Thursday, 28/5/2020 | : : UTC+6
Green News BD

খাদ্য সংকটে লোকালয়ে বন্য প্রাণিরা, বাড়ছে বন্য হাতি হত্যা এবং মানুষের অপমৃত্যু

খাদ্য সংকটে লোকালয়ে বন্য প্রাণিরা, বাড়ছে বন্য হাতি হত্যা এবং মানুষের অপমৃত্যু

পার্বত্য জেলা বান্দরবানের পাহাড়ে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের পাশাপাশি রয়েছে অসংখ্য বন্যপ্রাণি। আবাসস্থল এবং খাদ্য সংকট দেখা দেওয়ায় পাহাড়ের বন্য প্রাণিরা নেমে আসছে লোকালয়ে। জীবিকার তাগিদে মানুষ পাহাড়ের অরণ্যে বন্যপ্রাণির আবাসস্থলগুলোতে ঠিকানা গাড়ছে। গড়ে তুলছেন বাগান, খামার বাড়ি সহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক অবকাঠামো। পাহাড়ে মানুষের বিচরণ বেড়ে যাওয়ায় বন্য হাতির আবাসস্থল এবং খাদ্য সংকটের মুখে পড়েছে। ফসলের গন্ধে খাদ্যের সন্ধানে লোকালয়ে নেমে আসছে বন্য হাতিরা। পাহাড়ে ফসল-ঘরবাড়ি রক্ষায় মানুষ এবং খাদ্য, আবাসস্থল রক্ষায় বন্য হাতিরা একে-অপরকে হত্যায় মেতেছে! বান্দরবান সহ আশপাশের এলাকাগুলোতে।

বনবিভাগ, জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয়রা জানায়, জেলার সাতটি উপজেলার মধ্যে বান্দরবান সদর, লামা, নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলায় একের পর এক বন্য হাতি মারা যাচ্ছে। বন্য হাতির মূল্যবান দাঁত চুরি করতে বন্য হাতি হত্যায় মেতেছে বনদস্যুর একটি চক্র। ফলজ বাগান-ক্ষেতের ফসল রক্ষা এবং প্রাণ বাঁচাতেও বৈদ্যুতিক শর্ট ও গুলি করে বন্য হাতি হত্যা ঘটনাও বাড়ছে এই অঞ্চলে। অপরদিকে আবাসস্থল এবং খাদ্য সংকট তৈরি হওয়ায় লোকালয়ে নেমে মানুষ হত্যায় মেতেছে বন্য হাতিরা। রাতের আধাঁরে দল বেঁধে পাহাড় থেকে নেমে আসা বন্য হাতিরা পাহাড়ের মধ্যে গড়ে তোলা মানুষের ঘরবাড়ি-ফসলী জমি ভেঙে তচনছ করে দিচ্ছে মুহূর্তে। পাহাড়ে হাতি এবং মানুষ দুজনই একে-অপরের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে ঠিকে থাকছে পার্বত্য এই জনপদে।

সরকারি-বেসরকারী সূত্রে পাওয়া তথ্যমতে, ২০০১ সাল থেকে গত আঠারো বছরে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার এবং তিন পার্বত্য জেলায় বন্য হাতি মারা গেছে ৯০টি। আর গত দশ বছরে শুধুমাত্র বান্দরবান জেলায় মারাগেছে ১৪টি বন্য হাতি। এরমধ্যে ২০১৯ সালেই মারা গেছে পাঁচটি বন্য হাতি। তারমধ্যে নভেম্বর মাসে লামা উপজেলার ফাসিয়াখালী ইউনিয়নের হরিরঞ্জন বাবুর রাবার বাগানে ১টি, কুমারী ইসকাটার ঝিরি এলাকায় ১টি এবং ইয়াংছা চাককাটা ঝিরি এলাকায় ১টি এবং এপ্রিল মাসে বান্দরবান সদর উপজেলার সূয়ালক ইউনিয়নের প্রান্তিক লেক পর্যটন কেন্দ্রের লেকের পানিতে ১টি, সেনাবাহিনীর ফায়ারিং রেঞ্জের অভ্যন্তরে কদুখোলায় ১টি। ২০১৭ সালে নভেম্বর মাসে নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার মিয়ানমার সীমান্তে মাইন বিস্ফোরণে ১টি বন্য হাতির মৃত্যু হয়। ২০১৪ সালের জানুয়ারি মাসে নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার দোছড়ি ইউনিয়নের ফুলতলী গ্রামের ছুইন্যা ঝিরি ১টি এবং লামা উপজেলার ফাসিয়াখালী ইউনিয়নের ইয়াংছাঝিড়ি এলাকায় ১টি বন্য হাতিকে হত্যা করা হয়। মৃত হাতি দুটির মূল্যবান দাঁত চুরি করে নিয়ে যায় বনদস্যুরা। এর আগে ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার মিয়ানমার সীমান্তবর্তী ফুলতলী এলাকায় গুলি করে ১টি বন্য হাতি হত্যা করা হয়। হত্যার পর বন্যহাতির মূল্যবান দুটি দাঁত চুরি করে নিয়ে যায় বনদস্যুরা। ২০১২ সালের এপ্রিল মাসে নাইক্ষ্যংছড়ি বন বিভাগের আওতাধীন তুলাতলী ফরেস্ট রেঞ্জের মিয়ানমার সীমান্ত অঞ্চলের রেখাসিয়া ঝিরি এলাকায় ১টি এবং লামা-লোহাগাড়া সীমান্তবর্তী অঞ্চলে ১টি বন্য হাতিকে গুলি করে হত্যা করে বনদস্যুরা। হত্যার পর বন্য হাতির মূল্যবান দাঁত চুরি করে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। এর আগে ২০১০ সালে নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার বাইশারী ইউনিয়নের কাগজিখোলা এবং ঈদগড় এলাকায় ২টি বন্য হাতিকে গুলি করে হত্যা করা হয়। মৃত হাতির মূল্যবান দাঁতগুলো চুরি করে নিয়ে যায় বনদস্যুরা। ২০০৯ সালে বান্দরবানের পাশ্ববর্তী কেওচিয়া বন গবেষণা কেন্দ্রের অভ্যন্তরে ১টি মৃত বন্য হাতি পাওয়া যায়। ধারণা করা হয় বন্য হাতির মৃতদেহ’টি খালের পানিতে বান্দরবানের হলুদিয়া থেকে ভেসে যায়। এগুলোর মধ্যে গুলি করে এবং বৈদ্যুতিক ফাঁদ পেতে বন্য হাতি হত্যার ঘটনা সবচেয়ে বেশি।

বন্য হাতিদের হত্যার বিষয়টি নিশ্চিত করে বন বিভাগের লামা রেঞ্জ কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন খান বলেন, বৈদ্যুতিক ফাঁদ পেতে বন্য হাতির একটি বাচ্চা হত্যা করা হয়েছে। ময়না তদন্তের রিপোর্টে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। অপরাধী কৃষক আবদুল্লাহর বিরুদ্ধে বন্য প্রাণি (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন ২০১২ এর ৩৬ (১) ধারায় লামা থানায় একটি মামলা করা হয়েছে।

অপরদিকে বন্য হাতির আক্রমণে গত দশ বছরে বান্দরবানের লামা, নাইক্ষ্যংছড়ি এবং সদর তিনটি উপজেলায় দুই শতাধিকেরও বেশি মানুষ মারা গেছে। যাদের অধিকাংশই হচ্ছে শিশু এবং নারী। এছাড়াও হাতির আক্রমণে আহত হয়েছে কয়েক শতাধিক মানুষ। বন্য হাতিরা ভাংচুর করে লন্ডভন্ড করে শতশত ঘরবাড়ি এবং হাজার হা্‌জার একর ফসলী জমি ও ফলজ-বনজ সৃজিত বাগান। অপরদিকে প্রাণ বাঁচাতে সাধারণ মানুষ এবং বন দস্যুরা বন্য হাতি হত্যায় মেতে উঠেছে। চলতি বছর নভেম্বর মাসে লামার ফাসিয়াখালী ইউনিয়নের বড় ছন খোলায় বন্য হাতির আক্রমণে মারা গেছে শ্রমিক নূরুল ইসলাম (৬০)। অক্টোবর মাসে সূয়ালক ইউনিয়নের কাইছতলী তুলাতলী গ্রামের কৃষক আব্দুর রহমান (৩৪) এবং ভাগ্যকূল গ্রামের কৃষক মো: শফিক (৪৬)। মে মাসে নাইক্ষ্যংছড়ি সোনাইছড়ি ইউনিয়নের কৃষক মাছাই মারমা (৫২)।

এদিকে বন্য হাতিসহ বন্য প্রাণি রক্ষায় এবং মানুষের প্রাণ বাঁচাতে ২০০৪ সালে তৎকালীন বিএনপি সরকারের আমলে বান্দরবানের লামা উপজেলার ফাসিয়াখালীতে বন্য প্রাণির অভয়াশ্রম তৈরির উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। কিন্তু নানা অজুহাতে প্রকল্পটি আলোর মুখ দেখেনি। শুধুমাত্র কাগজে কলমে এবং আইনশৃঙ্খলা সভার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে। পরবর্তীতে জীব বৈচিত্র সংরক্ষণ এবং বন্যপ্রাণির অভয়ারণ্য প্রতিষ্ঠার (Wildlife Sanctuary) লক্ষ্যে হ্লাফসু মারমা হেডম্যানের দায়ের করা জনপ্রতিনিধিত্বমূলক মামলায় বন্য প্রাণি ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিশেষজ্ঞদের অভিমতের ভিত্তিতে বান্দরবানের তৎকালীন যুগ্ম জেলা জজ মোহাম্ম্মদ আসাদুজ্জামান খানের আদালত মাতামুহুরী রিজার্ভ বনাঞ্চলকে বন্যপ্রাণির অভয়ারণ্য ঘোষণার আদেশ দেন। কিন্তু তারপরও দীর্ঘ ১৫ বছরেও লামায় বন্যপ্রাণির অভয়াশ্রম তৈরির প্রকল্পটি লাল ফিতায় বন্দি রয়েছে।

স্থানীয়দের দাবী, অভয়াশ্রম প্রকল্পটির দ্রুত বাস্তবায়ন এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা গুলো থেকে বসবাসকারীদের অন্যত্র পুনর্বাবাসনের।

ফাসিয়াখালী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জাকির হোসেন মজুমদার বলেন, কয়েক বছরে ৬টি বন্য হাতি মারা গেছে ফাসিয়াখালীতে। হাতির আক্রমনে মানুষের মৃত্যুর সংখ্যাও অর্ধশতাধিকের কম নয়। পাঁকা ধানের গন্ধে ধান পাকার মৌসুমে হাতির আক্রমন বেড়ে যায়। হাতির ভয়ে লোকজন রাত জেগে পাহারা দেয়। গাছের উপরে তৈরি মাচাং ঘরে ঘুমান।

লামা বিভাগীয় বনকর্মকর্তা (ডিএফও) এস.এম কাইছার বলেন, মাতামুহুরী-সাঙ্গু রিজার্ভ ফরেস্ট’কে বন্য প্রাণির অভয়ারণ্য ঘোষণা করা হয়েছিল। একটি গেজেট প্রকাশের পর পরবর্তীতে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি, সেটি কাগজে-কলমের মধ্যে সীমাবদ্ধ আছে। বান্দরবান, লামা এবং কক্সবাজার ফরেস্ট বিভাগের আওতাধীন বান্দরবান সদর, লামা ও নাইক্ষ্যংছড়ি তিনটি উপজেলায় বন্য হাতি মৃত্যুর ঘটনা বাড়ছে। বন্য হাতির আক্রমণে মানুষও মারা যাচ্ছে প্রায় সময়। গত দশ বছরে শুধুমাত্র লামা বনবিভাগের আওতাধীন অঞ্চলে মারা গেছে ৯টি বন্য হাতি। মানুষ মারা গেছে ৪৫ জন। আহত হয়েছে শতাধিক লোকজন। তারমধ্যে ক্ষতিগ্রস্তদের ১৭ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়েছে। বনকর্মকর্তার দাবি, আবাসস্থল, খাদ্য সংকট এবং বন্য হাতি চলাচলের পথগুলোতে অবকাঠামো নির্মাণের ফলে বন্য হাতিরা লোকালয়ে নেমে তাণ্ডব চালাচ্ছে। ফাসিয়াখালী ইউনিয়নের সরকারী খাস জমিগুলোতে বন্য প্রাণীর অভয়ারণ্য গড়ে তোলে কলা গাছ লাগানো’সহ বন্য প্রাণির খাদ্য চাহিদা মেটানোর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করা হলে বন্য প্রাণি এবং মানুষ উভয়ের প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব হবে।

চট্টগ্রামের বন্য প্রাণি ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এ.এন মো: ইয়াছির নেওয়াজ বলেন, একটি বন্য হাতি প্রতিদিন ৬০ কিলোমিটার পথ চলতে পারে। কিন্তু হাতি চলাচলের রাস্তা এবং বিচরণ ভূমি বনগুলো ক্রমশ দখল হয়ে যাচ্ছে। বন্য হাতিরা স্বাভাবিকভাবে চলাচল করতে পারছে না। ফাসিয়াখালী’কে বন্য প্রাণীর অভয়ারণ্য ঘোষণা করা হলেও অঞ্চলটি সম্পূর্ণ অরক্ষিত। বনের ভিতরে রাস্তা এবং অবকাঠামো নির্মাণ হচ্ছে। বন্য প্রাণির আবাসস্থল এবং খাদ্য সংকট তৈরি হয়েছে। সংকটাপন্ন অবস্থায় পড়েছে বন্য হাতির সংখ্যাও। চট্টগ্রাম অঞ্চলে গত আঠারো বছরে ৯০টি বন্য হাতি মারা গেছে। হাতি মৃত্যুর ঘটনা সাম্প্রতিক সময়ে বেড়ে গেছে।

তিনি আরও বলেন, বন্য হাতি এবং মানুষ রক্ষায় আমরা জনসচেতনা মূলক প্রচারণা এবং ইউনিয়নে ইউনিয়নে সভা করার উদ্যোগ নিয়েছি। জনগণ সচেতন হলে কিন্তু উভয়ের প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব। বন্য হাতিরা খাদ্যের সন্ধানে ফসলী জমি লণ্ডভণ্ড করছে। ঘরবাড়িও ভাঙচুর করছে। হাতি তাড়াতে গিয়ে মারা যাচেছ মানুষ। কিন্তু বন্য হাতির দলকে তাড়াতে বনবিভাগের টিম রয়েছে, তাদের খবর দেওয়া উচিত। এছাড়াও বন্য হাতির আক্রমণে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের সরকার ক্ষতিপূরণ দিচ্ছে। তাই আমাদের পরামর্শ বন্য হাতিরা ফসল খেলে খেতে দিন। ঘরবাড়ি ভাঙচুর করলে নিজের জীবন রক্ষা করে দূরে সরে যান। বনবিভাগ সরকারের পক্ষে ন্যায্য ক্ষতিপূরণ দেবে।

Sharing is caring!

Advisory Editor
Kazi Sanowar Ahmed Lavlu
Editor
Nurul Afsar Mazumder Swapan
Sub-Editor
Barnadet Adhikary 
Dhaka office
38 / D / 3, 1st Floor, dillu Road, Magbazar.
Chittagong Office
Flat: 4 D , 5th Floor, Tower Karnafuly, kazir deori.
Phone: 01713311758

পুরানো খবর

মে 2020
শনি রবি সোম বুধ বৃহ. শু.
« এপ্রিল    
 1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
3031  

ছবি ঘর

    WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com