Friday, 20/9/2019 | : : UTC+6
Green News BD

বাঁশখালী কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র, তথ্য বিভ্রান্তি ও টেকসই উন্নয়ন-মাহবুব সুমন

বাঁশখালী কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র, তথ্য বিভ্রান্তি ও টেকসই উন্নয়ন-মাহবুব সুমন

গত ৮ এপ্রিল থেকে বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় এস আলম গ্রুপের পক্ষ থেকে একটি বিজ্ঞাপন দিয়ে কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র সম্পর্কে বিভ্রান্তি এবং বাস্তব অবস্থা বুঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে। যদি সেখানে সঠিক, নির্ভুল তথ্য পরিবেশন করা হত তাহলে আপত্তি করার কিছু ছিলনা।

সরকারী ওয়েবসাইটে ইউনিয়ন পরিষদের তথ্য অনুযায়ী গন্ডামারা ইউনিয়নের জনসংখ্যা ৪৫,৭৪৮ জন। যেখানে এস আলম গ্রুপ ৫০৩২ একর জায়গায় ১৩২০ মেগাওয়াটের দুটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করতে চায়। ভুমি অফিস তাদের ৩০০০ একর ক্রয়ের অনুমোদন দিয়েছে। এর বাইরেও খাস জমি আছে ১৭২৮ একর। ভুমি অফিস বেসরকারি কোম্পানি এস আলম গ্রুপের পক্ষ অবলম্বন করে দেখিয়েছেন প্রকল্প এলাকায় ১৫০ পরিবার থাকে। আবার পত্রিকার বিজ্ঞাপনে এস আলম গ্রুপ দাবি করেছে এখানে ৩৭ পরিবার থাকে। অথচ বাস্তবে এখানকার জনসংখ্যা ৫০ হাজারের মত। http://gandamaraup.chittagong.gov.bd/node/

মহেশখালীর কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র সম্পর্কে জাইকার রিপোর্টে বলা আছে কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের আশেপাশে সমুদ্রের পানি চার ডিগ্রী বেশী গরম হয়ে যাবে। সমুদ্রের পানি গরম হলে কি ধরনের পরিবেশগত প্রভাব পড়বে তা আলোচনার পরবর্তী অংশে জানা যাবে। http://open_jicareport.jica.go.jp/pdf/12233847.pdf

এখন দেখা যাক কয়লার কারনে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের কি অবস্থা।
মহারাষ্ট্রের দাহানায় ৫০০ মেগাওয়াটের একটি কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কারনে ওই এলাকায় ফসল উৎপাদন কমে গেছে ৬০ ভাগ। অর্থাৎ আগে যেখানে ১০০ কেজি উৎপাদন হত সেখানে এখন ৪০ কেজি ফসল হয়। Impact of Coal-fired Thermal Power Plants on Agriculture; A case study of Chicku (Sapota) orchards of Dahanu, Maharashtra
ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশ, তামিলনাড়ুর বিভিন্ন কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কারনে ওইসব এলাকার মানুষ এখন পানি কিনে খায়, নদীতে মাছ পায়না, পুকুরে মাছের পোনা ডিম মরে যায় এবং নষ্ট হয়ে যায়।

পত্রিকার বিজ্ঞাপনে বলা হয়েছে বর্তমান বিশ্বের ৭০ ভাগ বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় কয়লা থেকে, আসলে বর্তমানে সারা বিশ্বে ৩৯ ভাগ বিদ্যুৎ কয়লা থেকে উৎপাদন হচ্ছে এবং তা আগামী দুই বছরের মধ্যে কমে ৩০ ভাগে চলে আসবে। পাশাপাশি বলা হয়েছে চীনের ৯০ ভাগ এবং ভারতের ৭০ ভাগ কয়লা বিদ্যুৎ। এখানেও বাড়তি দেখানো হয়েছে। বর্তমানে চীনের ৬০ ভাগ এবং ভারতের ৬০ ভাগ বিদ্যুৎ কয়লা থেকে উৎপাদন হচ্ছে। এগুলিও তারা প্রত্যেক বছরে কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ করে কমিয়ে নিয়ে আসছে।

গন্ডামারার কয়লা বিদ্যুৎ প্রসঙ্গেঃ
এখানে যে ১৩২০ মেগাওয়াটের কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র করা হবে সেরকম একটি কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে কি কি পাই আমরা দেখা যাক
১/ বিদ্যুৎ ২/ ৭০০ মানুষের চাকুরি ৩/ শিল্প কল কারখানায় বিদ্যুৎ সরবরাহ
প্রথমতঃ কয়লা ব্যবহার না করেও অন্য অনেক পরিবেশবান্ধব উপায়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব।
দ্বিতীয়তঃ অনুসন্ধানে উঠে এসেছে গন্ডামারায় প্রতি কানি জমিতে ২১ মন ধান হয়, সেই হিসেবে প্রতি মৌসুমে পুরো এলাকায় ধানের উৎপাদন প্রায় ১৪০০ টন, লবন হয় ১২০০ টন, এছাড়া আছে চিংড়ি চাষ। এসব মিলে দেখা গেছে গন্ডামারায় বেকারের সংখ্যা খুবই কম। যেখানে বেকার নাই বললেই চলে সেখানে পুরো এলাকার মানুষকে গৃহহীন, কর্মহীন করে মাত্র ৬০০ মানুষের চাকুরি দিলে বাকি মানুষের কর্মসংস্থান, বসত বাড়ির ব্যবস্থা কিভাবে হবে?
তৃতীয়তঃ আমরা জানি কয়লা ছাড়া অন্য উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হলেও তা অন্যান্য জায়গায় সরবরাহ করা যাবে।

প্রযুক্তির কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে এখানে ভীষণ উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে এবং কোন ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার করা হবেনা। এস আলম গ্রুপের কোন প্রকাশনায় এখন পর্যন্ত নিশ্চিত করা হয়নি যে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রযুক্তি কি হবে? যদি পাল্ভারাইজড কোল প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয় তাহলে ১৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে প্রতিদিন
১/ ১৫ থেকে ১৭ হাজার টন কয়লা লাগবে। এই কয়লা পরিবহন করার সময় সাগরে, নদীতে দুর্ঘটনা ঘটে। কিছুদিন আগেই সুন্দরবনের শ্যালা নদীতে, পশুর নদীতে তেলবাহী, কয়লাবাহী জাহাজের দুর্ঘটনায় পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হয়। যা আপনারা টেলিভিশন পত্রপত্রিকায় দেখেছেন এখানেও সেরকম হবে। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন কয়লা দিয়ে পানি পরিষ্কার হয়। বিনয়ের সাথে বলতে চাই – যেই কয়লা পানি বিশোধনের জন্য ব্যবহার করা হয় সেটি কাঠ কয়লা। কিন্তু বিদ্যুৎ উৎপাদনের কয়লা খনি থেকে উত্তোলন করা হয়। এই কয়লা অত্যন্ত বিষাক্ত। এই বিষাক্ত কয়লা যদি পানি বিশোধনের জন্য ব্যবহার করা যেত তাহলে অনেক আগেই কোটি কোটি টন কয়লা ফেলে বুড়িগঙ্গা, শিতলক্ষা এবং তুরাগ নদীর পানি বিশোধন করে ফেলা হত এবং তা ঢাকার অধিবাসীদের সরবরাহ করা যেত। বাস্তবে বুড়িগঙ্গা, শিতলক্ষার পানি এত দুষিত যে তা গায়ে লাগলেই গা চুলকায়। এই পানি খাবার, গোসল বা রান্নার কাজে ব্যবহার করা যায়না।

২/ এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রে জলীয় বাষ্প তৈরি, কয়লা, অন্যান্য যন্ত্রপাতি ধোয়া এবং ঠাণ্ডা করার জন্য প্রতিদিন খরচ হবে ৮ কোটি ৭৬ লক্ষ লিটার পানি। গন্ডামারার ৫০ হাজার মানুষের প্রতিদিন পানি লাগে ২৫ লক্ষ লিটার। এক দিক থেকে কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র উঠাবে প্রায় ৯ কোটি লিটার পানি, অন্য দিকে বাড়িতে বাড়িতে টিউবওয়েলে পানি উঠবে ৫০ থেকে ১০০ লিটার। পানি কোথায় যাবে? যেদিকে টান বেশী সেদিকে। উল্লেখ্য কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দের যন্ত্রাংশে মরিচা পড়বে একারনে সমুদ্রের লোনা পানি ব্যবহার করা যায়না। সেকারনে ভূগর্ভস্থ পানিই এক্ষেত্রে ব্যবহার করতে হবে। http://www.sourcewatch.org/…/Water_consumption_from_coal_pl…
Sierra Crane-Murdoch, ২০১০ সালের অগাস্ট মাসে একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেন যার নাম “A Desperate Clinch: Coal Production Confronts Water Scarcity” Circle of Blue, সেখানে দেখিয়েছেন
যদি কালো ধোয়া, বিষাক্ত সালফার ডাই অক্সাইড এবং নাইট্ট্রাস অক্সাইড নিঃসরণ কমানোর জন্য অনেক উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয় যাকে বলে Integrated Gasification Combined Cycle (IGCC) তাহলে পানির খরচ হবে দেড়গুণ বেশী। এসব উন্নত প্রযুক্তি দিয়ে কয়লা থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কারনে চীন, আমেরিকার অনেক জায়গায় কৃষকরা ফসল উৎপাদনের জন্য পানি পাচ্ছেনা।
কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে যে বিষাক্ত গরম পানি সাগরে বা কাছাকাছি খালে ছেড়ে দেয়া হবে তাতে

৩/ পানির তাপমাত্রা ৪ ডিগ্রী সেলসিয়াস বেড়ে যাবে। গরম সহ্য করতে না পেরে মাছ, শামুক, ঝিনুক মাছের ডিম, পোনা মরতে থাকবে, কিছু কিছু জলজ প্রজাতি দূরে চলে যাবে।
এরপরও কিছু কিছু মাছ সহ্য করে থেকে যাবে কিন্তু তারা সবাই

৪/ কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে পানির সাথে আসা নাইট্রেট, সালফেট, ক্লোরিন, আর্সেনিক, সেলেনিয়ামের বিষে মারা যাবে। পুরো এলাকায় কোন মাছ থাকবেনা। মাছ না থাকলে পাখিও থাকবেনা।

৫/ পরিবেশের জন্য অত্যন্ত দরকারি হাঁসমুরগি, পাখি, সাপ এদের ডিম পাড়ার হার কমে যাবে, পরে সংখ্যা কমতে কমতে নাই হয়ে যাবে। বেজী, শেয়াল, কুকুর থাকবেনা। খেয়াল রাখতে হবে পরিবেশের প্রত্যেক প্রানি উদ্ভিদ একে অন্যের উপর নির্ভর করে বেঁচে থাকে। ফলে একটি ধ্বংস হলে অন্যটি ধ্বংস হবেই। এথেকে মানুষেরও রেহাই নাই।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দেয়া তথ্য মতে, এরকম আকৃতির একটি কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে লক্ষ লক্ষ টন ফ্লাই এশ, বটম এশ, ফ্লু গ্যাস ডি সালফারাইজেশান স্লাজ তৈরি হবে, যেগুলার মধ্যে অত্যন্ত বিষাক্ত পারদ, সিসা, ইউরেনিয়াম, থোরিয়াম, আর্সেনিক, নিকেল, ভ্যানাডিয়াম, বেরিলিয়াম, ক্যাডমিয়াম, বেরিয়াম, তামা, মলিবডিনাম, জিংক, সেলেনিয়াম, রেডিয়াম এবং অন্যান্য ভারী ধাতু থাকবে, যার ফলে শুধু গন্ডামারায় নয়, এখান থেকে ৮০০ এক হাজার কিলোমিটার দুরেও

৬/ মানুষের গড় আয়ু কমে যাবে, ফুসফুস ও শ্বাস যন্ত্রের বিভিন্ন অসুখ হবে, হৃদরোগ, ব্রঙ্কাইটিস, এজমা, ক্যান্সার হবে।

৭/ সন্তান উৎপাদন ক্ষমতা কমে যাবে, শারীরিক ত্রুটি নিয়ে শিশুর জন্ম বাড়বে, সুস্থভাবে জন্ম নেয়া শিশুদের বুদ্ধিমত্তা কমে যাবে। এখন আপনারা বলেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কি মিথ্যা বলছে না সত্যি বলছে? আমরা জানি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জাতিসংঘের একটি অঙ্গ সংগঠন। এধরনের একটি প্রতিষ্ঠান মিথ্যা তথ্য দিবেনা বলেই সবাই বিশ্বাস করে। http://www.sourcewatch.org/index.php/Health_effects_of_coal

৮/ ক্রিটিক্যাল, সুপার ক্রিটিক্যাল, আলট্রা ক্রিটিক্যাল এসব উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে পরিবেশ দূষণ কমেনা। কারন এসব উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয় দুটি কারনে, প্রথমটি কয়লার খরচ কমানোর জন্য। দ্বিতীয়টি হল পরিবেশ দূষণ কমানোর জন্য। যেমন এক মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে প্রতি ঘণ্টায় কয়লা লাগে ৫৬০ কেজি। উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করলে এক মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে প্রতি ঘণ্টায় কয়লা লাগবে ৫০৫ কেজি। ফলে কয়লার ব্যবহার তেমন কমেনা। একইভাবে কার্বনডাইঅক্সাইড, সালফার ডাই অক্সাইড, নাইট্ট্রাস অক্সাইড কমানোর জন্য সুপার ক্রিটিকাল, আল্ট্রা ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তি ব্যবহার করলেও বিষাক্ত গ্যাস নির্গমনের পরিমাণ তেমন কমেনা কিন্তু পানির চাহিদা বেড়ে যায় প্রায় দ্বিগুণ। ফলে প্রযুক্তি যত উন্নত পানির অভাব তত বেশী। মোটের উপর সাধারণ কিংবা উন্নত প্রযুক্তি কোনটিই পরিবেশবান্ধব নয়।

৯/ কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে নির্গত হওয়া কোটি কোটি টন কার্বনডাইঅক্সাইড, সালফারডাইঅক্সাইড, নাইট্রাস অক্সাইড বৈশ্বিক তাপমাত্রা বাড়াচ্ছে।
আইপিসিসিতে যার পুরো নাম ইন্টার গভরনমেন্টাল প্যানেল অফ ক্লাইমেট চেঞ্জ পৃথিবীর প্রায় সকল দেশের সেরা বিজ্ঞানী এবং গবেষকেরা কাজ করেন। তারা গবেষণা করে দেখিয়েছেন কয়লা, গ্যাস এবং তেল ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে নির্গত কার্বনডাইঅক্সাইড, সালফার ডাই অক্সাইড, নাইট্রাস অক্সাইড এবং মিথেন গ্যাস নিঃসরণের কারনে গত ১০০ বছরে পৃথিবীর তাপমাত্রা ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে গেছে। যার ফলে সারা পৃথিবীতে মানুষ সহ জীব জন্তু, পশুপাখির বিভিন্ন অসুখ হয়ে মরে যাচ্ছে, ক্রমান্বয়ে বিলুপ্ত হচ্ছে বহু প্রজাতি, জমিতে ফসল উৎপাদন কমে যাচ্ছে, ফসলি জমিতে খরা এবং লবনাক্ততা বেড়ে ফসল উৎপাদন কমে গেছে, বৃষ্টির মৌসুমে ব্যাপক বৃষ্টিপাত হয়, বন্যা, জলাবদ্ধতা, পাহাড় ধ্বস হচ্ছে, নদীর মাছ কমে গেছে, প্রলয়ংকারি ঘূর্ণিঝড় ব্যাপক মাত্রায় বেড়ে গেছে এবং শত শত জনপদ ধ্বংস হচ্ছে। মারা যাচ্ছে হাজার হাজার মানুষ, গৃহহীন হয়ে শহরের পথে পা বাড়াচ্ছে লক্ষ কোটি মানুষ। শুধুমাত্র বাংলাদেশেই জলবায়ু পরিবর্তন এবং বৈশ্বিক তাপ বেড়ে যাওয়ার কারনে জাতিসংঘের হিসাব মতে সাড়ে তিনকোটি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সারা পৃথিবীতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে প্রায় ২৫০ কোটি মানুষ।
এসব কারনে সারা দুনিয়ার সকল বিজ্ঞানী গবেষকরা পৃথিবীর সকল দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের অনুরোধ করে আসছিলেন কয়লা, তেল এবং গ্যাস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ করতে হবে। তা না হলে ২১০০ সালের মধ্যে পৃথিবীর তাপমাত্রা আরো ৪ ডিগ্রী সেলসিয়াস বেড়ে যাবে। ইতিমধ্যেই তাপমাত্রা এক ডিগ্রী বাড়ার কারনেই যে আবহাওয়া জলবায়ু আমরা দেখছি তা মানুষের সহ্য ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। যদি আরো ৪ ডিগ্রী তাপ বাড়ে তাহলে বলা যায় কেয়ামত বেশী দূরে নাই। আর এই কেয়ামতের জন্য মানুষের তৈরি করা কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং ব্যবসায়ীদের লোভ দায়ী।

বিশেষজ্ঞ, বিজ্ঞানীদের পরামর্শ মতে আমেরিকা, রাশিয়া, চীন, ফ্রান্স, জার্মানি, জাপান, ভারত সহ প্রায় সব দেশ তাদের প্রান প্রকৃতি পরিবেশ এবং মানুষের কথা বিবেচনা করে কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ করে দিচ্ছে। মাত্র চারদিন আগে গত ২২ এপ্রিল জাতিসংঘের ১৯৬ দেশের মধ্যে ১৫৫ দেশ মিলে কোপ ২১ চুক্তিতে সাক্ষর করে। এখানে লিঙ্ক দেয়া হল। (http://www.cop21.gouv.fr/…/a-record-over-160-countries-exp…/) যেখানে দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশও কয়লা, তেল গ্যাস বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ করবে বলে চুক্তি সাক্ষর করেছে। মাত্র ৫৫টি দেশ সাক্ষর করলেই এই চুক্তি আইনে পরিণত হবার কথা, সেখানে ১৫৫টি দেশ ইতিমধ্যে সাক্ষর করে ফেলেছে, বাকিরাও এবছরের মে মাসের মধ্যে সাক্ষর করবে । এই চুক্তিতে সাক্ষর করার মধ্য দিয়ে চীন, আমেরিকা, রাশিয়া, ভারত, জার্মানি, জাপান, মেক্সিকো, ইন্দোনেশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা সহ সকল দেশ ২০২৫ সালের মধ্যে তাদের বেশীরভাগ কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র পরিবেশ প্রান প্রকৃতির কথা বিবেচনা করে বন্ধ করে দিচ্ছে। এবং চুক্তিটি আন্তর্জাতিক আইনে পরিণত হবার কারনে চাইলেও কেউ নতুন কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করতে পারবেনা। ইতিমধ্যেই ঘোষণা এসেছে যে ২০২২ সালের মধ্যে চীনের ২৫ হাজার, জার্মানির প্রায় সব, ইংল্যান্ডের সব, আমেরিকার ৪৬ হাজার মেগাওয়াট, ভারতের ৩০ ভাগ কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ করে দিবে।

এরকম অবস্থায় বাংলাদেশ কি কারনে প্রায় ৩০ হাজার মেগাওয়াট কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে তা পরিষ্কার নয়। বৈশ্বিক এরকম পরিস্থিতিতে চীন, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকা চাচ্ছে তাদের বন্ধ হয়ে যাওয়া কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র, যন্ত্রপাতি অন্য কোথাও বিক্রি হোক। অনুন্নত দরিদ্র দেশগুলো উন্নয়নের স্বার্থে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য কমদামে কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করবে, যেগুলার ভেতর দিয়ে উন্নত দেশগুলোর যন্ত্রাংশ বিক্রি হবে আবার তাদের কয়লা খনির মজুদ হয়ে থাকা কোটি কোটি টন কয়লাও সেসব দেশে জ্বালানী হিসেবে বিক্রি হবে। অন্য দেশের প্রান প্রকৃতি পরিবেশ ধংসের মাধ্যমে চালু থাকবে তাদের অর্থনীতি। বাংলাদেশের মত ছোট অর্থনীতির কয়েকটি দেশই এই প্রক্রিয়ায় ধারার বিপরীতে কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের দিকে যাচ্ছে। বাংলাদেশের ভেতরে এটি কোন আন্তর্জাতিক চাপের কারনে হয়ে থাকলেও, পরিবেশকে ধ্বংস করে দেশের মানুষের মতামতের বাইরে এধরনের প্রকল্প হতে পারেনা।

এখন প্রশ্ন থেকেই যায় উন্নয়ন, শিল্প কলকারখানা স্থাপন, লক্ষ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান, খাদ্য উৎপাদনের জন্য বিদ্যুৎ দরকার। পরিবেশ বাঁচাতে গিয়ে যদি কয়লা তেল গ্যাস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ করা হয় তাহলে উন্নয়নের জন্য বাড়তি বিদ্যুৎ কোথা থেকে আসবে? আমাদের প্রচুর পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করে অর্থনৈতিক উন্নয়ন সচল রাখতে হবে, পরিবেশ বাসযোগ্য সুন্দর রাখতে হবে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে মানুষের জীবনের মান উন্নয়নে ভুমিকা রাখতে হবে। একই সাথে এই তিনটি সমস্যার সমাধান অত্যন্ত জটিল এবং কঠিন কাজ। কিন্তু ভুলে গেলে চলবেনা মানুষ হাজার হাজার বছর ধরে কঠিন থেকে কঠিন সমস্যার সমাধান করেই আজকের পৃথিবী সৃষ্টি করেছে। আজকের বাস্তবতায় যে জটিল কঠিন সমস্যার মুখোমুখি আমরা হয়েছি তাও সমাধান হবে। কিন্তু কিভাবে? এই প্রশ্নের উত্তর পেতে পারি আমরা সেসব দেশের দিকে তাকালে যারা ইতিমধ্যে কয়লা, তেল গ্যাস ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ করে দিয়েছে এবং তাদের উন্নয়ন থেমে যায়নি। এসব দেশ বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিকল্প মাধ্যম খুঁজে বের করেছে। যেগুলোর মধ্য দিয়ে মানুষ পরিবেশ প্রান প্রকৃতির কোন ক্ষতি হয়না। যেমন সূর্যের আলো থেকে সৌর বিদ্যুৎ, বাতাস থেকে বায়ু বিদ্যুৎ, সমুদ্রের ঢেউ, জোয়ার ভাটা, নদীর প্রবাহ, বর্জ্য, সামুদ্রিক শৈবাল থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়। একেক দেশ একেক নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহার করে তাদের বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান করছে। যেমন জার্মানি এই মুহূর্তে ৩৯ হাজার মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করেছে, যেখানে থেকে প্রতিদিন ২৭ হাজার মেগাওয়াটের বেশী বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। যে সূর্যের আলো দিয়ে সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয় বাংলাদেশে তার পরিমাণ জার্মানির চেয়ে বেশী। বাংলাদেশ সৌর বিদ্যুৎ নিয়ে তেমন কিছুই করছেনা অথচ আগামী কয়েক বছরের মধ্যে জার্মানি তাদের সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদন এক লক্ষ মেগাওয়াটে নিয়ে যাবে। একইরকমভাবে ইংল্যান্ড, ডেনমার্ক, সুইডেন, সুইজারল্যান্ড, নরওয়ে, উরুগুয়ে, জাপান, আমেরিকা, চীন, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড বায়ু, সৌর, বর্জ্য ব্যবহার করে তাদের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে, আগামিতেও করবে। আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারত এবং পাকিস্থানেও ২৫ থেকে ৩০টির মত বিশাল আকৃতির সৌর এবং বায়ু বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কাজ চলছে। যেগুলো ২০১৮ সালের মধ্যে সাধারণ মানুষকে বিদ্যুৎ সরবরাহ করবে। আমরাও দেশের সকল বিজ্ঞানী, গবেষক, বুদ্ধিজীবী, সাধারণ মানুষকে সাথে নিয়ে বিদ্যুৎ, শিল্প কলকারখানা, পরিবেশ এবং উন্নয়ন নিয়ে এমন নতুন চর্চা এবং কাজের মধ্যে যেতে চাই যা দিয়ে সব বাঁচবে, সবাই বাঁচবে।

তেল গ্যাস খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিরোধিতা করছে এর ঝুঁকি এবং প্রান প্রকৃতি পরিবেশের কথা বিবেচনা করে। জাতীয় কমিটি মোটেই উন্নয়ন বিরোধী নয়। কিন্তু এরকম কোন উন্নয়ন জাতীয় কমিটি চায়না যা মানুষ সহ সকল প্রান প্রকৃতি ধ্বংস করে ফেলবে। উন্নয়নের কারনে যদি সভ্যতাই ধ্বংস হয়ে যায় তাহলে সেই উন্নয়ন ভোগ করবে কে? এই অবস্থায় আমরা সরকারের কাছে দাবি জানাই বাংলাদেশে বিভিন্ন রকম নবায়নযোগ্য শক্তির সঠিক সম্ভাবনা নিরুপন করে পরিবেশবান্ধব উপায়ে দেশীয় বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনায় যাওয়ার কার্যক্রম হাতে নেয়া হোক। বাঁশখালী কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিলের দাবি জানাই, একই সাথে এই প্রকল্পকে কেন্দ্র করে নারী শিশু নির্যাতন এবং গুলি করে হত্যার ঘটনাটির বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করার মাধ্যমে দোষীদের চিহ্নিত করে ন্যায়বিচার বিচার নিশ্চিত করা হোক।

 

লেখক: তড়িৎ প্রকৌশলী, নবায়ন যোগ্য শক্তি গবেষক।
সদস্য তেল,গ্যাস, খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি

Sharing is caring!

Advisory Editor
Kazi Sanowar Ahmed Lavlu
Editor
Nurul Afsar Mazumder Swapan
Sub-Editor
Barnadet Adhikary 
Dhaka office
38 / D / 3, 1st Floor, dillu Road, Magbazar.
Chittagong Office
Flat: 4 D , 5th Floor, Tower Karnafuly, kazir deori.
Phone: 01713311758

পুরানো খবর

সেপ্টেম্বর 2019
শনি রবি সোম বুধ বৃহ. শু.
« আগস্ট    
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
282930  

ছবি ঘর