা এটাই ইঙ্গিত করে যে, সংক্রমণ বিস্তার প্রতিরোধে সরকার এখনও যথেষ্ঠ অবহেলা করেই যাচ্ছে।

পরীক্ষার সংখ্যা যতোই বাড়ছে একই সাথে পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে ততোই প্রশ্ন উত্থাপিত হচ্ছে। কারণ কালেকশন বুথ বেড়েছে, স্যাম্পল কালেকশন বেড়েছে কিন্তু মেশিন বাড়েনি। এতে করে প্রতিদিন স্যাম্পল জমা হয়ে থাকছে। রোগীদের এক সপ্তাহ থেকে দশ দিন পরেও রিপোর্ট দেওয়া হচ্ছে। ফলশ্রুতিতে রিপোর্টে নিশ্চিতভাবেই অনেক ভুল তথ্য আসছে। শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজের ভাইরোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডাঃ জাহিদুর রহমান বলেন,‘যে প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা করা হয় তাদের আরও দক্ষ এবং সতর্ক হতে হবে। তবে প্রধান সমস্যা হচ্ছে যে মিডিয়ামে নমুনা নেওয়া হয়, ভিটিএম, দুই থেকে আট ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় সব্বোর্চ ৭২ ঘন্টা সংরক্ষণ করা যায়, এর বেশি হলে ভাইরাস জীবিত থাকে না’।

তাহলে নমুনা সংগ্রহের এক সপ্তাহ থেকে দশ দিন পর যাদের রিপোর্ট দেওয়া হচ্ছে সেই রিপোর্ট কি আদৌও সঠিক হবার সম্ভানা থাকে!! শুধুমাত্র ব্যবস্থাপনাগত দূর্বলতার কারণে এমন একটি সেনসেটিভ বিষয়েও যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণে ব্যর্থ হচ্ছে। অর্থাৎ প্রতিদিন ব্রিফিং এ যে তথ্য উপস্থাপন করা হয় সেটা সংক্রমণের প্রকৃত চিত্র না।

করোনা শনাক্তকরণে টেস্টের জটিলতা ও অব্যবস্থাপনার কারণে ইতিমধ্যে করোনার ভুয়া সনদ চক্র গড়ে উঠেছে। প্রেকটিক্যালি দেখা যায়, প্রথমে নারায়নগঞ্জে গার্মেন্ট কারখানায় শ্রমিকদের কাজে যোগদানের জন্য করোনা নেগেটিভ এ ধরনের সার্টিফিকেট দেখানোর শর্ত দেওয়া হয়। কর্মীরা পরীক্ষার জন্য বিভিন্ন জায়গায় চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। সেই সময়ে একটি অসাধু চক্র যারা পরীক্ষা করাতে ব্যর্থ হচ্ছে তাদেরকে টার্গেট করে এই সার্টিফিকেট বিক্রির প্রতারণা শুরু করে। যে চক্রটি ইতিমধ্যে দেশের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছে।

সাধারণ কোন রোগীকে হাসপাতালে ভর্তির জন্য নেগেটিভ সার্টিফিকেট চাওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে দিন যতো যাচ্ছে পরীক্ষা করানো ততোই দুরহ হয়ে পড়ছে। এই সুযোগটি গ্রহণ করছে এই অসাধু চক্রটি। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর একক তৎপরতায় এটা বন্ধ করা সম্ভব হবে না। এর জন্য যেটা বেশি জরুরী সেটি হলো পরীক্ষা করানো সহজ করা এবং যথাযথ সময়ে রিপোর্ট দেওয়া। এই কাজটি করলে এই প্রতারক চক্রটি এমনিতেই নিস্ক্রিয় হয়ে যেতে বাধ্য হবে।

গত ৩০ মে চট্টগাম মেডিকেল কলেজ এক আদেশে চিকিৎসকদের আইসোলেশন সুবিধা বাতিল করে। অফিস আদেশে বলা হয়,‘কোভিড-১৯ পজিটিভ রোগীর সংর্স্পশে এলে চিকিৎসক কিংবা কর্মকর্তা- কর্মচারীদের আইসোলেশনে যেতে হবে না’। কতোটা অবিবেচক হলে একটি সরকারি হাসপাতাল এ ধরনের আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত চিকিৎসকদের উপর চাপিয়ে দিতে পারে! যা প্রকারন্তরে করোনাভাইরাস অন্যদের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার সুব্যবস্থা করা।

মাননীয় গণ, দেশে কমিউনিটি ট্রান্সমিসন এখন ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে, সেটি আপনারাও জানেন! ইতিমধ্যে আমরা অনেক গূণি মানুষকে করোনাভাইরাসে আক্রান্তের কারণে হারিয়ে ফেলেছি। যে অবস্থা চলছে তাতে আমাদের আরো অনেক মানুষকে হারিয়ে ফেলতে হবে। যা জাতীর জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি বয়ে আনবে। যে ক্ষতি আমরা কয়েক দশকের প্রচেষ্টাতেও কাটিয়ে উঠতে পারবোনা। কিন্তু আজ না পারি আগামীতে নিশ্চয়ই অর্থনৈতিক ক্ষতি কটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে। মানুষের জীবনকে গুরুত্ব দিন, দেশের নাগরিক কে রক্ষা করুন।

‘সংকোচেরও বিহ্বলতা নিজেরে অপমান। সংকটের কল্পনাতে হোয়ো না ম্রিয়মান, মুক্ত করো ভয়, আপনা মাঝে শক্তি ধরো, নিজেরে করো জয়।’

Sharing is caring!

Advisory Editor
Kazi Sanowar Ahmed Lavlu
Editor
Nurul Afsar Mazumder Swapan
Sub-Editor
Barnadet Adhikary 
Dhaka office
38 / D / 3, 1st Floor, dillu Road, Magbazar.
Chittagong Office
Flat: 4 D , 5th Floor, Tower Karnafuly, kazir deori.
Phone: 01713311758

পুরানো খবর

জুলাই 2020
শনি রবি সোম বুধ বৃহ. শু.
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031

ছবি ঘর

    WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com