Sunday, 5/4/2020 | : : UTC+6
Green News BD

শিহান কিতামুরার সাথে আলাপচারিতা

শিহান কিতামুরার সাথে আলাপচারিতা

যে কজন জাপানি কারাতে প্রশিক্ষক বাংলদেশে আধুনিক কারাতের তালিম দিতে এসেছিলেন , তাঁদের মধ্যে শিহান তেতসুরো কিতামুরার অবদান অগ্রগণ্য । তিনি দীর্ঘদিন যাবৎ বাংলাদেশের জাতীয় কোচ হিসাবে নিযুক্ত থেকে বাংলাদেশের শুদ্ধ আধুনিক কারাতে চর্চার ভীত গড়ে দিয়েছেন। শুধু তাই নয়, উনার দায়িত্ব অব্যবহিতির পর বাংলাদেশের কারাতের খোঁজ খবর রেখেছেন,যখনই সুযোগ পেয়েছেন বাংলাদেশে এসেছেন ,নবীন প্রবীণ কারাতেকাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে আমাদের ক্রামাগত ঋণী করেছেন। ২০০৪ সালে সিজেকেএস কারাতের আমন্ত্রণে তিনি প্রথম বারের মতো চট্টগ্রামে দীর্ঘ মেয়াদী প্রশিক্ষণ দিতে আসেন। সে সময় সিজেকেএস এর পক্ষ থেকে তাঁর একটি সাক্ষাৎকার নেয়ার সৌভাগ্য হলেও বাড়ী বদলি জনিত কারণে সাকাৎকারের খসড়া পান্ডলিপি হারিয়ে ফেলায় এক দুঃখবোধ রয়ে গিয়েছিলো ভেতরে ভেতরে। সম্প্রতি বাড়ির পুরানো বই ঘাটতে গিয়ে অনেকগুলি কাগজের ভেতরে হঠাৎ খুঁজে পেলাম সেই সাক্ষাৎকারের খসড়া পান্ডুলিপি। হোটেল শাজাহানে নেয়া এই সাকাৎকারের কাজে সাহায্য করেছিলেন সেন্সি তুলুস শামস। ১৫ বছরের পুরানো এ সাক্ষাৎকার নেয়ার পর পরিস্থিতি অনেক বদলে গেছে। তারপরও সে সময়ের এই আলাপ চারিতার মধ্যে যে ইনসাইট দেখতে পাই তা এখনও অনেক দিক থেকে প্রাসঙ্গিক ,তথ্যমূলক এবং বলা যেতে পারে বাংলাদেশের কারাতের ইতিহাসের জন্য গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। তাছাড়া এই সাক্ষাৎকার থেকে আমরা আমাদের প্রিয় কিতামুরা শিহান কে নানা ভাবে আবিষ্কার করতে পারবো। সিহানের বাংলা ভাষা জ্ঞান চমৎকার। সাক্ষাতকারটি লিখতে তাই আমার খুব কম ঘঁষা মাঁজা করতে হয়েছে।
ইকবাল : আপনি কিভাবে এবং কবে থেকে কারাতে শুরু করলেন ?
কিতামুরা শিহান : ১৯৭১ সাল থেকে আমি কারাতে ট্রেনিং শুরু করি, তখন আমার বয়স ছিল ১০.
ইকবাল: ঐতিহ্যগত ভাবে জাপানে অনেক ধরণের মার্শাল আর্ট রয়েছে , আপনি কারাতের প্রতি আকৃষ্ট হলেন কেন?
কিতামুরা শিহান: আসলে জুদো,কেন্দো বা কারাতে সম্পর্কে আমার কোনো ধারণা ছিলোনা, কিন্তু আমার বয়স যখন দশ ,তখন আমার মা জন্ম দিনের উপহার হিসাবে ব্রুস লীর “এন্টার দ্য ড্রাগন” মুভিটি উপহার দেন,ছবিটি দেখার পর থেকে মার্শাল আর্টের প্রতি আমার তীব্র আগ্রহ জন্মে। বাবাকে বললাম,” আমি ঐ ধরনের জিনিস শিখতে চাই “।তখন তিনি আমাকে আমার জ্যাঠার কাছে নিয়ে গেলেন কারাতে শেখাতে। তিনি পুলিশ ডিপার্টমেন্টে চাকুরী করতেন , কারাতের উপর ৬ ড্যান।. সপ্তাহে দুই দিন উনি আমাকে কারাতে শেখাতেন। সে হিসাবে তিনি আমার প্রথম কারাতের শিক্ষক। উনার নাম, সিনসাবুরো কিতামুরা।
ইকবাল :আপনি জাপানের কোন এলাকা থেকে এসেছেন ?
কিতামুরা শিহানঃ আমি টোকিও হতে ৩৫০ মাইল দূরে অবস্থিত তোয়ামা জেলা হতে এসেছি।
ইকবালঃ আর কারা আপনার কারাতে প্রশিক্ষক ছিলেন?
কিতামুরা শিহানঃ প্রথমে বলেই ছিলাম জ্যাঠার কাছে আমরা কারাতে শিক্ষার হাতে খড়ি , তার কর্মব্যস্ততার কারণে সময় দিতে পারছিলেন না , তাই জে কে এ তোয়ামা শাখায় ভর্তি হই , সেখানে এক বছর তাকিনাকা সেন্সির কাছে কারাতে রপ্ত করি/ স্বভাবতই কারাতের স্টাইল ছিল সোতোকান। সে সুবাধে আমার কারাতে প্রশিক্ষণ শুরু হয় সোতোকান স্টাইলের মধ্যে দিয়ে।
ইকবালঃ আপনিতো অনেকগুলি স্টাইলের উপর দক্ষ,যেমন,সোতোকান, ওয়াদো রিউ,কিউকুসিকাই ইত্যাদী-ঐ সকল কারাতে স্টাইল সম্পর্কে কিছু বলুন।
কিতামুরা শিহানঃ আমি সোতোকান স্টাইলে কারাতে শিখা শুরু করি, আমার বয়স যখন ১৬/১৭, তখন বক্সিং ও প্রেকটিস করতাম।স্কুল ক্লাবে ফুটবলও খেলতাম
ইকবালঃ সোতোকান কারাতের পর কখন ওয়াদো রিউ কারাতে শিখতে আসলেন?
কিতামুরা শিহানঃ আমি যখন বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে জাপান ফিজিক্যাল ইনস্টিটিউটে পড়াশুনা করতে আসি,তখন আমার প্রাধান বিষয় ছিল কারাতে।ওখানে সোতোকান এবং ওয়াদো রিউ উভয় স্টাইলে প্রশিক্ষন দেয়া হতো।স্বাভাবিকভাবে সোতোকানের সাথে ওয়াদো রিউ কারাতে প্রশিক্ষন লাভ করি।ওখানে প্রশিক্ষন কার্যক্রম ছিল খুব কড়া, প্রশিক্ষকগন ছিলের জাপানের মধ্যে নামকরা।আমার বিশ্ববিদ্যালয় হতে আমার তিন বছর সিনিয়র একজন স্পেনে অনুষ্ঠিত বিশ্ব কারাতে প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন এবং আমার এক সহপাঠী জাপানের জাতীয় কারাতে চ্যাম্পিয়ন হয়।আমি বিশ্ব কারাতে প্রতিযোগিতায় অংশ গ্রহন করেনি বটে,তবে জাপানের ভেতরে বড় বড় প্রতিযোগীতায় অংশগ্রহণ করতাম।আমি একবার টোকিও মেট্রোপলিটন কারাতে চ্যাম্পিয়নশিপ এ অংশগ্রহন করে প্রথম স্হান অধিকার করি।
ইকবালঃ কিউকুসিনকাই কারাতের প্রতি আগ্রহের পটভূমি কি ছিল?
কিতামুরা শিহানঃ ১৯৮৭সালে বাংলাদেশ থেকে ফিরে গিয়ে আমার নিজের জেলা তোয়ামা থেকে ইশিকাওয়া জেলায় স্কুলের শিক্ষকতার চাকুরী নিয়ে চলে আসি। সে খানে আমি স্কুলের ছাত্রদের আমার স্টাইলের কারাতের বেসিক প্রাকটিস করাতাম ,। তখন মূলতঃ নিজের উন্নতির জন্য অন্যান্য স্টাইলের কারাতে উপর আগ্রহী হয়ে উঠি। তখন ইশিকাওয়া শহরের বিভিন্ন জিমনেসিয়ামে উঁকি ঝুঁকি মারতাম। প্রথমেই দেখলাম কিউকুসিনকাই কারাতে ক্লাব। আসলে নিজের স্টাইলের বাইরে অন্য স্টাইলের কারাতে শিখা উচিৎ। কারণ অন্য স্টাইলের কলা কৌশল আয়ত্ব করার মধ্যে দিয়ে , নিজের স্টাইলের মধ্যে কোনো ঘাটতি থাকলে তা দূর করা যায়। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় , আমরা যদি একটি দেশের মধ্যে নিজেকে বদ্ধ রাখি ,বিদেশ ভ্রমণ না করি ,তাহলে নিজ দেশ সম্পর্ক পুনাঙ্গ ধারণা করতে পারবোনা। তাই নিজের উন্নতির জন্য , নিজের স্টাইল কে বুঝার জন্য ৪বছর ধরে কিউকুসিনকাই কারাতে চর্চা করেছি।
ইকবালঃ আপনি ৩টি স্টাইলের উপর কারাতে চর্চা করেছেন,এই ৩টি স্টাইলের মধ্যে কি কি মিল অমিল খুঁজে পান?
কিতামুরা শিহানঃ কিউকুসিনকাই স্টাইলের প্রতিষ্ঠাতা ওয়ামা সেনসি প্রথমে সোতোকান কারাতে শিখে গোজু স্টাইল হয়ে কিউকুসিনকাই কারাতে প্রবর্তন করেন। সোতোকানের হেইয়ান কাতা কিউকুসিনকাই কারাতেও আছে।গোজু কাতাও আছে।ওয়াদো স্টাইল সোতোকান কারাতের আপন ভাই।সেনসি হিরনরি ওসুকা তার জুজুৎসু এবং আইকিদোর অভিজ্ঞাতার সাথে সোতোকানের সংমিশ্রণে ওয়াদোরিও কারাতের প্রতিষ্ঠতা করেন।তাই আপাতঃ দৃষ্টিতে মিলই বেশী।
টুলুস শামসঃ আধুনিক জাপানে মাষ্টার ফুনাকোসী গিচিন কে আধুনিক কারাতের জনক হিসাবে যথাযত ভাবে মুল্যায়ন করে?
কিতামুরা শিহানঃ হ্যাঁ। মাষ্টার ফুনাকোসীকে জাপানে আধুনিক কারাতের জনক হিসাবে সম্মান দেখানো হয়।তিনিই প্রথম ওকিনাওয়া থেকে জাপানে কারাতেকে পরিচয় করিয়ে দেন।শিক্ষার একটি বিষয় হিসাবে এবং স্পোটর্স হিসাবে দাড় করানোর জন্য তার ভূমিকাই ছিল মূখ্য।এই উদ্দেশ্যে তিনি কানকু দাই কাতা থেকে শুরু করে হেইয়ান কাতা প্রবর্তন করেন।
ইকবালঃ আগের বিষয়ে ফিরে আসি।মাল্টি স্টাইল কারাতে শিখার বিষয়ে সবাই কি একমত পোষন করেন?
কিতামুরা শিহানঃ না। বাই একমত পোষণ করেন না। আমাদের মত যারা আছেন তারা হয়তো একই মত পোষন করেন।যারা একটু পুরাতন মাষ্টার,তাদের ছাত্ররা অন্য স্টাইল শিখুক সেটা তারা মোটেই পচন্দ করেননা।ওয়াদোরিউ স্টাইলের মাষ্টারগন এব্যাপারে কিছুটা নমনীয় হতে দেখা যায় বটে,তবে কিউকুসিনকাই কারাতের মাষ্টারগণ তা মোটেই অনুমোদন দেননা।সংগত কারনে আমাকে অনেক সময় সিনিওর সেনসির কাছ থেকে বিব্রতকর পরিস্থিতির মু্খোমুখি হতে হয়েছিল।
ইকবালঃ আমরা জানি কারতের অনেকগুলি স্টাইল।কারাতের এত গুলি স্টাইল কেন?আপনিকি মনে করেন এটা কারাতের জন্য মংগল জনক?
কিতামুরা শিহানঃ সর্ব দক্ষিণে অনেক আগে থেকে অন্চল ভেদে নানা রকম “তে” প্রচলন ছিল।তার সাথে চিনা মার্শাল আর্টের নানা উপদান মিশ্রিত হয়ে আধুনিক কারাতেরর উদ্ভব।শহরের নাম অনুসারে সুরি শহরে সুরিতে,নাহা শহরের নাহাতে,তোমারি শহরের তোমারিতে এই তিন ধরনের কারাতে দেখা যায়।ফুনাকোসী সেনসি সুরিতে কে প্রথম জাপানী লোকদের কাছে পরিচয় করিয়ে দেন। তাকে অনুসরন করে ওকিনাওয়ার অন্যান্য কারাতে মাষ্টারগন জাপানে আগমন করে তাদের নিজস্ব স্টাইলে কারাতে প্রশিক্ষন দিতে শুরু করেন। সংগত কারনে শুরু থেকে উৎসগত কারনেই কারাতের স্টাইলের বিভিন্নতা দেখা যায়।৪টি প্রধান স্টাইল ছাড়াও এখন শুধু জাপানের ভেতরেই ১১০টির কারাতে স্টাইল দেখতে পাওয়া যায়।এভাবে আলাদা আলাদা কারাতে চর্চার জন্য মংগলজনক ছিলনা। এটা ওলেম্পিক গেমসে কারাতে অন্তর্ভুক্তির বড়* বাঁধা হয়ে দাড়িয়েছে। সেজন্য ৪টি প্রধান স্টাইলের বড় বড় সেনসিগন জাপান কারাতে ফেডারেশন গঠন করে অনেক চিন্তা ভাবনা করে কুমিতের জন্য একটি কমন নিয়ম তৈরী করেন,কুমিতে নিয়ম তৈরীতে বেগ পেতে না হলেও কাতার নিয়ম তৈরী করতে বেশ অসুবিধা হচ্ছিল। কারন ভিন্ন স্টাইলের হাজার হাজার কাতা।তাই প্রধান ৪টি স্টাইলের যে সব কাতা গুলির মধ্যে মোটামুটি সাদৃশ্য আছে, তাদের মধ্যে ২টি করে নিয়ে মোট ৮টি আবশ্যিক কাতা নির্বাচন করা হয়।তার পর নিজ নিজ স্টাইলের ঐচ্ছিক কাতা চর্চার অনুমোদন দেয়া হয়।তবে ১৯৪৫ সালের পরে সৃষ্ট কাতাগুলি এক্ষেত্রে প্রজোয্য হবেনা।আর যে কেউ কাতা তৈরী করতে পারে।আমি নিজেও কিছু কাতা সৃষ্টি করেছি।
ইকবালঃ তাহলে বলা যায় এ সব নিয়ম কানুন সবার জন্য ভালই হয়েছে?
কিতামূরা সিহানঃ এ উত্তর দু’ভাবে দেয়া যায়।জাপানেে অনেকে আছে যারা মনে করেন কারাতে নিজের শিক্ষার বিষয়,কারাতে অলেম্পিকে থাকতে হবে,জেকেএফ এর সাথে যুক্ত থাকতে হবে এমন কোন কথা নেই।* অন্যদল মনে করেন জাপানী সাংস্কৃতিক উপদান হিসাবে জুডোর মতো কারাতেকেও সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে হবে,সে জন্যে ওলেম্পিকের একটি ইভেন্ট হিসাবে অন্তর্ভূক্ত করতে পারলে কারাতে প্রসারের উদ্যোগ আরো ফলপ্রসূ হবে।বতর্মানের বিশ্ব কারাতে পর্যায়ে কারাতে প্রতিযোগিতা চালু আছে।
টুলুস শামস্ঃ কারাতে এখনো ওলেম্পিকে অন্তর্ভূক্ত* হয়নি কেন,অথচ তাইকোয়ান্দো অনেক দ্রুততার সাথে বিশ্ব ওলেম্পিকে অন্তর্ভূক্ত হয়ে গেছে!
কিতামূরা সিহানঃ প্রত্যেক আয়োজনকারী নিজেরা একটি দুইটি ইভেন্ট যোগ করতে পারত।যে ভাবে ১৯৬৪ সালে জাপান টোকিও ওলেম্পিকে জুড়োকে অন্তর্ভূক্ত করে নিয়েছিল,তেমনি ভাবে সিউল ওলেম্পিকে দঃ কোরীয়া তায়কোয়ানডো কে অন্তর্ভূক্ত করেছে।তাছাড়া, একই ধরনের খেলা হিসাবে কারাতে অন্তর্ভূক্ত করাটা আরো জটিল হয়ে গেছে। সবসচেয়ে বড় কথা কারাতের বড় বড় সংগঠনের মধ্যে দলাদলী, যেটি অলেম্পিক কমিটির কাছে একটি বড় নেতিবাচক ইস্যু।
ইকবালঃ আপনিতো গত ৩০বছর যাবৎ কারাতে প্রশিক্ষন দিয়ে আসছেন,এখনকার কারাতের সাথে ৩০ বছর আগের কারাতের কোন বিশেষ তফাৎ দেখতে পান?
কিতামূরা সিহানঃ কুমিতে এবং প্রশিক্ষন পদ্ধতির কথা বিবেচনার করলে বিস্তর পার্থক্য হয়ে গেছে।পূর্বে প্রশিক্ষন পদ্ধতিতে বৈজ্ঞানিক চিন্তা ভাবনার প্রয়োগ ছিল কম।বর্তমান অনেক বেশী বিজ্ঞান ভিত্তিক।কুমিতে রুলসের পরিবর্তনের সাথে সাথে ফাইটিং স্টাইলেরও অনেক পরিবর্তন হয়ে গেছে। আগে দুইজন প্রতিযোগী অনেক দূরে দূরে অস্থান করতো,, এখন অনেক ক্লোস্ড রেঞ্জএ কুমিতে হয়। পয়েন্ট বিন্যাস, রেফারি ফার্মাসন, টার্গেট এরিয়া,ফাউল এবং টেকনিকের বৈচিত্র আসাতে আক্রমনের গতি ও উদ্যোগ আগের চাইতে অনেক বেশী।মূলতঃ খেলা পরিচালনার নিয়ম পরিবর্তনের সাথে সাথে কারাতের মেজাজ অনেক পরিবর্তন হয়ে গেছে।
ইকবালঃ কারাতে আর্ট না স্পোর্টস, আপনার কি মত?
কিতামূরা সিহানঃ আসলে দুটোই।কারাতের বিভিন্ন কৌশল রপ্ত করে তা দেহ ভঙগীমায় শিল্পিতভাবে ফুটিয়ে তুলতে হয়।সেই বিচারে সকল খেলাধূলা এক ধরনের শিল্প।তবে জাপানের বাইরে কারাতে স্পোটর্স হিসাবেই বেশী প্রাধান্য দেয়া হয়।তবে এটা চর্চাকারীর ব্যক্তি ইচ্ছার উপর নির্ভর করে সে স্পোটর্স হিসাবে নেবে না মার্শাল আর্ট তথা আত্ন রক্ষার কৌশল হিসাবে গ্রহন করবে।
ইকবালঃ জাপানের বাইরে কারাতের কোন দিকটি প্রমোশন করতে চান?
কিতামূরা সিহানঃ অবশ্যই স্পোটর্স। আমরা কোন দেশের ক্রীড়া মন্ত্রনালয়ের আমন্ত্রনে সে দেশের সংশ্লিষ্ট ফেডারেশনে প্রশিক্ষন দিতে আসি।তবে এর পাশাপাশি সে দেশের শিক্ষার্থীর মধ্যে কারাতের ট্রেডিশনাল মূল্যবোধ পরিচয় করিয়ে দেয়ার চেষ্টা করি।
ইকবালঃকারাতের ওল্ড মাষ্টার এবং মর্ডান মাষ্টারদের মনোভাবগত পার্থক্য কিধরনের?
কিতামূরা সিহানঃ বর্তমান কারাতে প্রশিক্ষকদের মধ্যে প্রাচীন পন্থি এবং আধুনিক মনস্ক উভয় ধরনের লোক রয়েছে।প্রশিক্ষনের বিষয় নিয়ে যতনা পার্থক্য তার চেয়ে বেশী পার্থক্য চিন্তা ভাবনাগত।
ইকবালঃ বর্তমানে ওকিনাওয়ান কারাতের সাথে জাপানী বা জাপানের বাইরের কারাতের সাথে মূল পার্থক্য কি?
কিতামূরা সিহানঃ ওকিনাওয়ানরা কারাতে প্রতযোগীতায় অংশ গ্রহন করেনা। কারাতের কর্মাশিয়াল ভেল্যু তাদের কাছে গৌণ। তাদের কাছে এটা ট্রেডিশনাল হেরিটেজ এবং আত্ন রক্ষার কৌশল হিসাবে কারাতে চর্চা করে।
ইকবালঃ ব্রুসলী, চাক নরিস বা জ্যাকি চ্যাংদের কি ভাবে মূল্যায়ন করেন?
কিতামূরা সিহানঃ আসলে এরা কেউ কারাতে সংশ্লিষ্ট নয়।তবে আমি অন্ততঃ ব্রুসলির কথা বলতে পারি, যার সিনেমা গুলি তরুণদের কারাতে প্রতি আকৃষ্ট করে তোলার পক্ষে বড় ধরনের বিজ্ঞাপনের মতো ভূমিকা পালন করেছে।ঐসব ফ্লিম স্টারের মুভি গুলি দেখে অনেকেই ঐ ধরনের কৌশল শিখতে আগ্রহী হয়ে উঠে। বিষয়টি আমার ক্ষেত্রেও যেমনি প্রযোজ্য তেমনি অন্যান্যদের ক্ষেত্রেও কমবেশী প্রযোজ্য হয়ে থাকবে।
ইকবালঃ মার্শাল আর্ট মুভি সুপার স্টাদের মধ্যে আমেরিকান বা চীনাদের আমরা যে ভাবে পাই, জাপানীদের মধ্যে সে ভাবে দেখিনা কেন?
কিতামূরা সিহানঃ বিষয়টি খুব সত্য নয়। আমেরিকা বা পূর্ব এশিয়ায় অনেক জাপানী ফ্লিম স্টার খুবই জনপ্রিয়। যেমন -সো কোশি , সনি চিবা,কেন ওয়াতানাবে( দ্য লাস্ট সামুরাই ছবির প্রধান চরিত্র), হেনরিসানাদা নাম গুলি উল্লেখ করা যায়.
ইকবালঃএকটু বাংলাদেশ প্রসঙ্গে আবার ফিরে আসি। আপনি কবে প্রথম বাংলাদেশ এসেছিলেন?
কিতামূরা সিহানঃ প্রথমে এসেছিলাম ১৯৮৫ সালে, জাপানে ফিরে যাই ১৯৮৭ সালে। একটি জাপানী বাণিজ্যিক কোম্পানির প্রতিনিধি হয়ে বাংলাদেশে আবার ফিরে আসি।এইবার এসেছি জাইকার মাধ্যমে বিকেএফ এর সিনিয়র কোচ হয়ে দুই বছরের জন্য।**
ইকবালঃ বাংলাদেশের কারাতে প্রশক্ষিণ নিয়ে আপনার কর্ম পরিকল্পনা কি?
কিতামূরা সিহানঃ বিকেএফ এর পূববর্তী কমিটি যখন জাইকার কাছে সিনিয়র কোচের জন্য আবেদন করেছিল , তখন একটি কর্ম পরিকল্পনা পেশ করেছিল।তা বর্তমানে ততোটা কার্যকর মনে হচ্ছেনা। বর্তমান কারাতে কমিটির সিদ্ধান্তনুযায়ী কারাতে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
ইকবালঃ বর্তমানে কারাতের লিভিং লিজেন্ড করা ? যেমন আমরা বলতে পারে মাস্টার হিরোকাজু কানাজাওয়ার নাম!!
কিতামূরা সিহানঃ জাপানের বাইরে কারাতের প্রসারের কথা ধরলে মাস্টার হিরোকাজু কানাজাওয়ার অবস্থান বিশাল। জাপানের ভিতরে তানাকা সেন্সির, হাঁকোইসি সেন্সি (8th Dan) ,আরাকাওয়া সেন্সি(8th Dan), তোয়ামা সেন্সি (7th Dan) র কথা বলা যায়,এরা সবাই জাপান ন্যাশনাল টিমের কোচ।সাধারণত জাপানের জাতীয় দলের কোচগণ খুবই নামকরা কারাতে ব্যক্তিত্বদের মধ্যে থেকে নির্বাচিত হয়ে থাকেনা ।
ইকবালঃ কারাতে প্রশিক্ষণের সাথে অস্ত্র (Kobudo)**** শিক্ষা নেয়ার জরুরত কি আছে ?
কিতামূরা সিহানঃ আপাতঃ বিচারে দরকার নাই। কারাতে মানে খালি হাতে আত্ন রক্ষার কৌশল। কেউ যদি তরবারি নিয়ে আঘাত করতে আসে তখন খালি হাতে আত্ন রক্ষার চেষ্টাই হবে কারাতের চুড়ান্ত কথা। তবে কেউ যদি সত্যিকার অর্থে সেলফ ডিফেন্স শিক্ষা দিতে চায়,তবে বিভিন্ন ধরণের অস্ত্র কৌশল শিক্ষা দেয়া জরুরী। তাছাড়া অস্ত্র সমূহের প্রয়োগ কৌশল জানা থাকলে খালি হাতে কিভাবে প্রতিরোধ করা যায়, সে বিষয়ে একটা বাস্তবিক ধারণা পেতে পারেন।যেমন তন্ফা,সাই ইত্যাদির প্রয়োগ কৌশল, দুৰ্বলতা, ওজন ইত্যাদি উপর কোনো বাস্তবিক অভিজ্ঞতা না থাকলে খালি হাতে প্রতিরোধ করা একজন কারাতেকার পক্ষে কঠিন হয়ে পড়বে।তবে প্রথমে কারাতে শিক্ষা নিতে হবে, তারপর সম্পূরক হিসাবে অস্ত্র কৌশল প্রশিক্ষণ নেয়া দরকার।
ইকবালঃ বাংলাদেশ অনেক অভিবাবক কারাতেকে স্রেফ মারামারি হিসাবে দেখে, ছোটদের কারাতে শিক্ষা দিতে চাননা। এ বিষয়ে আপনার মতামত কি?
কিতামূরা সিহানঃ এই ধরণের মনোভাব জাপানেও দেখা যেতো। যারা জুদো করে তারাই ভদ্র লোক, বাকিরা শুধু মারামারি শিখে।তবে ধীরে ধীরে অবস্থার উন্নতী হয়েছে। ছোট ছেলে মেয়েরা যখন দোজোতে আসে, তাদের ভালো লাগলে তবে তারা অব্যাহত রাখে, নতুবা নয়/ আসলে কারাতে প্রশিক্ষকের শিক্ষা, আচার আচরণ, ব্যক্তিত্বের উপর নির্ভর করবে কারাতের সত্যিকার ইমেজ। একজন কারাতে প্রশিক্ষক যদি অনুকরণীয় দৃষ্টান্তের অধিকারী না হন, তবে অভিবাবকরা তাদের সন্তানদের কারাতে শিখাতে পাঠাবেননা।
ইকবালঃ আদর্শ ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক কিধরনের হওয়া উচিৎ?
কিতামূরা সিহানঃ প্রথমতঃ সবাইকে সমান দৃষ্টিতে দেখতে হবে,দ্বিতীয়তঃ ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক হওয়া উচিৎ শ্রদ্ধা সূচক ও বন্ধু সুলভ।এক্ষেত্রে শিক্ষকদের ছাত্রদের সমীহ আদায় করে নেয়ার মতো প্রয়োজনীয় যোগ্যতা থাকতে হবে. চরিত্র গঠনের জন্য সচেষ্ট থাকতে হবে।খেলাধুলাকে লেখাপড়ার অনন্যা বিষয়ের মত গুরুত্ব দিতে হবে.একজন কারাতে শিক্ষার্থী যখন সমাজের গন্যমান্য ব্যক্তি হয়ে উঠেন, তখনই একজন প্রকৃত কারাতে শিক্ষকের পরম আত্ম সন্তুষ্টি।
ইকবালঃ আমাদের আপনার মূল্যবান সময় দেয়ার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ। পরিশেষে, যারা কারাতে শিখছেন বা আপনার যারা ছাত্র রয়েছেন তাদের জন্য কোনো উপদেশ যদি দিতেন-
কিতামূরা সিহানঃ আপনারা যারা বিদেশী হয়েও আমাদের দেশের আমাদের দেশের সংস্কৃতি লালন পালন করছেন, কষ্ট করে কারাতে শিখছেন, বিষয়টি আমাকে ভীষণ প্রীত করে।সে জন্য আসলে প্রকৃত ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য আপনারা। আবারও বলব ,আমার কারাতে ছাত্রদের মধ্যে কেউ যদি দেশের গণ্যমান্য হয়ে উঠেন , সেদিন আমি সবচেয়ে বেশী আনন্দিত হবো।
—————————————————————————————————————————
*** Kobudo জাপান/ওকিনাওয়ার ট্রাডিশনাল অস্ত্র , যেমন, সোর্ড,নান চাকু ,তন্ফা , ইত্যাদি চিরায়ত অস্ত্র সমুহ কে বুঝায়।

কারাতে-ডু 5 ম ড্যান (জাপান কারাতে-ডু এডুকেশন স্টাডিজ এসোসিয়েশন)
কারাতে-ডু 5 ম ড্যান (জাপান কারাতে ফেডারেশন ওয়াডো-কাই)
কারাতে-ডু 1 ম ড্যান (কিউকুশিন-কিকান)
জেকেএফ জাতীয় কারাতে আনুষ্ঠানিকভাবে কোচ
জেকেএফ জাতীয় আনুষ্ঠানিকভাবে কুমিত রেফারি
এএফএফ আনুষ্ঠানিকভাবে রেফারি কুমিত ও কাতা (একটি গ্রেড)
জাপান অপেশাদার স্পোর্টস অ্যাসোসিয়েশনের আনুষ্ঠানিকভাবে কোচ এবং প্রশিক্ষক
জেকেএফ অফিসিয়াল গ্রেড পরীক্ষার পরীক্ষার পরীক্ষক (3kyu)
জেকেএফ ওয়াডো-কাই ২ কুইকু প্রশিক্ষক (আন্তর্জাতিক)
জেকেএফ ওয়াডো-কাই 2kyu যোগ্যতা পরীক্ষক (আন্তর্জাতিক)

কম্বোডিয়ার কারাতে টিমের জাতীয় কোচ (2006-08)
থাইল্যান্ডের দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া গেমসের কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষক (2007)
প্রশিক্ষক ও 3 দেশের আঞ্চলিক বন্ধুত্ব কারাতে সেমিনারের নেতা
(শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ ও কম্বোডিয়া) 2007
শেখ কামাল মেমোরিয়াল অ্যাডভান্স মার্শাল আর্ট ট্রেনিং ক্যাম্প 2018 এর প্রধান শিক্ষক
লাওসের পরবর্তী সাগর গেমসের সমন্বয়কারী এবং বাংলাদেশের পরবর্তী স্যাফ গেমস
বাংলাদেশ কারাতে টিমের জাতীয় কোচ (1985-87) (2001) (2002) (2004/5)
দক্ষিণ এশিয়া কারাতে চ্যাম্পিয়নশিপের বাংলাদেশ দল কোচ (1986)
1 ম স্থান
জাপানের কোচ ইশিকাওয়া প্রিফেকচার কারাতে টিম (1995-99)
হকুরিকু গাকুয়েন সিনিয়র হাই স্কুল ম্যানেজার এবং কোচ (1989-2000)

জাপান টোকিও মেট্রোপলিটন চ্যাম্পিয়নশিপ (1983) প্রথম স্থান

Sharing is caring!

Advisory Editor
Kazi Sanowar Ahmed Lavlu
Editor
Nurul Afsar Mazumder Swapan
Sub-Editor
Barnadet Adhikary 
Dhaka office
38 / D / 3, 1st Floor, dillu Road, Magbazar.
Chittagong Office
Flat: 4 D , 5th Floor, Tower Karnafuly, kazir deori.
Phone: 01713311758

পুরানো খবর

এপ্রিল 2020
শনি রবি সোম বুধ বৃহ. শু.
« মার্চ    
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
252627282930  

ছবি ঘর

    WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com