Monday, 25/5/2020 | : : UTC+6
Green News BD

করোনা: জীবন ও জীবিকার দ্বন্দ্ব

করোনা: জীবন ও জীবিকার দ্বন্দ্ব

করোনাকালে এখন ঘুরে ফিরে একটি বিষয় সামনে আসছে,‘জীবন জীবিকা এই বির্তকটি চলছে বিশ্বব্যাপী। তারধারাবাহিকতায় আমাদের দেশেও সেটা জারি আছে। বিশ্বব্যাপী পুঁজিতান্ত্রিক অর্থ ব্যবস্থায় পরিচালিত রাষ্ট্রগুলি জীবিকাকেঅধিকতর গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। ফলাফলে ইতিমধ্যে নতুন করে সংক্রমণের হার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

জীবন জীবিকাএর প্রেক্ষিতে  অত্যন্ত পরিষ্কারভাবেই বলতে চাই জীবিকার আগে জীবন। জীবন যদি না থাকে তবে জীবিকারতো আদৌও কোন প্রয়োজন নেই, শধু তাই নয় রাজনীতিঅর্থনীতি সবকিছুই মূল্যহীন। পৃথিবীতে যা কিছু কর্মকান্ড সব কিছু তোজীবনকে ঘিরে। জীবিকা যদি না থাকে তবে জীবন সংশয়ের মধ্যে পড়লেও সেটি কাটিয়ে উঠে নতুনভাবে ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব।কিন্তু যে জীবন অবহেলার কারণে চলে যাবে তাকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।

আজকে পৃথিবীব্যাপী যে করোনা সংকট তৈরি হয়েছে তার দায় এই পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থার। মুনাফা, মুনাফা আর মুনাফা করতেযেয়ে পৃথিবীর জীববৈচিত্র ধ্বংস করে, প্রকৃতিকে বিনাশ করে, এমন একটা দুর্যোগপূর্ণ সময়ে এনে দাঁড় করিয়েছে তাবৎ পৃথিবীরমানুষকে। শুধু তাই নয়, এই অবস্থাতাতেও মানুষের জীবনকে মূল্যহীন করে জীবিকার ধোঁয়া তুলে লক্ষ লক্ষ মানুষকে মৃত্যুর মুখেঠেলে দিচ্ছে। এটা অস্বীকারের কোন সুযোগ নেই যে, জীবনকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনার জন্য জীবিকার ব্যবস্থা করাএটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাবনা।  তবে এই ভাবনা বাস্তবায়নের জন্য যে বিষয়গুলি বিবেচনা করা প্রয়োজন সেটা চিন্তা করেইসিদ্ধান্তগুলো গ্রহণ করতে হবে।

অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় আমাদের সরকার সেসব নিয়ে ভাবতে নারাজ। নারাজ বলেই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ উপেক্ষাকরে একটির পর একটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে জনস্বাস্থ্যকে হুমকির দ্বার প্রান্তে এনে উপনিত করেছে। লকডাউন শিথিলকরার জন্য মরিয়া হয়েছে। শিথিল করার ফলাফল আজকে আক্রান্তের সংখ্যা হাজার ১৮৬ মাত্র! মৃত্যু ১৯ জন মাত্র! কি বলেনমহাশয়েরা!! রোগতত্ত্ব বিশেষজ্ঞ ডাঃ অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, ‘যা সংক্রমণের সংখ্যা বলা হচ্ছে এটাই সংক্রমণের প্রকৃতচিত্র না। পরীক্ষা যখন বেশি হবে তখনই প্রকৃত চিত্র বোঝা যাবে গতকাল পরীক্ষার সংখ্যা ছিলো হাজার ৯০০। যেখানেবিশেষজ্ঞরা বলছেন প্রতিদিন এই মুহুর্তে পরীক্ষা হওয়া প্রয়োজন ১৫ থেকে ২০ হাজার তাহলে চিত্র কিছুটা বোঝা সম্ভব হবে।

নিশ্চয় দিনের পর দিন লকডাউন করে রাখা সম্ভব নয়, কিন্তু সেটি শিথিল বা তুলে নেওয়ার জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইনযদি অনুসরন করা না হয় তবে তার মূল্য দিতে হবে মানুষের আক্রান্ত হওয়া মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে। আমরা সেই গাইডলাইন অগ্রাহ্যকরেই লকডাউন শিথিল করেছি এবং যার মূল্য দেওয়া ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে।

সরকারের নীতিনির্ধারকদের ভাবতে হবে, লকডাউন শিথিল করে ওনারা যে পরিমান আর্থিক ক্ষতি পোষাতে চাচ্ছেন তারতুলনায় শিথিল করার ফলে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় যে পরিমান অর্থ নতুনভাবে বিনিয়োগ করতে হবে তার পরিমান কতো হবে।অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে সেই বিনিয়োগের পরিমান হবে কয়েক গুন বেশি। শিথিলের ফলে যে পরিমান মানুষ অতিরিক্ত আক্রান্ত হবেতাদের চিকিৎসা ব্যয় (অবকাঠামো, চিকিৎসক, ঔষধ) বেশি না গার্মেন্ট কারখানা খুলে দেওয়ার ফলে যে আয় হচ্ছে সেটি বেশি!! আক্রান্ত মানুষ চিকিৎসা না পেলে মৃত্যু আরো বাড়তে থাকবে। এই মৃত্যুর কারণে যে দক্ষ জনশক্তি (ডাক্তার, পুলিশ, সেনাবাহিনীসদস্য, সাংবাদিক, গার্মেন্ট কর্মীসহ অন্যান্য পেশাজীবী) দেশ হারাবে তার ক্ষতি বেশি না কি দোকানপাট খুলে দিয়ে যে আয় হচ্ছেতার পরিমান বেশি! হ্যাঁ, এগুলো বিশ্লেষন করতে হবে। আর এসব বিশ্লেষন করলে পরিষ্কার বোঝা যাবে, যে অর্থনীতি রক্ষার কথাবলে আপনারা এসব করছেন তার চুড়ান্ত ফলাফলে ক্ষতির ভাগটাই হবে বেশি।

দেশে ইতিমধ্যে স্বাস্থ্য কর্মী আক্রান্ত হয়েছেন হাজার ৫১৫ জন (চিকিৎসক ৫৮৭, নার্স ৩৯০ অন্যান্য ৫৩৮ জন), মৃত্যু বরণকরেছেন জন চিকিৎসক। পুলিশ আক্রান্ত হয়েছেন হাজার ৮৭৮ জন, মৃত্যুবরণ করেছেন জন, র‌্যাবের আক্রান্ত হয়েছেন৫৬ জন। সরকারকে এখনই বিবেচনা করতে হবে আগামী ১৪ দিন লকডাউন শিথিল রাখার কারণে জনস্বাস্থ্যের যে বিপর্যয় ঘটবেতার আর্থিক ক্ষতি বেশি, না লকডাউন কঠোরভাবে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে  মানুষকে ঘরে রাখার জন্য যে আর্থিক সহযোগিতা প্রদানকরতে হবে তার পরিমান বেশি!!

মানীয় গণ আপনাদের কথার মধ্যে দিয়ে কিন্তু এটা ইতিমধ্যে বোঝা গেছে লকডাউন শিথিল করে আপনারা কি ধরনের বিপর্যয়কে আমন্ত্রণ করে এনেছেন। সরকারী দলের সাঃ সম্পাদক মাননীয় সেতুমন্ত্রী ওবাযদুল কাদের বলেছেন,‘বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ স্পষ্টত বাড়ছে, গার্মেন্ট শিল্প, বাণিজ্য কেন্দ্রসহ চালু করা প্রতিষ্ঠানে সর্বত্র স্বাস্থ্যবিধি, সামাজিক দুরত্ব শারীরিক দুরত্ব কঠোরভাবে মেনে চলার আহ্বান উপেক্ষিত হচ্ছে জ্বী জনাব, দেশের স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ থেকে শুরু করে আমাদেরমতো আমজনতা এটা আগেই জানতাম আহ্বান উপেক্ষিত হবে। কারণ বাস্তবতা উল্লেখ করে বারে বারেই বলা হয়েছে এতো অল্পসময়ের মধ্যে কোন প্রকার প্রস্তুতি নিশ্চিত না করে লকডাউন শিথিল করার ফলাফল এমনই হবে। বাস্তবে হয়েছেও তাই, যাআপনাদের বক্তব্যের মাধ্যমে স্বীকৃতি পাচ্ছে।

মাননীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী আবারো বাণী দিয়েছেন,‘করোনায় ইউরোপআমেরিকার তুলনায় বাংলদেশ ভালো এই ভালোর নমুনাহলো যুক্তরাষ্ট্র  পর্যন্ত টেস্ট করেছে ৯৯ লক্ষ ৩৫ হাজার ৭২০, যুক্তরাজ্য করেছে ২০ লক্ষ হাজার ১৪৬, ইটালি করেছে ২৬ লক্ষ৭৩ হাজার ৬৫৫, ফ্রান্স করেছে ১৩ লক্ষ ৮৪ হাজার ৬৩৩। আর আপনি করেছেন লক্ষ ৪৪ হাজার ৫৩৮। হিসাব খুব সোজাযতো টেস্ট কম হবে আক্রান্তের সংখ্যাও কম থাকবে! ইউরোপআমেরিকার তুলনায় ভালোই থাকবেন! সেটাই আপনাদের সুখ! কিন্তু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, টেস্ট, টেস্ট আর টেস্ট এর কোন বিকল্প নেই।

আপনাদের কথা খন্ডন করাও তো বিপদ যে পরিমান মানীমানুষ আপনারা! করোনাকালে যেখানে অবাধ তথ্য নিশ্চিত করারকথা বলা হচ্ছে সেখানে আপনারা সরকারের বাইরে যেমন কোন তথ্য আমলে নিচ্ছেন না একইভাবে নুন্যতম সমালোচনাও গ্রহণকরতে পারছেন না। অথচ দেখুন, ১৯৭২ সালের আজকের দিনে (১৩ মে) বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবিসি প্রতিনিধি পিটারজেনিংস এর সঙ্গে এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে বলেন,‘সমালোচকেরা সব সময়েই রয়েছে। আমি গনতন্ত্রে বিশ্বাসী। আমার  নীতিরআলোচনা সমালোচনা করার অধিকার আমি তাদের দিয়েছি। সমালোচনায় আমার আপত্তি নেই।দেখুন, ওনার আপত্তি নাথাকলেও আমাদের এখনকার মানীয় গণের তীব্র আপত্তি রয়েছে। তাহলে কি ধরে নিবো আপনারা বঙ্গবন্ধুর চাইতেও উচ্চতর স্তরেপৌঁছে গেছেন।

জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী বলেন,‘বিভিন্ন কারণে সকরকার স্বাস্থ্যবিধি মেনে সীমিত পরিসরে মার্কেট শপিংমল খোলার অনুমতিদিয়েছিল। কিন্তু সাধারণ মানুষ এই অনুমতির কোন শর্তই মানছেনা এছাড়াও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য মতে পরিস্থিতি ক্রমান্বয়েখারাপের দিকে যাচ্ছে। অবস্থায় খুলে দেওয়া মার্কেট, শপিংমল আবার বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।সেটিও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞগণ আপনাদেরকে সতর্ক করে বলেছিলেন, এগুলো খুলে দেওয়া ঠিক হবেনা কিন্তু মতামতকে উপেক্ষাকরেছেন।

ইতিমধ্যে ৩০ মে পর্যন্ত সাধারণ ছুটি বাড়ানোর নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে। কিন্তু এই সাধারণ ছুটি ঘোষণাকালীন সময়েলকডাউনের শিথিলতা প্রত্যাহার করতে হবে। গার্মেন্ট কারখানা সহ দোকানপাট শপিংমল সব কিছু বন্ধ করে দিতে হবে। অর্থাৎলকডাউন বলতে যা বোঝায় আক্ষরিক অর্থে সেটিই পালন করতে হবে। সরকার ইতিপূর্বে কেন্দ্রীয়ভাবে দেশে আনুষ্ঠানিকভাবেলকডাউন ঘোষণা করে নাই। এবার মানুষকে রক্ষা করতে হলে এই ঘোষণা দিতে হবে। সংক্রামক রোগ (প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ নির্মূল আইন)-২০১৮এর ধারা (), () এবং (১১) এর () () ধারা পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন করতে হবে। লকডাউন বাস্তবায়নেরলক্ষে প্রান্তিক মানুষকে সরকারী সহযোগিতা প্রদান করতে হবে যাতে তারা জীবিকার প্রয়োজনে বাইরে বেরিয়ে না আসে।

মাননীয় গণ, শুধুমাত্র গার্মেন্ট কারখানার মালিকদের স্বার্থ রক্ষা করাই আপনাদের একমাত্র কাজ নয়। দেশের মানুষকে রক্ষাকরার সাংবিধানিক দায়িত্ব আপনাদের। সেই দায়িত্বটুকু যথাযথভাবে পালন করুন। ইতিহাসের আস্তাকুড়ে যাতে নিক্ষিপ্ত হতে নাহয়, সেখান থেকে নিজেদের রক্ষা করুন।

লেখক

আবু নাসের অনীক

সাবেক সভাপতি, বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রী

Sharing is caring!

Advisory Editor
Kazi Sanowar Ahmed Lavlu
Editor
Nurul Afsar Mazumder Swapan
Sub-Editor
Barnadet Adhikary 
Dhaka office
38 / D / 3, 1st Floor, dillu Road, Magbazar.
Chittagong Office
Flat: 4 D , 5th Floor, Tower Karnafuly, kazir deori.
Phone: 01713311758

পুরানো খবর

মে 2020
শনি রবি সোম বুধ বৃহ. শু.
« এপ্রিল    
 1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
3031  

ছবি ঘর

    WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com