Sunday, 5/7/2020 | : : UTC+6
Green News BD

করোনা: কোথায় আমাদের গন্তব্য

করোনা: কোথায় আমাদের গন্তব্য

আমার চারপাশের অনেককেই জানি, যারা সাধারণ ছুটির পুরোটা সময় বাসায় কাটিয়েছেন। কিন্তু ঠিক যখনই সরকার মার্কেট – দোকানপাট খোলার ঘোষণা দিলো, যারা বাসায় অবস্থান করছিলেন, তারা হুড়মুড় করে বাইরে বেরিয়ে এলেন। অর্থাৎ তারা বের হবার জন্য মনসিকভাবে উন্মুখ হয়ে ছিলেন, কিন্তু বের হবার উপযুক্ত কারণ ও পরিবেশ কিছুটা হলেও অনুপস্থিত ছিলো। সরকারের দোকান-পাট খোলার ঘোষণা তাদেরকে ঘর থেকে বের করে আনার জন্য সহায়ক ভূমিকা পালন করলো।

একই রকমভাবে গতকাল দুপুরের আগ পর্যন্ত ঢাকার বাইরে যাওয়া নিয়ে অন্তত ঘোষণায় সরকারের কঠোর অবস্থানের কারণে অনেক মানুষ যাবো যাবো করেও বের হয়েছিলো না। কিন্তু দুপুরে ঘোষণা দেওয়া হলো ব্যক্তিগত পরিবহন ব্যবহার করে যাওয়া যাবে। যারা ঢাকা ত্যাগ করা নিয়ে সংশয়ের মধ্যে ছিলেন তারাও তখন বেরিয়ে পড়লো। এই পরিস্থিতি দেখে মনে হলো, হঠাৎ করে করোনা সরকারের কানে কানে বলেছে,‘যদি আমি ব্যক্তিগত গাড়িতে করে ঈদে গ্রামে যায় তবে সংক্রামণ ঘটাবোনা তুমি নিশ্চিন্ত থাকো’। সরকার করোনার কাছ থেকে এই নিশ্চয়তা পেয়ে সাথে সাথে ঢাকা থেকে বের হওয়ার নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নিয়েছে। করোনা যখন কথা দিয়েছে, তখন এলিট জনগণকে আটকে রেখে লাভ কি, কি বলেন আপনারা!!

যে শহরের বেশির ভাগ মানুষ প্রান্তিক তাদের ঈদের সময় বাড়ি যাওয়া অফিসিয়ালি আটকে রেখে এলিটদের জন্য বাড়ি যাবার ব্যবস্থা গ্রহণ করে সে আবারো প্রমাণ করেছে বরাবরের মতো কোন শ্রেণির স্বার্থ রক্ষা করছে! একদিকে সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে ‘ যে যেখানে আছেন সেখানেই অবস্থান করুন। শহর থেকে গ্রামের দিকে যাবেন না’। আর সরকার বলছে যেতে পারেন। কি পরিমান সমন্বয়হীনতা চলছে আর তার খেসরাত দিচ্ছে সাধারণ জনগণ।

আজ পর্যন্ত এই সংক্রমণের ৮৫ শতাংশ রোগী ছিলো ঢাকায়। এবার ঈদে ঢাকায় অবস্থানকারীদের গ্রামে যাওয়ার মধ্যে দিয়ে সংক্রমণ সমগ্র দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে যাবে। এটাই বাস্তবতা যে, মানুষ এতো কষ্ট করে বাড়ি যেয়ে কোনভাবেই তার চলাচল সীমিত রাখবেনা, নুন্যতম স্বাস্থ্যবিধি সে রক্ষা করবেনা। সরকার প্রথম থেকেই নতুন করে যখন আবার ছুটি ঘোষণা করে সেটি না করে লকডাউন জারি করতো এবং কঠোর অবস্থানে থাকতো তবে কোন ভাবেই জনগণের পক্ষে ঢাকার বাইরে বের হওয়া সম্ভব হতো না। সংক্রমণ বিস্তারের এই ক্ষেত্র তৈরি হত না। সরকার বাস্তব অবস্থা বিশ্লেষন করে কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছেনা। সবকিছুকে তারা হাইপোথেটিক্যালী জাজমেন্ট করছে।

সরকারের প্রতিটা পদক্ষেপ দেখে মনে হচ্ছে কিভাবে সংক্রমণ-মৃত্যুকে বাড়িয়ে নেওয়া যায় তার জন্য চেষ্টা করছে। এটা মনে হবার যৌক্তিক কারণ, দেখুন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক নাসিমা সুলতানা যখন বলছেন,‘ অনুগ্রহ করে সহযোগিতা করুন, সরকারের সব নির্দেশ মেনে চলুন এবং চলাচল বন্ধ রাখুন’। উনি এটা বলছেন অন্যদিকে একই সময়ে সরকার নির্দেশনা প্রদান করছে ব্যক্তিগত গাড়িতে ঢাকার বাইরে যাওয়া যাবে। যখন কিনা সরকার তার অধিদপ্তরের নির্দেশনা বাস্তবায়নের জন্য কার্যকর কঠোর পদক্ষেপ নিবে তার পরিবর্তে এমন নির্দেশনা জারি করছে যাতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনা উপেক্ষা করতে জনগণ মানসিকভাবে উৎসাহিত হয়।

যখন আমাদের প্রয়োজন অ্যাগ্রেসিভ টেস্টিং এবং কন্ট্রাক্ট ট্রেসিং করে রোগী খুঁজে বের করা। সেই মুহুর্তে সরকার এমন একটা পরিস্থিতি তৈরি করলো ট্রান্সমিশন এখন যে পর্যায়ে পৌছাবে তাতে প্রোপার টেস্ট এবং এতে মানুষের কন্ট্রাক্ট ট্রেস করা সম্ভব হবে না। দিন যতোই যাচ্ছে আমরা একটা ভয়াবহ চক্রের মধ্যে প্রবেশ করছি।

মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলছেন,‘ আমরা বারবার মানুষকে সর্তক করছি, জেনে বুঝে মানুষ আগুনে হাত দিলে সরকার কি করতে পারে’। হ্যাঁ সেটাই সরকারের আর কি করার আছে!! আপনারা একটার পর একটা আত্মঘাতী এবং স্ববিরোধী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এর দায় যে দিন শেষে একমাত্র জনগণের ঘাড়ের উপর দিবেন এটা গত একটা লেখাতেই (করোনা: সংক্রমণের দায়ভার এবার জনগণের উপর…) স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছিলাম। সেই বক্তব্যটাই আপনারা এখন ফেরি করছেন। আপনাদের সামনে অভিজ্ঞতা আছে, গার্মেন্ট কারখানা খোলা থেকে শুরু করে অদ্যবধি পর্যন্ত যে কয়টি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন এবং তার প্রেক্ষিতে যে সকল নির্দেশনা দিয়েছেন তার একটিও আংশিকভাবেও বাস্তবায়ন হয়নি। অর্থাৎ আপনাদের সিদ্ধান্ত বাস্তবসম্মত ছিলোনা। আর সেকারণেই নির্দেশনা বাস্তবায়নের জন্য যে সকল মেজার নেওয়া প্রয়োজন ছিলো সেটা নিতেও ব্যর্থ হয়েছেন। এই শহরে বিরোধী দলের গনতান্ত্রিক কর্মসুচিতে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে ব্যবহার করে রাস্তা থেকে উঠিয়ে দিয়েছেন, আবার ফেরি অচল করে ঢাকা শহরে ঢোকা বন্ধ করেছেন এসব নজির তো আছেই। অথচ এমন সর্বগ্রাসী মহামারি থেকে জনগণকে রক্ষা করার জন্য আপনাদের হাতে কোন টুলস থাকেনা, এর চেয়ে হাস্যকর আর কিছু হতে পারে না।

সরকার জীবিকার দোহায় দিয়ে যেসব আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলো পরিস্থিতি যা তৈরি করছে তাতে দিন যতো যাবে সেই অবস্থা থেকে বের হওয়া আরো কঠিন হয়ে গেলো। এই সময় পর্যন্ত সরকারের সামনে অর্থনীতি রক্ষার জন্য একমাত্র সম্ভবনার খাত ছিলো কৃষি। সর্বশেষ পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে সে খাত কেও ঝুঁকির মধ্যে নিয়ে গেলো। এখন গ্রামে আক্রান্ত হওয়া শুরু হবে। সমগ্র গ্রাম আক্রান্ত হয়ে পড়বে। সাথে সাথে কৃষি অর্থনীতির ক্ষেত্রটি ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। এমনিতেই জনস্বাস্থ্যর যে ক্ষতির সম্ভবনা তৈরি হয়েছে তা মোকাবেলা করে অর্থনীতিকে দাড় করানোর যে চ্যালেঞ্জ সরকার তৈরি করেছে তা থেকে মুক্তি অর্জন একটা দুসাধ্য ব্যাপার। অবশ্য এই সবটাই হয়েছে সরকারের দুরদর্শিতার অভাবে।

ঈদের মধ্যে যাতে সংক্রমণের বিস্তার না ঘটে তার জন্য সৌদিআরবে গতকাল থেকে কারফিউ জারি করা হয়েছে। একইসাথে দেশটির কোন মসজিদে ঈদের জামাত যাতে অনুষ্টিত না হয় সে বিষয়ে নির্দেশনা জারি করেছে। অন্যদিকে আমাদের দেশে যাতে সংক্রমণ বেশিমাত্রায় ছড়াতে পারে তার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। এই ঈদ আমাদের জীবনে ভয়ঙ্কর এক অভিশাপে রুপান্তরিত হলো, সরকারের ভুল সিদ্ধান্তে। একমাস আগে সংক্রমণের দিক দিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ছিলো ১৭০ বর্তমানে আমাদের অবস্থান ২৫ (ওয়ার্ল্ডোমিটার)। এমন পরিস্থিতিকালীন সময়ে সরকারের এই সিদ্ধান্তকে কিভাবে বিবেচনা করা উচিত!!

একটা আলোচনা জারি আছে, এই যুদ্ধে প্রধানমন্ত্রী একাই লড়াই করছেন। যা বর্তমান সময়ে একটা মারাত্বক ভুল পদক্ষেপ। অর্থনীতিবিদ অর্মত্য সেন বলছেন,‘Tackling a social calamity is not like fighting a war.’ তার এই কথার সুত্র ধরে বলা যায় একটি সামরিক যুদ্ধে একজন নেতা তার সমস্ত সামরিক শক্তি ব্যবহার করে এককভাবে নির্দেশ প্রদান করতে পারেন। তার জন্য অন্য কারো পরামর্শের প্রয়োজনীয়তা নেই। কিন্তু মহামারির মতো একটি সামাজিক দুর্যোগ মোকাবেলায় প্রয়োজন অংশগ্রহণমূলক প্রশাসন। অর্থাৎ বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রশ্নে সমাজের বিভিন্ন স্তর থেকে পরামর্শ গ্রহণ করা। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে আমরা তার বিপরিত চিত্র দেখছি। এখানে এককভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হচ্ছে। যার ফলশ্রুতিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ায় একের পর এক ভুল হচ্ছে ।

মহামারিকে মোকাবেলা করার ক্ষেত্রে এটিকে একটি যুদ্ধ হিসাবে মনে হলেও প্রচলিত যুদ্ধের কর্মকৌশল এর সাথে অনেক ভিন্নতা রয়েছে। সেই ভিন্নতা অনুযায়ি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সকল অংশিজনের অংশগ্রহণে একটি উচ্চতর রাজনৈতিক ফোরাম গঠন সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ কাজ। সামনে আমরা আরো বড় ধরনের বিপর্যয়ের মধ্যে ঢুকতে যাচ্ছি, তা থেকে উত্তরনের পথ এখনই যদি আমরা ঠিক করতে না পারি তাহলে আমাদের সামনে আর কোন সুযোগ অপেক্ষা করবেনা।

লেখক

আবু নাসের অনীক

সাবেক সভাপতি, বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রী

 

Sharing is caring!

Advisory Editor
Kazi Sanowar Ahmed Lavlu
Editor
Nurul Afsar Mazumder Swapan
Sub-Editor
Barnadet Adhikary 
Dhaka office
38 / D / 3, 1st Floor, dillu Road, Magbazar.
Chittagong Office
Flat: 4 D , 5th Floor, Tower Karnafuly, kazir deori.
Phone: 01713311758

পুরানো খবর

জুলাই 2020
শনি রবি সোম বুধ বৃহ. শু.
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031

ছবি ঘর

    WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com