Monday, 25/5/2020 | : : UTC+6
Green News BD

সবকিছু যখন শুধুই সংখ্যা…

সবকিছু যখন শুধুই সংখ্যা…

আবারো সাধারণ ছুটির প্রজ্ঞাপন ঘোষণার আগ পর্যন্ত কিছুটা আশাবাদী ছিলাম, সরকার নতুনভাবে কিছু চিন্তা করবে বর্তমাননাজুক অবস্থার প্রেক্ষিতে। বলা হয়েছিলো ছুটি ঘোষণার সাথে বেশ কিছু নতুন নির্দেশনা দেওয়া হবে, যা প্রজ্ঞাপনের পূর্বে উল্লেখকরা হয়েছিলোনা। মনের মধ্যে কিঞ্চিত আশা করে ছিলাম এবার হয়তো মাসের বাকি কটা দিন কঠোরভাবে লকডাউনের ঘোষণাআসবে সরকারের পক্ষ থেকে।

এই কিঞ্চিত আশার কারণ বলা যেতে পারে গত / দিন সরকারী দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতা মন্ত্রীরা বাস্তব অবস্থার নিরিখে যেধরনের বক্তব্য দিচ্ছিলেন (পূর্বের লেখায় উল্লেখ করেছি) তাতে মনে হয়েছিলো তাদের পরিকল্পনায় কিছু পরিবর্তন ঘটলেও ঘটতেপারে। কিন্তু না, ছুটির প্রজ্ঞাপনে উল্লেখিত শর্তে দেখলাম নতুন কিছু নাই, সবই আগের কথা এবং পরিস্থিতিটা আগের চাইতেআরো বেশি খারাপ। এক বাসা থেকে যদি আগে বের হতো একজন, এখন বের হচ্ছে পরিবারের ছোট বড় সবাই।

গতকাল স্বাস্থ্যমন্ত্রী আবারো বাণী দিয়েছেন,‘গত কয়েকদিনে গার্মেন্ট কারখানা দোকানপাট খুলে দেওয়া হয়েছে মানুষেরজীবিকার তাগিদে। এসব কারণে আক্রান্ত সংখ্যা কিছুটা বৃদ্ধি পাচ্ছে। হয়তো আরো কিছু বৃদ্ধি পেতেও পারে তবে এই বৃদ্ধিক্ষতিকর কিছু হবেনা  এই বক্তব্যের মধ্যে দিয়ে আমি যেটা বুঝেছি , আক্রান্তমৃত্যু বৃদ্ধি হবে এটা বুঝেই ওনারা সিদ্ধান্তগুলিবাস্তবায়ন করছেন। এই বৃদ্ধি পাওয়াকে সরকার কোন ঝুঁকি হিসাবে মনে করছেনা।

আমি নিজে চিন্তা করে দেখলাম, কখন এভাবে ভাবা সম্ভব হতে পারে, আমার চিন্তার ধরন কখন এমন প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতেপারে! এর উত্তর পেলাম, যখন আমি সমগ্র বিষয়কে শুধুমাত্র সংখ্যা দিয়ে বিবেচনা করবো। সংখ্যাটা কিসের, কি কারণে এটাযখন মাথার মধ্যে থেকে বের করে দিতে পারবো। অর্থাৎ সংখ্যাটা গরু, ছাগল, অন্য কোন জড়বস্তু না কি মানুষ এটা বিবেচনারমধ্যে থাকবেনা। শুধু থাকবে সংখ্যা। হ্যাঁ তখনই আমার পক্ষে অবলিলায় বলা সম্ভব হতে পারেতবে এই বৃদ্ধি ক্ষতিকর কিছুহবেনা।এটা আমার ভাবনা, আপনি এর সাথে একমত নাও হতে পারেন। কিন্তু আমি লজিক দিয়ে এটা বিবেচনা করে দেখেছি।

করোনাকালে এমনিতেই একটি সমস্যা সমাজে প্রকটভাবে দেখা দিয়েছে মানবিকতাবোধ লোপ পাওয়া। আমাদের মধ্যেই তোলোপ পাচ্ছে! সেক্ষেত্রে আমরা যেমন এই সমাজের মানুষ, আর যারা সবকিছু শুধু সংখ্যা দিয়ে বিবেচনা করছেন তারাও তো একইসমাজে বাস করা মানুষ। সুতরাং যে নেতিবাচক আচরনের বিষয়টি আমি উল্লেখ করলাম সেটি সবার মধ্যেই সংক্রামিত হতেপারে। কিন্তু যারা সমাজরাষ্ট্রের দায়িত্বে থাকেন তাদের যখন এই আচরণ প্রকাশ পায় তখন আমার মতো আমজনতার দুচোখজুড়ে নেমে আসে নিকষ কালো অন্ধকার। জনগণের সমস্ত আশাআকাংখার প্রদীপগুলো নিভে যায়। পড়ে থাকে অন্ধকার আরপুড়ে যাওয়া ছাই!

দেশের একজন খ্যাতিমান পন্ডিত ব্যক্তি জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান স্যার গতকাল বিকালে হাসপাতালে চিকিৎসাধীনঅবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছেন করোনা পজিটিভ নিয়ে। কিন্তু উনি  করোনা পজেটিভ ছিলেন এটা বোঝা গেছে ওনার মৃত্যুর পরশরীর থেকে নমুনা সংগ্রহ করে। খবরে প্রকাশ জীবিত থাকা অবস্থায় সকালেও নমুনা সংগ্রহ করা হয়।

অন্যান্য রোগের সাথে উনি ফুসফুসের সংক্রমণে ভুগছিলেন। ইতিপূর্বে তিনি যে সমস্ত হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছিলেন বাসর্বশেষ যেখানে তার চিকিৎসা হয়েছে সেখানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নির্দেশিতট্রায়াজমেথড কার্যকর থাকলে ফুসফুসের সংক্রমণের ধরনের রোগীর আরো আগেই করোনা পরীক্ষা হবার কথা তাতে তার উপসর্গ থাকুক আর না থাকুক। কিন্তু তার হয়নি। আরযদি হয়ে থাকে, রিপোর্ট নেগেটিভ হয় তবে বুঝতে হবে পরীক্ষায় সমস্যা হয়েছে, হতে পারে নমুনা সংগ্রহে সমস্যা ছিলো। বাস্তব চিত্রঅধিকাংশ হাসপাতালেট্রায়াজমেথড এখনও বাস্তবায়ন করা হচ্ছেনা, বেশি বেশি চিকিৎসক আক্রান্ত হবার এটিও একটিঅন্যতম কারণ। অর্থাৎ চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় সমস্যা ছিলো।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী একটা সরকারী কর্মসুচিতে অংশগ্রহণের সময় বলেন, ‘উন্নত দেশের সঙ্গে তুলনা করলে আমাদের স্বাস্থ্য সেবাবিভাগ যথেষ্ঠ দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে।  আমরা এটা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করে ফেলেছি আমি জানিনা কোন যুক্তিবলে এভাবেমূল্যায়ন করা যায়। তবে দেশের একজন সচেতন সাধারণ নাগরিক হিসাবে আমি যখন দেখি জাতীয় অধ্যাপকের করোনাপজেটিভ বোঝা যায় মৃত্যুর পর, যখন দেখি সিটি কর্পোরেশনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বারবার চেষ্টা করেও মৃত্যুর আগে করোনারনমুনা পরীক্ষা করতে ব্যর্থ হয়ে, হাসপালে ভর্তি হতে না পেরে বিনা চিকিৎসায় মারা যাবার পর করোনা পজেটিভ বোঝা যায়, যখনদেখি একজন অতিরিক্ত সচিব সাত হাসপাতাল ঘুরে কোথাও ঠায় না পেয়ে অষ্টমবারের চেষ্টায় হাসপাতালে ভর্তি হন তখনআইসিইউ সাপোর্টের অভাবে তার মৃত্যু। যারা রাষ্ট্রের কাছে এতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি তাদের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার নমুনা যদি এইহয় তবে প্রান্তিক মানুষের দুর্ভোগের অবস্থা আলোচনা না করলেও বোঝা যায়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তখন আপনার বক্তব্যেরসাথে দ্বিমত করা ছাড়া অন্য কোন উপায় থাকেনা। কারণ বিবেচনা করতে হয় যুক্তি দিয়ে।

স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে স্বাচিপের সভাপতি অধ্যাপক ডাঃ ইকবাল আর্সলান বলেন,‘কোভিড সম্পর্কে বিন্দুমাত্র ধারনা নাথাকা, বাস্তব সম্মত সিদ্ধান্ত না নেওয়া সময় পেয়েও প্রস্তুতি ছাড়া যুদ্ধের ময়দানে নামায় আজ এই বিপর্যয় পরিস্থিতি ক্রমেইখারাপের দিকে যাচ্ছে। এখন আমরা মুখোমুখি যুদ্ধে অবতীর্ণ। এখানে কৌশল বলে আমাদের কিছু নেই

স্বাস্থ্য অব্যবস্থাপনার আর একটি চিত্র করোনায় আক্রান্ত মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক বেশ করেকটি গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যেরসাথে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যের ব্যাপক অমিল। গণমাধ্যমগুলে তাদের তথ্য সংগ্রহ করেছে গোরস্থান শ্মশান কর্তৃপক্ষের কাছথেকে। প্রেক্ষিতে অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক নাসিমা সুলতানা বলেন,‘আমরা হাসপাতাল থেকে যে রিপোর্ট পাইতার ভিত্তিতেই করোনা আক্রান্ত  হয়ে মৃতের সংখ্যা সংকলন করা হচ্ছে কোন রোগী যদি হাসপাতালে না এসে বাড়িতে মারা যায়বা হাসপাতাল থেকে বাসায় যাবার পর মৃত্যু হয় তার কোন রিপোর্ট তাদের কাছে নেই। বিষয়ে অবলীলাক্রমে তিনি বলেন,‘কেওযদি তথ্য না দেয় তাহলে আমরা কি করে সেটা জানবো এটা ভাবতেই বিস্ময় লাগে যে, এটা জানার জন্য কোন মেকানিজমতারা তৈরি করেনি।  আর সেই স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দক্ষতায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী প্রকাশ্যে সন্তোষ প্রকাশ করছেন!!

আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা এতো সুন্দর এবং দক্ষ যে, গত দিনে হাসপাতাল থেকে অনুমোদন ছাড়াই চলে গেছেন ৬৬ জনরোগী।  বিশেষজ্ঞদের অভিমত রোগী হাসপাতাল থেকে চলে যাচ্ছেন অব্যবস্থাপনার কারণে।

বর্তমানে ১০ লাখে মানুষের মধ্যে গড়ে ৮৭৮ জনের করোনাভাইরাস পরীক্ষা হচ্ছে।  যা দেশের মোট জনসংখ্যার তুলনায় খুবইকম। এই পরীক্ষার হার দঃ এশিয়ার টি দেশের মধ্যে আফগানিস্তান ছাড়া অন্য  দেশের নিচে। ভারত, পাকিস্তান, সিঙ্গাপুর, ফিলিপাইন, সৌদিআরব গুন বেশি পরীক্ষার হার। দেশের মোট পরীক্ষাগারের অর্ধেক যথাযথভাবে কাজে লাগানো যাচ্ছে আরবাকি অর্ধেক কাজে লাগানো যাচ্ছেনা দক্ষ জনবলের অভাবে। অথচ দেশে প্রায় ৩০ হাজার বেকার দক্ষ মেডিক্যাল টেকনোলজিষ্টবসে আছেন কাজের অভাবে। এইতো আমাদের দক্ষ স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা!

নতুন করে ছুটির শর্তনামায় যান চলাচল কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণের ঘোষণায় শিমুলিয়া আরিচা ঘাটে গাড়ি মানুষের চাপদুটোই বেড়ে গেছে।  কোন জায়গাতে নিয়ন্ত্রণ কাজ হচ্ছেনা, অবশ্য সরকারও এটা জানে কাজ হবেনা। নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টাও তারনেই। ভারত থেকে যারা প্রতিদিন দেশে আসছেন তাদের জন্যও প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিন বাতিল করা হয়েছে। কোন জায়গাতেস্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার নজির দেখা যাচ্ছেনা। সরকার বলা চলে সবকিছুতে নির্লিপ্ত হয়ে গেছে। প্রকৃতপক্ষে যখন সবকিছু সংখ্যাহয়ে যায়, আর সংখ্যাটি কিসের এটা বিবেচনা থাকেনা তখন সে নির্লিপ্ত ভাবেই সবকিছু দেখে!

কিন্তু আমরা নির্লিপ্ত হতে পারছিনা। সংবিধানের ১১ নং অনুচ্ছেদ অনুসারে দেশের সকল নাগরিকের জানমাল রক্ষার দায়িত্বসরকারের, জীবিকা রক্ষার কথা বলে জীবনকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া সুস্পষ্টভাবে সংবিধানের লঙ্ঘন।  আত্মঘাতী সিদ্ধান্তথেকে সরে এসে সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করুন, নাগরিকের জীবন রক্ষা করুন।

লেখক

আবু নাসের অনীক

সাবেক সভাপতি, বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রী

Sharing is caring!

Advisory Editor
Kazi Sanowar Ahmed Lavlu
Editor
Nurul Afsar Mazumder Swapan
Sub-Editor
Barnadet Adhikary 
Dhaka office
38 / D / 3, 1st Floor, dillu Road, Magbazar.
Chittagong Office
Flat: 4 D , 5th Floor, Tower Karnafuly, kazir deori.
Phone: 01713311758

পুরানো খবর

মে 2020
শনি রবি সোম বুধ বৃহ. শু.
« এপ্রিল    
 1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
3031  

ছবি ঘর

    WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com